রবিবার, সেপ্টেম্বর ২২

আমরা লাল-হলুদ, আবেগে বাঁচি, আবেগে মরি

শুভাশিস সাহা

আমাগো ১০০ বছর। দেখতে দেখতে ১০০টা বছর পেরিয়ে গেল আমার ইস্টবেঙ্গল। আমাদের সবার ইস্টবেঙ্গল। আমরা সাধারণ সমর্থক। আবেগে বাঁচি, আবেগে মরি। হেরে গেলে রাতের খাবার গলা দিয়ে নামে না। আর জিতলে মনে হয়, শচীন কত্তার মতো হাত দিয়ে ট্রাম দাঁড় করিয়ে বলি, “এই ট্রামখান কিনুম। আমাগো ইস্টবেঙ্গল জিতসে আজ”।

সালটা ১৯৯৭। একদিন বাবা বললো ইস্টবেঙ্গলের খেলা দেখতে নিয়ে যাবে সল্টলেক স্টেডিয়ামে। মোহনবাগানের সাথে খেলা। তার আগে থেকে জানতাম আমাদের মানে বাঙালদের ক্লাব হল ইস্টবেঙ্গল, আর ঘটিদের ক্লাব হল মোহনবাগান। আমার এক জেঠু ছিলেন। আমি ভালো জেঠু বলতাম। আমার দেখা অন্যতম পাগল ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টার। মাসের শুরু হোক বা শেষ, ইস্টবেঙ্গলের খেলা থাকলে বাড়িতে ইলিশ মাছ আসবেই। ভালো জেঠু তখন হাসপাতালে ভর্তি। অবস্থা স্থিতিশীল। একদিন দাদাদের বললেন, “আমারে বাড়ি নিয়া চল, বিকেলে ইস্টবেঙ্গলের খেলা আছে। এখানে থাকলে আমি খেলা দেখতে পারুম না”। বাড়ি নিয়ে আসা হল। ভালো জেঠু শুয়ে শুয়ে খেলা দেখলেন। ইস্টবেঙ্গল জিতলো। পরদিন ভোরে ভালো জেঠু মারা যান। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ভালো জেঠুর মাধ্যমে।

কলকাতা গেলে বেশ কয়েকবার যুবভারতী দেখেছি তখন। কিন্তু, ভেতরে যাওয়া হয়নি কখনও। তাই বাবা খেলা দেখতে নিয়ে যাবে বলতেই মনটা হেব্বি খুশি হয়ে গেল। লাল-হলুদ জার্সি নেই তো কি হয়েছে? একটা গোলাপী হলুদ গেঞ্জি ছিল, সেটা পরেই চললাম খেলা দেখতে। মাঠে ঢোকার আগে ভিড় দেখে আমার মাথায় হাত। একসাথে অত লোক আমি আগে কখনও দেখিনি। গ্যালারিতে পৌঁছে যে দৃশ্য দেখেছিলাম, মরার আগে অবধি ভুলবো না আমি। এক লাখের ওপর লোক। যুবভারতীর তিনটে টায়ারই কানায় কানায় ভর্তি।

ইস্টবেঙ্গলের হয়ে নাজিমুল হকের প্রথম গোল। সঙ্গে পাহাড়ি বিছের হ্যাটট্রিক। কলকাতা ফুটবলের হাত ধরে ভারতীয় ফুটবলে জন্ম নিয়েছিল এক তারকা – বাইচুং ভুটিয়া। আর লক্ষাধিক দর্শকের মাঝে যুবভারতীর গ্যালারিতে জন্ম নিয়েছিল এক লাল-হলুদ সমর্থক – শুভাশিস সাহা।

সালটা ২০১২। কাজের অবস্থা বেশ খারাপ। মন মেজাজ ভালো না। রোজ সকালে ট্রেন ধরে কলকাতা আসতাম লোকজনের সাথে দেখা করার জন্য। বিকেলে খালি হাতে হাবড়া ফিরতাম। সকালে ৮:৫৫-র হাবড়া লোকালেই পরিচয় হয়েছিল রাজুদার সাথে। আরেক পাগল লাল-হলুদ সাপোর্টার। রাজুদা শুধু নিজে খেলা দেখতে যায় তা নয়, পাড়ার বাচ্চাদেরও খেলা দেখাতে নিয়ে যায়। বৌদি আবার ওদের রাস্তার খাবার বানিয়ে দেয়। রাজুদার যেদিন ছেলে হল ফোন করে বললো, “ভাই ছেলের নাম রাখসি র‍্যান্টি”। র‍্যান্টি সে বছরই লাল-হলুদ জার্সিতে মাঠে নেমেছিল। ট্রেন অবরোধে আটকে পড়ে বৃষ্টির মধ্যে বাইক নিয়ে হাবড়া থেকে ইস্টবেঙ্গল মাঠ গিয়ে খেলা দেখেছি রাজুদা আর আমি।

