জীবনের ময়দানে একা রয়ে গেলেন বলরাম, চলে গেলেন থ্রু বাড়ানোর দুই বন্ধুই

পুরানে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ কিংবা বলিউডের অমর-আকবর-অ্যান্টনি, যখনই কোনও ত্রয়ীর কথা উঠেছে, বাঙালি ফুটবল পাগল মানুষ এই ত্রয়ীর কথা তুলেছেন বারবার। পিকে-চুনী-বলরাম সেই ৬০’র দশক থেকে আজও বাংলার তথা ভারতের ফুটবল হৃদয়ে থেকে গিয়েছেন। থেকে যাবেনও চিরকাল।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দেবার্ক ভট্টাচার্য্য

     

    হায়দরবাদ থেকে কলকাতা এসেছিলেন তিনি। চোখে ছিল ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন। বাকিটা ইতিহাস। এই শহরটা তাঁকে দিয়েছে ভালবাসা, সম্মান। তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম বড় সুপারস্টার। আর সেই যাত্রায় তিনি পাশে পেয়েছিলেন আরও দু’জনকে। একজন প্রদীপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বা পিকে। অন্যজন সুবিমল গোস্বামী বা চুনী। আর এই চুনী, পিকের সঙ্গে ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা ত্রয়ী হয়ে উঠেছিলেন দক্ষিণ ভারত থেকে আসা ছেলেটা। কালের নিয়মে মাসখানেক আগে পরলোকে চলে গিয়েছেন পিকে। আজ চলে গেলেন চুনী। রয়ে গেলেন একা তিনি, তুলসীদাস বলরাম।

    পুরানে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ কিংবা বলিউডের অমর-আকবর-অ্যান্টনি, যখনই কোনও ত্রয়ীর কথা উঠেছে, বাঙালি ফুটবল পাগল মানুষ এই ত্রয়ীর কথা তুলেছেন বারবার। পিকে-চুনী-বলরাম সেই ৬০’র দশক থেকে আজও বাংলার তথা ভারতের ফুটবল হৃদয়ে থেকে গিয়েছেন। থেকে যাবেনও চিরকাল।

    এই তিনজন কিন্তু ক্লাব ফুটবলে একসঙ্গে খেলেননি। বলরাম বাংলায় পা রাখার পর হয়ে উঠেছিলেন ইস্টবেঙ্গলের নয়নের মণি। পরে সাউথ ইস্টার্ন রেলের হয়ে খেলেছেন। চুনী গোস্বামী আবার চিরকাল প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব মোহনবাগানের ঘরের ছেলে হয়েই রয়ে গেলেন। আর পিকে কোনওদিন বড় দুই দলেই খেললেন না। খেললেন ইস্টার্ন রেলের হয়ে। যদিও পরে কোচের ভূমিকায় তাঁকে ময়দানের এই দুই ক্লাবেই দেখা গিয়েছে। এক ক্লাবে না খেললেও তাঁদের মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব। আর সেটা ছিল দেশের জন্য। বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে ভারতকে তুলে ধরার জন্য। করেও ছিলেন তা।

    Friend, fighter and tiger for Tulsidas Balaram

    ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৩-এর সাত বছর ছিল ভারতীয় ফুটবলের স্বর্ণযুগ। আর তা হয়ে উঠেছিল এই ত্রয়ীর জন্যই। এমন ফরোয়ার্ড লাইন, যা যে কোনও দলকে চিন্তায় ফেলত। চুনী ছিলেন বাঁ’দিক থেকে ইনসাইডের ফুটবলার। পিকে আবার বাঁ’দিক থেকে আউটসাইডে খেলতেন। আর বলরাম ছিলেন ডানদিক থেকে আউটসাইডের ফুটবলার। স্ট্রাইকার পজিশনে খেললেও তিনজনের খেলার পদ্ধতি ছিল আলাদা। আর তাই এরকম বৈচিত্র্য ছিলে তাঁদের খেলায়। চোখ বন্ধ করে একে অন্যকে পাস বাড়াতেন তাঁরা।

    এই ত্রয়ীর দাপটে সেইসময় উড়ান নিয়েছিল ভারতীয় ফুটবল। ৬২’র জাকার্তা এশিয়াডে ফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে সোনা জেতে ভারত। ৫৬ সালে মেলবোর্ন ও ৬০ সালে রোম অলিম্পিক, মারডেকা কাপ সব জায়গায় নজর কেড়েছে ভারত। আর তা হয়েছিল এই ত্রয়ীর দাপটেই। তাই হয়তো বন্ধুত্বটা থেকে গিয়েছে এত বছর।

    ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পর চুটিয়ে কোচিং করিয়েছেন পিকে। ভারতেরও কোচ হয়েছেন তিনি। ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত টাটা ফুটবল অ্যাকাডেমির ডিরেক্টর ও ১৯৯১ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ভারতীয় ফুটবল দলের ম্যানেজার ছিলেন চুনী গোস্বামী। সেইসঙ্গে ক্রিকেট, টেনিস, অভিনয় নিয়েও থেকেছেন তিনি। ক্রিকেটেও বাংলার হয়ে যথেষ্ট নজর কেড়েছিলেন তিনি। আর বলরাম এসব কিছুই করেননি। ফুসফুসের সমস্যায় মাত্র ২৭ বছর বয়সে ফুটবল থেকে অবসর নিতে হয়েছে। বিয়ে করেননি আজীবন। কিন্তু বাংলা ছেড়ে যাননি। বলা ভাল বাংলার মানুষের ভালবাসা তাঁকে যেতে দেয়নি।

    Memorable moments in the Santosh Trophy

    দীর্ঘদিন রোগে ভুগে ২০ মার্চ মারা গিয়েছেন পিকে। তাঁর মৃত্যুর খবর চুনীকে জানাননি পরিবারের লোকেরা। কারণ তাঁরা জানতেন, এই শোক হয়তো তিনি নিতে পারবেন না। তারপরেও এক মাস পরেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৮২ বছর বয়সে চলে গেলেন চুনী। হয়তো বন্ধুর টানেই। একা হয়ে গেলেন বলরাম।

    আরও পড়ুন নিজেকে ফুটবলার বলতেই পছন্দ করতেন বাংলাকে রঞ্জি ফাইনালে তোলা চুনী

    কয়েক মাস আগে শেষ দেখা হয়েছিল তাঁদের। ভারতীয় দলের প্রাক্তন কোচ রহিম সাহেবকে নিয়ে বলিউডে একটি সিনেমা তৈরি হচ্ছে। তার রিসার্চ টিমের ডাকেই সল্টলেকের একটি পাঁচতারা হোটেলে গিয়েছিলেন পিকে-চুনী-বলরামকে। নিজেদের গুরুর ব্যাপারে কথা বলতে। সেখানে পিকে-চুনীকে দেখে চিনতে পারেননি বলরাম। পরে জানিয়েছেন, যাঁদের সঙ্গে ময়দানের সবুজ ঘাসে দাপট দেখিয়েছেন, তাঁদের হুইল চেয়ারে আসতে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। সেই শেষ দেখা।

    RD Burman had taken us all for a song recording by Lataji ...

    পিকের চলে যাওয়ার ৪১ দিন পর আর এক বন্ধু চুনীর চলে যাওয়ার খবর পেলেন বলরাম। খবর পেয়ে মিনিট দশেক বাকরুদ্ধ হয়ে যান তিনি। একসাথে ফুটবল খেলার অনেক স্মৃতি মনে পড়ছিল বলরামের। চুনী মোহনবাগানে ও বলরাম ইস্টবেঙ্গলে থাকলেও দু’জনের লড়াই ছিল মাঠে। তবে তাঁরা শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। চুনী গোস্বামী তুলসীদাস বলরামকে ‘বলা’ বলে ডাকতেন। সেই সময় ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান খেলার পর একে অন্যের তাঁবুতে যাওয়ার রেওয়াজ ছিল। ইস্টবেঙ্গল জিতলে মোহনবাগান তাঁবুতে গিয়ে চুনীকে জড়িয়ে ধরতেন বলরাম। চুনীও তাঁকে কোল্ডড্রিংস খাওয়াতেন। আবার চুনীকেও তাঁদের তাঁবুতে নিয়ে এসে কোল্ডড্রিংস খাওয়াতেন বলরাম। এদিন একা বসে সেসব কথাই মনে পড়ছিল বলরামের।

    ৮৪ বছর বয়সী তুলসীদাস বলরাম থাকেন উত্তরপাড়ায়। গঙ্গার ধারে একটা আবাসনে একাই থাকেন তিনি। মনের মধ্যে কিছুটা অভিমান রয়েছে, ভারতীয় ফুটবল তাঁকে প্রাপ্য সম্মান দেয়নি। পিকে-চুনীর মতো পুরস্কার পাননি। কিন্তু পেয়েছেন দর্শকদের ভালবাসা। সেটাকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচে রয়েছেন তিনি। আর পেয়েছেন পিকে-চুনীর মতো দুই বন্ধু। একাকী বলরাম হয়তো ভাবছেন, কোনও দিন পরপাড়ে গিয়ে দুই বন্ধুর সঙ্গে ফের একবার তৈরি হবে সেই ত্রয়ী। ফের একবার মাঠে নামবেন একসঙ্গে। পিকে-চুনী-বলরাম।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More