বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭

চলে যাওয়ার সাত বছর, সাতের দশকের ময়দানের এই গোলকিপারকে মনে রাখেনি তিন প্রধান

দেবাশিস সেনগুপ্ত

সালটা ১৯৭৬। অক্টোবর মাস। পুজোর ছুটিতে বাবার কর্মস্থল দার্জিলিংয়ে গিয়ে আলাপটা জমল। তখন সেখানে চলছিল দার্জিলিং গোল্ডকাপের খেলা। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে খেলা হচ্ছিল দুই প্রধানের। সেমিতে মোহনবাগানের সঙ্গে এরিয়ানের খেলা। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে খেলা জর্জ টেলিগ্রাফের। সেমিফাইনালে মোহনবাগান বনাম এরিয়ানের ম্যাচের প্রায় একঘন্টা আগে মাঠে পৌঁছে লাইনে না দাঁড়িয়ে গেটের বাইরে অপেক্ষা করছিলাম খেলোয়াড়দের দেখব বলে। টিম এল টিমবাসে চড়ে। হঠাৎ একজন খেলোয়াড় দেখি ডাকছেন। চিনে ফেললাম মুহূর্তে। মোহনবাগানের অতিরিক্ত গোলকিপার। মাসখানেক আগে হাওড়া জেলা দলের হয়ে হুইলার শীল্ডে খেলতে এসেছিলেন বহরমপুরে। প্রথম আলাপটা ওখানেই হয়েছিল। রোজই প্রায় কথা হত ওঁনার সঙ্গে বহরমপুরে। তা সেদিনও প্রায় কুড়ি মিনিট কথা হলো ওঁনার সাথে দার্জিলিংয়ে।

তাঁর পোশাকি নাম ছিল সন্তোষ বসু। ডাকনাম সন্তু। সত্তর দশকের শুরুর দিক থেকে আশির দশকের শুরুর দিক অবধি কলকাতার মাঠ আলো করা গোলকিপারদের মধ্যে তিন প্রধানেই খেলা গোলকিপার ছিলেন গুটিকয় (তরুণ বসু আর ভাস্কর গাঙ্গুলী ছিলেন অন্যতম)। তারই মধ্যে একজন ছিলেন সন্তোষ বসু। দু’বছর পরে ইউনিয়ন ব্যাঙ্কের ইন্ডিয়া এক্সচেঞ্জ প্লেস শাখায় যোগ দিয়ে দেখি সেখানেই চাকরি করেন সন্তোষ বসু। সবার কাছে তিনি সন্তুদা। ডাকতাম সন্তুদা বলেই। হাওড়ার বাসিন্দা সন্তুদার দেওয়া ডে স্লিপ নিয়ে কতদিন যে মোহনবাগান মাঠে খেলা দেখতে যাওয়া হতো, তা আজ ইতিহাস। সহকর্মীদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও স্নেহ ছিল উল্লেখযোগ্য।

সত্তর দশকের কলকাতা ফুটবলের ইতিহাস সাক্ষী আছে, ১৯৭৬, ১৯৭৮ আর ১৯৭৯তে মোহনবাগান, ১৯৭৭য়ে ইস্টবেঙ্গল আর ১৯৮০তে মহমেডান গোলকিপারের জার্সি সন্তোষ বসুকে কেউ ডেকে ডেকে দেয়নি। সম্পূর্ণ নিজের যোগ্যতায় মাথা উঁচু করে খেলে গেছেন পি কে ব্যানার্জী, অমল দত্ত এবং আরও বিখ্যাত কোচেদের অধীনে। দীর্ঘদেহী সন্তোষ বসুর আউটিং আর গ্রিপিং ছিল খুব ভাল। উঁচু বলে নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক সন্তোষ বসুও কলকাতা লিগ জয়ী দলের সদস্য ছিলেন টানা চারবার (১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯)। যার মধ্যে তিনবার (১৯৭৬, ১৯৭৮ আর ১৯৭৯) তাঁর গায়ে ছিল মোহনবাগানের জার্সি আর ১৯৭৭ সালে লিগ জয়ী দলের নাম ছিল ইস্টবেঙ্গল। ১৯৮০র পরে ১৯৮১তে ছোট টিমে চলে যান তিনি। খেলেন সালকিয়া ফ্রেন্ডস আর রেলওয়ে এফ. সি-র হয়ে। খেলা ছাড়ার পরে কোচিংয়েও এসেছিলেন তিনি। বেশ কয়েক বছর সালকিয়া ফ্রেন্ডসের কোচ ছিলেন তিনি। আজকের বহু লব্ধপ্রতিষ্ঠ ক্রিকেটারের ও ফুটবলারের স্টাইপেন্ডের বিনিময়ে ইউনিয়ন ব্যাঙ্কের হয়ে খেলার নেপথ্যে নায়ক ছিলেন সন্তোষ বসু। এই তালিকায় এক সময় ছিলেন মনোজ তিওয়ারিও।

সেই সন্তোষ বসু আকস্মিক ভাবে মাত্র ৫৭ বছর বয়সে মারা যান। জ্বর নিয়ে ভর্তি হন হাসপাতালে। ক্রমশ স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় শুক্রবার ২৫ নভেম্বর ২০১১ তারিখে তাঁকে তাঁর বাড়ির লোকেরা বন্ড দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন অন্য হাসপাতালে। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বেরোনোর মুখে গাড়িতেই ওনার মৃত্যু হয়। সন্তোষ বসুর প্রয়াণের খবর আসার পর শোকস্তব্ধ ময়দানে মূহ্যমানতা ছেয়ে বসে।

তাঁর সহ খেলোয়াড়দের প্রতিক্রিয়া ছিল এইরকম:-

সুব্রত ভট্টাচার্য : “ছিয়াত্তরে মোহনবাগানে চারটি ট্রফি জয়ের সময় প্রথম দলে ছিল ও। ভাবতে পারছি না, সন্তোষ নেই।”

মিহির বসু (সাতাত্তরে ইস্টবেঙ্গলে খেলেছেন সন্তোষের সঙ্গে)- তাঁর প্রাক্তন রুমমেটের জন্য এতটাই কাতর হয়ে পড়েন যে কিছু বলতেই পারেন নি।

রঞ্জিত মুখোপাধ্যায়: একই ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন ও খেলতেন সন্তোষের সঙ্গে। এক টিমে খেলেছেন ১৯৭৭ আর ১৯৭৯ সালে। তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে, সন্তোষ নেই।

বিস্মিত ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায় (ইস্টবেঙ্গল ও বাংলায় খেলেছেন সন্তোষের সঙ্গে) – “ভাল মানুষ। বিনয়ী। লম্বা বলে দারুণ খেলত। ক’দিন আগেও আড্ডা মেরেছি। বিশ্বাস হচ্ছে না।”

ময়দানে এক সময় চুটিয়ে খেলেছেন সন্তোষ বসু। কিন্তু ময়দান হয়তো তাঁকে মনে রাখেনি। এটাই ময়দানের সংস্কৃতি। আজ যাঁকে মাথায় তুলে নাচে, কাল হয়তো ছুঁড়ে ফেলে দেয়। আর তাই কালের নিয়মে আরও অনেক বিখ্যাত খেলোয়াড়রা এসেছেন। ময়দান ভুলে গেছে এই দীর্ঘদেহী গোলকিপারকে। কিন্তু যাঁরা তাঁর সঙ্গে পেয়েছেন, তাঁদের স্মৃতিতে সন্তুদা থেকে যাবেন চিরকাল।

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন 

Comments are closed.