রঞ্জি ফাইনালে বাংলা, পিছনে দাদার ‘ভিশন ২০২০’

হয়তো বিসিসিআইয়ের মসনদে বসে মিষ্টি হাসি হাসছেন সৌরভ। কারণ তিনি জানেন, তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবে পরিণত হতে আর বাকি মাত্র একটা ধাপ। আর তাহলেই ফের একবার লড়াইটা জিতে যাবেন তিনি। নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই। আবার সবাইকে বুঝিয়ে দেবেন, তাঁর থেকে ভাল এই খেলাটা হয়তো আর কেউ বোঝেন না।  

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দেবার্ক ভট্টাচার্য

    সালটা ২০১৪। সবে সিএবি যুগ্ম সচিবের দায়িত্ব নিয়েছেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। আর এসেই তিনি শুরু করলেন ‘ভিশন ২০২০’। নিয়ে এলেন ভিভিএস লক্ষ্মণ, মুথাইয়া মুরলীধরণ, ওয়াকার ইউনিসদের। তরুণ প্রতিভাদের তুলে আনার দায়িত্ব দেওয়া হল। নিজেও লেগে রইলেন রাত-দিন। সৌরভের সেদিনের সেই চেষ্টার ফলই কি মিলছে ৬ বছর পর। ৩০ বছর পরে ফের রঞ্জি ট্রফি জয়ের স্বপ্ন বাংলা শিবিরে। ময়দানে কান পাতলে কিন্তু শোনা যাচ্ছে সৌরভের সেই পরিকল্পনার কথা। যে ভিশন তিনি দেখেছিলেন, সেটাই কিন্তু আজ ঘোরতর বাস্তব।

    ক্রিকেট মাঠে প্লেয়ার হিসেবে হোক, কী মাঠের বাইরে প্রশাসক হিসেবে, বরাবরই নতুন চিন্তার আমদানি করেছেন সৌরভ। যুগ্ম সচিবের দায়িত্ব নেওয়ার পরেই তাঁর মনে হয়েছিল বাংলার জন্য ভাল ক্রিকেটারদের একটা পুল দরকার। সেখানে অভিজ্ঞতার পাশপাশি থাকবে তারুণ্য। তবেই সাফল্য আসবে। তার আগে ২০০৫-০৬, ২০০৬-০৭, পরপর দু’বার ফাইনালে উঠে হারতে হয়েছিল বাংলাকে। কী কারণে ফাইনালে জয় আসছিল না তা কাটাছেঁড়া করতে শুরু করলেন মহারাজ।

    সৌরভের মনে হয়েছিল বাংলার সাফল্য না পাওয়ার পিছনে মূল দুট কারণ কাজ করছে। ১) ক্রিকেটারদের নেতিবাচক মানসিকতা। ২) সিনিয়র ও জুনিয়রদের মধ্যে মেলবন্ধনের অভাব।

    এই সমস্যা দূর করতেই তাঁর ‘ভিশন ২০২০’ শুরু করলেন মহারাজ। নিয়ে এলেন দীর্ঘদিনের বন্ধু ভিভিএস লক্ষ্মণকে। ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীরা জানেন লক্ষ্মণ একজন ম্যাচ উইনার। নিখুঁত ব্যাটিং টেকনিকের অধিকারী। তাই তাঁর নজরে থাকলে ব্যাটসম্যানদের ভুল-ত্রুটি শুধরে দিতে পারবেন তিনি। আর টেকনিকের থেকেও বড় হল মানসিকতা। নিজের ক্রিকেট জীবনে ম্যাচের সবথেকে কঠিন পরিস্থিতিতে রান করেছেন লক্ষ্মণ। টেলএন্ডারদের সঙ্গে নিয়ে হারা ম্যাচ জিতিয়েছেন। তাই তাঁর থেকে পজিটিভ মানসিকতার আর কে বা হতে পারে।

    চিরকাল বোলারদের অধিনায়ক বলা হত সৌরভকে। তাঁর অধীনে যাঁরা খেলেছেন, তাঁরা বলেন, বোলারদের মন সৌরভের থেকে ভাল কেউ বুঝতে পারতেন না। আর তাই সামান্য সামর্থ নিয়ে এত উঁচুতে ভারতীয় ক্রিকেটকে নিয়ে গিয়েছেন তিনি। সৌরভ বুঝেছিলেন, বাংলাকে রঞ্জিতে ভাল করতে হলে ভাল বোলিং পরামর্শদাতা প্রয়োজন। আর তাই তিনি ফোন করলেন তাঁর একসময়ের দুই প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কার মুথাইয়া মুরলীধরণ ও পাকিস্তানের ওয়াকার ইউনিসকে।

    স্পিনের ঘরানায় মুরলী কী, তা কাউকে আলাদা করে বলে দেওয়ার দরকার নেই। আর তাঁর সবথেকে বড় গুণ ছিল, চুপচাপ নিজের কাজ করতেন। মুখে কিছু বলতেন না। কথা বলত তাঁর কব্জি। সেই কব্জির মোচরেই টেস্টে ৮০০ উইকেট নিয়েছেন তিনি। মুরলীর এই ঠান্ডা মাথা বাংলার স্পিনারদের মধ্যে ঢোকাতে চেয়েছিলেন দাদা। সেইসঙ্গে বোলিংকে আরও ক্ষুরধার করা তো আছেই।

