রবিবার, আগস্ট ১৮

ইডেনে লঙ্কাকাণ্ড-র স্মৃতি থেকে আজকের শ্রীলঙ্কা-যেন বহমান নদী…

অর্পণ গুপ্ত

১৯৯৬ সাল। ঐতিহাসিক ইডেন গার্ডেন্স স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনাল খেলতে কলকাতা এল শ্রীলঙ্কা দল। সে বার ভারত কিছুটা স্বস্তিতে। মহম্মদ আজহারউদ্দিন আর শচীন তেণ্ডুলকরের ব্যাটিং বেশ ভরসা দিচ্ছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের তখন স্বর্ণযুগ। ইডেন গার্ডেন্স কানায় কানায় পূর্ণ। মনে আছে এক জনপ্রিয় সংবাদপত্র সে দিন লিখেই দিয়েছিল, সে দিন ছিল কলকাতার অঘোষিত ছুটির দিন। সারা দেশের সমস্ত চোখ তখন ইডেনে। কলকাতার ভিড় ইডেনমুখী।

খেলার শুরুটা অবশ্য কিছুটা নাটকীয়ভাবেই। প্রথম ওভারেই ১ রানে দুটো উইকেট পড়ে গিয়ে ধুঁকছে শ্রীলঙ্কা। জয়সূর্য আউট হতেই উত্তাল হল ইডেন। কিন্তু এর ঠিক পরেই অরবিন্দ ডি সিলভার ইনিংসটা হয়তো যতদিন ক্রিকেট থাকবে ততদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে। ডি সিলভার চওড়া ব্যাট সে বারে ঢাল ছিল শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং-এ। সাথে রোশন মহানামা আর অর্জুন রণতুঙ্গার যোগ্য সঙ্গতে ২৫১ তে গিয়ে থামল শ্রীলঙ্কা।

ভারতীয় ব্যাটিং-এ সেই অবিসংবাদী নায়ক শচীন। তিনি আউট হতেই যেন ধস নামল ১০০ রানের মাথায়। মহঃ আজহারউদ্দিন, সঞ্জয় মঞ্জরেকর আর অজয় জাদেজার উইকেট হারিয়ে প্রায় ম্যাচ পকেটে পুড়ে নিয়েছে লঙ্কানরা। এমন সময়েই সেই ঐতিহাসিক ঘটনা। ইডেনে দর্শকদের রোষ আছড়ে পড়ল মাঠে। স্টেডিয়ামে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হল। ম্যাচ রেফারি ক্লাইভ লয়েড ম্যাচটি বাতিল করে শ্রীলঙ্কাকে জয়ী ঘোষণা করে দিলেন। প্রায় ২৩ বছর পর স্মৃতির পাতা থেকে উঠে এল সেই লঙ্কাকাণ্ড…

সময় পেরিয়েছে। বহমান নদীর মতোই বয়ে গেছে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট। সেই লঙ্কাকাণ্ডের নায়করা কবেই ছেড়ে চলে গেছেন ক্রিকেটের বাইশ গজ। এখনও মনে পড়ে অরবিন্দ ডি সিলভা আর অর্জুন রণতুঙার কথা। সেই দুই ত্রাস শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটার, সাথে রোশন মহানামা, মার্ভান আটাপাট্টু, সনথ জয়সূর্য, আরও কত কিংবদন্তী খেলোয়াড় খেলে গেছেন ওই নীল-হলুদ জার্সি গায়ে। মনে আছে চামিন্ডা ভাসের কথা। বাঁ হাতের দুর্দান্ত আউটসুইং আর আচমকা রিভার্স সুইং দিয়ে কত ব্যাটসম্যানকে যে প্যাভিলিয়নে পাঠিয়েছেন…

তবে রেকর্ড বুকে শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে উজ্জ্বল খেলোয়াড় কিন্তু মুথাইয়া মুরলীধরণ। সেই দুসরা যেন আজও লেগে আছে ক্রিকেটের প্রতিটা দেওয়ালে। ২০০৩-২০০৪ নাগাদ একটা সময় মিথ-ই হয়ে গিয়েছিল যে মুরলীকে আক্রমণ করা মানেই নিজের উইকেট ছুঁড়ে দিয়ে আসা। ৮০০ আন্তর্জাতিক উইকেট ! কেমন যেন স্বপ্নের মতো লাগে আজও। এই ছিল শ্রীলঙ্কার বোলিং-এর ধার…

২০০৭, ২০১১-এ ফের ফাইনালে গেল শ্রীলঙ্কা। পরপর দু’বার। সে সময়টা শ্রীলঙ্কার দুই ব্যাটিং মেরুদণ্ড সাঙ্গাকারা-জয়বর্ধনে, সাথে ২০১৭-এ অভিজ্ঞ জয়সূর্য, অলরাউণ্ডারে কত বছর দাপিয়ে খেললেন তিলকরত্নে দিলশান। সেই “দিলস্কুপ” উঠে গেল ক্রিকেটবুকের মোস্ট এন্টারটেইনিং- শট এর তালিকায়। অবশ্য শ্রীলঙ্কান ফাস্ট বোলিং-এ লাসিথ মালিঙ্গার নাম না করলে হয়তো অন্যায়-ই হবে। ভাসের মতো সুইং না থাকলেও মালিঙ্গা আজও কিন্তু কিংবদন্তী। ক্রিকেট বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে মালিঙ্গা দেখিয়েছিলেন যে ইয়র্কার নামক বস্তুটিকেও নিখুঁত অধ্যবসায়ের মাধ্যমে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়। এ বছরও কিন্তু লঙ্কান ক্রিকেটের ব্যাটন এই ভদ্রলোকেরই হাতে…

পৃথিবীর সমস্ত ক্রিকেটীয় জাতিরই একটা ট্রানজিশান পিরিয়ড বা পরিবর্তনের সময় চলে। ২০১১-এর পর থেকে লঙ্কান ক্রিকেটে ভাটার টান। এ বছরও একঝাঁক তরুণ ক্রিকেটার নিয়েই শ্রীলঙ্কা এসেছে বিশ্বকাপের মঞ্চে। বিগত কিছু বছরে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, গত ইস্টারে ভয়ংকর জঙ্গিহানায় বিপর্যস্ত সিংহের দেশ। তবু তো একঝাঁক তরুণ তুর্কির উপর ভরসা করেছে শ্রীলঙ্কান বোর্ড অফ ক্রিকেট, এই বা কম কী?

হয়তো আজ সে ভাবে সাফল্য আসছে না বিশ্বকাপে। প্রথম ম্যাচে লজ্জার হার। পরের ম্যাচে আফগানিস্তানের সাথেও কোনও মতে জেতা- এ সবের বাইরেও একটা জিনিস কিন্তু চোখ এড়িয়ে গেলে চলবে না। শ্রীলঙ্কা নতুন খেলোয়াড় তুলে আনার জন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছে এ বারের বিশ্বকাপকে। হয়তো মালিঙ্গা, মেন্ডিসদের হাত ধরে আগামী দিনের জয়সূর্য-অরবিন্দ ডি সিলভা-অর্জুন রণতুঙ্গা কিংবা মুথাইয়া মুরলীধরণরা উঠে আসবেন। আবার বিশ্বক্রিকেটে অন্যতম শক্তি শ্রীলঙ্কার লঙ্কাকাণ্ড আমরা দেখতে পাব ২৩ বছর আগের সেই দিনটার মতো। এখানেই তো ক্রিকেটের সৌন্দর্য…

Comments are closed.