শনিবার, আগস্ট ১৭

আবার মদনে ভরসা মমতার, ‘ভাটপাড়া’ পুরস্কারের পিছনে কারণ অনেক বড়

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভাটপাড়া উপনির্বাচনের প্রার্থী ঘোষণা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝিয়ে দিলেন মদন মিত্রের উপরে তাঁর বরাবরের ভরসা এখনও অক্ষুন্ন। আর শুধু তৃণমূল কংগ্রেসই নয়, গোটা রাজ্যেই যানে যে মদন মিত্র মানে মমতার– ‘একান্ত অনুগত সৈনিক।’

যখন মন্ত্রী ছিলেন তখনও মদন মিত্ররর মুখে শোনা যেত, ”আমি তৃণমূলের বিশ্বস্ত সৈনিক” ঘোষণা। জেল যাত্রা এবং শেষ ভোটে হেরে খুইয়েছেন লালবাতি, নবান্নের চেয়ার। দলের বড় কোনও কর্মসূচিতেও মঞ্চে জায়গা হয় না আর। দলের কোনও দায়িত্বও নেই। অভিমান করে অনেক সময়ে নিজেকে ‘লাস্ট বয়’ বলেছেন বটে, তবে এখনও তাঁর মুখে সেই একই বয়ান, ”আমি তৃণমূলের একান্ত সৈনিক।”

এক বছর আগে ২০১৮-র মে মাসে পেট্রল-ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মতলায় তৃণমূলের মিছিলের নেতৃত্ব দেন যুব তৃণমূল সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মিছিল শেষে বক্তৃতায় অভিষেক বলেছিলেন, “সাধারণ মানুষের দু’হাজার কোটি টাকা মেরে দিয়ে মদন মিত্রকে যদি তিন বছর জেল খাটতে হয়, তা হলে ২৪ হাজার কোটি টাকা মেরে দেওয়ার জন্য বিজেপি নেতারা জেলে যাবেন না কেন?”

না, রেগে কোনও প্রতিক্রিয়া দেননি। ২৪ ঘণ্টা পার করে ফেসবুক লাইভে কালীঘাটের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের প্রতি একান্ত আনুগত্য বজায় রেখে বলেন, “চিট ফান্ডের ব্যাপারটা বিচারাধীন। তা নিয়ে বাইরে কোনও মন্তব্য করব না। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আমার পরিবার। অভিষেক, ওঁর মা লতা এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বলেই আজ সুস্থ জীবনযাপন করতে পারছি।” ভোলেননি দলনেত্রীর প্রতি আনুগত্যের ফুল নিবেদন করতেও। বলেছিলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সঙ্গে থাকলে সারা পৃথিবীর যত কালি আছে, যত কলঙ্ক রয়েছে কিছুই গায়ে লাগবে না। হংসপাখায় দাগ লাগে কি সরস্বতীর আসন যেথা।”

এমন উদাহরণ ভুরি ভুরি। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে যে কয়েকজন তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেছিলেন, তাঁদের অন্যতম মদন মিত্র। দলের সংগঠন মজবুত করা থেকে মিটিং-মিছিলের আয়োজনে বরাবরই অনন্য ভূমিকা নিয়েছেন ভবানীপুরের মদন। কিন্তু রাজ্যে পালাবদলের সময়ে পূর্ণমন্ত্রী হতে পারেননি। প্রতিমন্ত্রী হয়েই ক্রীড়া ও পরিবহণমন্ত্রকের দায়িত্ব সামলেছিলেন মদন। না, কোনও ভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেননি সাধারণ ট্যাক্সি ইউনিয়ের নেতা থেকে রাজ্যের মন্ত্রী হওয়া মদন মিত্র।

সফল রাজনৈতিক জীবনে ছন্দ পতন ২০১৪ সালে। ১২ ডিসেম্বর সারদা কেলেঙ্কারিতে সিবিআইয়ের হাতে গ্রেফতার হন তৎকালীন কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র। পরবর্তীকালে রাজ্য মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দেন সিবিআইয়ের খাতায় ‘প্রভাবশালী’ মদন মিত্র। না, তখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ ফিরিয়ে নেননি। তার আগে তৃণমূলের অনেকে গ্রেফতার হলেও মুখ না খোলা মমতা সাংবাদিক বৈঠক ডেকে মদন মিত্রর পাশে থাকার কথা ঘোষণা করেন৷ জেলে থাকা মদন মিত্রকে কামারহাটি বিধানসভা আসনে প্রার্থী করেও ‘একান্ত অনুগত’-র উপরে ভরসা প্রকাশ করেছেন মমতা।