    অন্যদিকে পেস বোলারদের দিকে নজর রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ওয়াকার ইউনিসকে। পাকিস্তানের এই চ্যাম্পিয়ন বোলার বহু ব্যাটসম্যানের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিলেন। তাঁর বিষাক্ত ইনসুইং ও রিভার্স সুইং সমস্যায় ফেলত দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যানদের। আর তাই বাংলার পেসারদের আরও ভয়ঙ্কর করে তুলতে তাঁর চেয়ে ভাল আর কে হতে পারে।

    ২০১৬ সালে সিএবির প্রেসিডেন্ট হলেন সৌরভ। আরও এগিয়ে নিয়ে গেলেন তাঁর ‘ভিশন ২০২০’-র পরিকল্পনা। শুধু পরামর্শদাতা আনলে চলবে না, খেলার পরিবেশকেও সেভাবেই গড়ে তুলতে হবে। ইডেনের পলিমাটির উইকেটে ১৪০ কিলোমিটার গতিতে বল করে কী সুবিধা পাবেন পেসাররা? তাই পুরো উইকেটই বদলে দিলেন তিনি। ইংল্যান্ড থেকে মাটি ও ঘাস নিয়ে এসে নতুন করে পিচ ও গ্রাউন্ড বানালেন। এই মুহূর্তে দেশের সেরা পেস সহায়ক উইকেট বলা হয় ইডেনকে। তারই ফল রঞ্জির সেমিফাইনালে কর্ণাটকের ২০টা উইকেটই নিয়েছেন বাংলার তিন পেসার।

    এই পরিকল্পনার শেষ তাসটা মহারাজ খেললেন ২০১৮ সালে। কোচ করে নিয়ে এলেন অরুণ লালকে। সবাই বলেছিলেন, ক্যানসার থেকে ফেরা অরুণ কি পারবেন? তাঁর শরীর সায় দেবে তো? কিন্তু সৌরভ জানতেন। তিনি দেখেছিলেন বাংলার রঞ্জি জয়ী দলের এই ব্যাটসম্যানের ভেতরের লড়াইকে। যে মানুষটা ক্যানসারকে হারিয়ে জীবন যুদ্ধে জয়ী, তাঁর কাছে ক্রিকেট আর এমন কী। সত্যিই তো, বাংলা দলের খোলনলচে বদলে দিয়েছেন অরুণ লাল। নামের পিছনে যাননি। যাঁকে দরকার খেলিয়েছেন। আর তাই অভিজ্ঞ অশোক দিন্দাকে অবলীলায় দলের বাইরে রেখেছেন। ১০ বছর পরে সুযোগ দিয়েছেন নীলকণ্ঠ দাসকে, যাঁর বোলিং কোয়ার্টার ফাইনালে দলকে জিততে সাহায্য করেছে। মনোজ যাতে খোলা মনে ব্যাট করতে পারেন, তার জন্য অধিনায়কত্বের ব্যাটন মনোজের হাত থেকে দিয়েছেন তরুণ অভিমন্য ঈশ্বরণকে। চলতি মরসুমে রঞ্জিতে প্রথম ৩০০ করেছেন মনোজ তিওয়ারি।

    সবথেকে বড় কথা দলটাকে এক সুতোয় বেঁধেছেন। এই দলে এখন অনুষ্টুপ সেঞ্চুরি করলে সবথেকে বেশি আনন্দ পান মনোজ তিওয়ারি। মুকেশ কুমার উইকেট নিলে সেলিব্রেশন বেশি করেন ঈশান পোড়েল। আকাশ দীপের কাঁধে চড়ে মাঠ ছাড়েন মুকেশ। কেউ বাদ পড়লে রাগ করেন না। দিন্দা পর্যন্ত ফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ঈশানকে। যে যখন সুযোগ পাচ্ছেন, নিজেরা সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আর তাই তো বারবার খাদের মুখ থেকে ম্যাচ বের করে নিয়ে যাচ্ছে বাংলা। দেখিয়ে দিচ্ছে শেষ হওয়ার আগে কোনও খেলা শেষ করতে নেই। বাংলা শিবিরে ঘুরছে একটাই মন্ত্র, ‘উই আর দ্য বেস্ট’।

    এসব দেখে হয়তো বিসিসিআইয়ের মসনদে বসে মিষ্টি হাসি হাসছেন সৌরভ। কারণ তিনি জানেন, তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবে পরিণত হতে আর বাকি মাত্র একটা ধাপ। আর তাহলেই ফের একবার লড়াইটা জিতে যাবেন তিনি। নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই। আবার সবাইকে বুঝিয়ে দেবেন, তাঁর থেকে ভাল এই খেলাটা হয়তো আর কেউ বোঝেন না।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More