ফেড কাপের আগে রাজুদা একদিন দমদমে নেমে হঠাৎ বললো, “ভাই, ভাবছি শিলিগুড়ি যাবো। তুই কাকুর সাথে একবার খেলার টিকিটের ব্যাপারে কথা বল। সেমিফাইনাল আর ফাইনাল। আমি ট্রেনের টিকিটটা দেখে নিচ্ছি। তুই আর আমি যাবো।” রাজুদা তো পাগলই, শুনে আমারও মাথায় পোকা নড়ে গেল। বললাম, “চলো শিলিগুড়ি”। বাবার তখন শিলিগুড়িতে পোস্টিং। থাকা, খাওয়া নিয়ে চাপ হবে না। শুধু খেলার টিকিটটা জোগাড় করতে হবে। শুনে বাবা বললো, “টিকিটের জোগাড় হয়ে যাবে, কিন্তু সেমিফাইনালের রাতেই তো আবার আমি বাড়ি ফিরবো! তোরা থাকবি কোথায়?”

শুনে মন ভেঙে গেল। তখন, বাসের ভাড়া বাঁচাতে হেঁটে যাই প্রায়ই, যাতে খেলার টিকিটের টাকাটা থাকে পকেটে। আর শিলিগুড়িতে হোটেল ভাড়া দিয়ে থাকার স্বপ্ন দেখাও পাপ আমার। কী করা যায়? এদিকে সে দিন দুপুরেই রাজুদার ফোন, “যাওয়ার টিকিট হয়ে গেছে ভাই”। মনটা খারাপ, ইডেনের পাশ দিয়ে হাঁটছি, হঠাৎ নন্দন দা’র কথা মনে পড়লো। আমার পুরোনো সহকর্মী। যদিও মোহনবাগানি, কিন্তু, ভাইয়ের মতো স্নেহ করে আমায়। নন্দন দাও যাচ্ছিল শিলিগুড়ি ফেডকাপের জন্য। ওদের হোটেলেই গুপি করে দু’দিন ম্যানেজ হয়ে গেল। এ বার আর আমারে আটকায় কোন হালায়??

যাওয়ার দিন, আমি শিয়ালদা পৌঁছে গেলাম সাড়ে নটা নাগাদ। রাজুদাও শিয়ালদা আসবে। ট্রেনের টিকিট ওর কাছেই আছে। শিয়ালদহ পৌঁছে শুনি রাজুদার দেরি হবে আরেকটু। দার্জিলিং মেল প্ল্যাটফর্মে ঢুকে গেল। তখনও রাজুদার দেখা নেই। আমাদের এস-৪ এর টিকিট ছিল। আমি গিয়ে দাঁড়ালাম এস-৪ এর সামনে। চারিদিকে প্রচুর ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টার। সবাই শিলিগুড়ি যাচ্ছে। আনন্দ আর উৎকন্ঠা একসাথে হচ্ছিল তখন আমার। ঘড়িতে ১০:০৫। হর্ন দিয়ে ছেড়ে দিল দার্জিলিং মেল। তখনও দেখা নেই রাজুদার। ফোনেও পাচ্ছি না। এস-৪ কামরাটা বেরিয়ে গেল। এস-৬টা যখন বেরোচ্ছে রাজুদাকে আবার ফোন করলাম। এ বারও ধরলো না। ফোনটা পকেটে রেখে ব্যাগটা নিয়ে সামনের চলন্ত এস-৭ এ উঠে পড়লাম। মনে মনে বললাম, “যা হবে, দেখা যাবে। জয় ইস্টবেঙ্গল”।

উঠেই দেখলাম সব আমাদের সাপোর্টার। আমায় এরকম চলন্ত ট্রেনে উঠতে দেখে একজন জিজ্ঞেস করলো, “কী রে? পড়ে যেতিস তো?” আমি পুরো ঘটনাটা বললাম। শুনে আমায় জড়িয়ে ধরলো। বললো, “এই কোচে আমাদের ১৭টা টিকিট আছে। তুই আমাদের সাথেই যাবি।” আহা, সম্পূর্ণ অচেনা অজানা দুটো মানুষ কীভাবে এক মুহুর্তের মধ্যে আপন হয়ে গেল লাল-হলুদ রঙ দুটোর জন্য।

সে দিন শিয়ালদহ ঢোকার মুখে দাঁড়িয়ে পড়া ডাউন কৃষ্ণনগর লোকাল থেকে রাজুদা লাইনে নেমে পড়েছিল। লাইন দিয়ে দৌড়ে এসে প্ল্যাটফর্মে ওঠে। অফিসের একটি ছেলে অপেক্ষা করছিল রাজুদার ব্যাগটা নেবে বলে। দেরি হয়ে গেছিল বলে রাজুদা টাকাভর্তি ব্যাগ ৯-এ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো গৌড় এক্সপ্রেসের গার্ডের হাতে দিয়ে চলন্ত দার্জিলিং মেলে ওঠে। এত কান্ড করে শিলিগুড়ি পৌঁছে ফাইনালের রাতে যখন ইস্টবেঙ্গল ফেডারেশন কাপ জিতলো, সব কষ্ট, ঝামেলা, না পাওয়াগুলো হারিয়ে গেল। আমরা তো ওই লাল-হলুদ সমর্থক। আবেগে বাঁচি, আবেগে মরি।

Comments are closed.