১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পরে প্রবল কংগ্রেস হাওয়ার মধ্যেও সিপিএমের হেভিওয়েট প্রার্থী সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে লোকসভার ভোটে হারিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে সাড়া ফেলেন আজকের মুখ্যমন্ত্রী৷ কিন্তু বঙ্গ রাজনীতিতে মমতা জায়গা পাকা করে নিয়েছিলেন ১৯৯৩-এর ২১ জুলাই৷ রাজ্য যুব কংগ্রেসের তত্‍কালীন সভানেত্রী মমতা দল ও সংগঠনের হেভিওয়েটদের যাবতীয় আপত্তি, অসহযোগিতা উপেক্ষা করে মহাকরণ অভিযান করেছিলেন। পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় ১৩ জনের। সেদিনও মূলত মদন মিত্রর নেতৃত্বে আসা মানুষকে ঠেকাতেই হিমশিম খেয়েছিল পুলিশ।

সিঙ্গুর, নানুর, নন্দীগ্রাম সব পর্বেই শুধু আন্দোলন নয়, ব্যক্তি মমতার ছায়াসঙ্গী হয়ে উঠেছিলেন মদন। কালীঘাটে মমতার ঘর থেকে বড় সমাবেশ সামলানো সবেতেই মদন ছিলেন প্রধান ভরসা। অন্যরা ঈর্ষার সুরে বল, ‘মদনই দিদির চোখ-কান’। কখনও যে দূরত্ব তৈরি হয়নি তা নয়। তবে সেটা বড় আকার নেয়নি। মদন মিত্রকে তৃণমূল যুব কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতির পদে বসানো কিংবা দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুর (পশ্চিম) বিধানসভার উপনির্বাচনে জিতিয়েও ভরসা বুঝিয়েছেন মমতা।

সেই মদন মিত্রেই ফের ভরসা রাখলেন তৃণমূলনেত্রী। অর্জুন সিংহের গড় ভাটপাড়ার উপনির্বাচনে প্রার্থী মদন মিত্র। আর এর পিছনে প্রধান পাঁচটি কারণ দেখছে রাজ্য তৃণমূল নেতৃত্ব।

১। ভাটপাড়ায় কঠিন লড়াই। অর্জুন সিংয়ের ছেলে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা। সেখানে টক্কর দেওয়ার যোগ্যতা ও লোকবল রয়েছে মদন মিত্রের।

২। দলের কোনও দায়িত্বে না থেকেও লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে নিজের মতো কাজ করে চলেছেন। দমদম কেন্দ্রের কামারহাটি অঞ্চলের প্রচারে বড় ভূমিকা নিচ্ছেন।

৩। এখন যুব তৃণমূল সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মদন মিত্রের সম্পর্ক ভালো। সাম্প্রতিক কালে বিভিন্ন ইস্যুতে দক্ষিণ কলকাতায় দলের কর্মসূচিতে সদলবলে যোগ দিয়েছেন।

৪। অনেক বিপদের মধ্য দিয়ে গেলেও কখনও দলের বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি। দল চাপে পড়তে পারে এমন কোনও বেফাঁস মন্তব্য করেননি। নেত্রীর প্রতি আনুগত্যে কখনও খামতি দেখা যায়নি।

৫। বিপদে পড়ে দলের অনেক নেতার বিরুদ্ধেই যখন বিজেপির প্রতি দুর্বলতা প্রকাশের অভিযোগ উঠেছে, তখন মদন মিত্র এসব থেকে দূরেই থেকেছেন। তাঁকে নিয়ে কখনও জল্পনাও তৈরি হয়নি।

আরও পড়ুন

অর্জুন-পুত্র পবনকেই ভাটপাড়ার প্রার্থী করতে পারে বিজেপি

Comments are closed.