স্প্যানিশ জাদুতেই বদলে গেছে মোহনবাগান, নৌকো এগিয়ে চলেছে চ্যাম্পিয়নশিপের বন্দরে

ঠিক কী কী কারণে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে মোহনবাগান। সামনে যে প্রতিপক্ষই আসুক, তাকে হেলায় উড়িয়ে দিচ্ছে। কী জাদুকাঠি রয়েছে কিবু ভিকুনার হাতে? নাকি কোনও জাদুকাঠি নয়, পুরোটাই পরিশ্রম আর পরিকল্পনার ফসল।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দেবার্ক ভট্টাচার্য

    তিকিতাকা, না রন্ডো, নাকি অমল দত্তের বিখ্যাত ডায়মন্ড সিস্টেমের ঝলক….ঠিক কোন স্টাইলে খেলান কিবু ভিকুনা? এটাই বর্তমানে লক্ষ লক্ষ মোহনবাগান সমর্থকদের আলোচনার বিষয়। শুধু বাগান সমর্থকরা কেন, ফুটবল প্রিয় যে কোনও মানুষ এখন মজেছেন বাগানের এই খেলায়। কিন্তু শুধুই কি মাঠের মধ্যে যেটা হয়, তার ফলেই খেলা আমূল বদলে যায়? নাকি মাঠের বাইরের কিছু বিষয়ের প্রভাব থাকে এর মধ্যে? সবটাই কি কিবু ভিকুনার তৈরি? নাকি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাপোর্ট স্টাফ সবার ভূমিকা রয়েছে বাগানের এই অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার পিছনে।

    এই বিষয়ে আলোচনার আগে একটা ছোট্ট ঘটনা তুলে ধরা যাক। কল্যাণী স্টেডিয়ামে ভ্যালেন্টাইন্স ডে’তে চলতি আইলিগের সবথেকে বড় জয় পেয়েছে মোহনবাগান। তারপরেই ড্রেসিংরুমে ঠিক কী হল? দেখা গেল ফুটবলাররা বসে রয়েছেন। কেউ মাটিতে, কেউ বেঞ্চে। সঙ্গে কোচ কিবু ভিকুনা, সাপোর্ট স্টাফ-সহ কর্মকর্তারা। সামনের জায়ান্ট স্ক্রিনে একের পর এক ভিডিও ফুটে উঠছে। প্রথম দেবজিৎ, তারপর পাপা বাবাকার দিওয়ারা, ফ্রান মোরান্তে, ফ্রান গঞ্জালেজ, জোসেবা বেইতিয়া, ধনচন্দ্র সিং, আশুতোষ মেহতা হয়ে ভিডিও থামল কিবু ভিকুনাতে গিয়ে। ভ্যালেন্টাইন্স ডে’তে তাঁদের শুভেচ্ছা জানালেন স্ত্রী, বান্ধবীরা। আর তখন টাফ গঞ্জালেজও চোখের জল সামলাতে পারছেন না। সবাই একে অন্যের ভিডিওতে হাসছেন, হাততালি দিচ্ছেন, জড়িয়ে ধরছেন।

    এটাই হয়তো ছবি। এই ছবিটাই হয়তো বলে দেয় কেন এত সফল হচ্ছে মোহনবাগান। কেন ফুটবলাররা একটা ছন্দে খেলছেন। কেন জেতার এত প্রবল ইচ্ছে। ফুটবলটা যে টিমগেম, সেটা কেন বারবার প্রমাণ করছেন তাঁরা।

     

    ২০১৪ সালে জার্মানি যখন বিশ্বকাপ জেতে তখন জার্মান কোচ জোয়াকিম লো বলেছিলেন, “আমার দলে কোনও মেসি নেই। কিন্তু আমার দলে অনেকগুলো ফিলিপ লাম, সোয়াইন্সটাইগার আছেন।” তাঁর কথার মানে জার্মানিতে হয়তো একক দক্ষতায় খেলা শেষ করার কোনও ফুটবলার নেই, কিন্তু অনেকগুলো ফুটবলার আছেন, যাঁরা একটা দল হিসেবে খেলতে পারেন। আর একক প্রতিভাকে যে দলগত প্রতিভার কাছে হারতে হয়, তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে।

    কোন কোন ক্ষেত্রে বাকিদের থেকে এগিয়ে এই দলটা?

    প্রথমেই বলা যেতে পারে নিজের সম্পূর্ণ একটা অন্য ধারা ভারতের মাটিতে নিয়ে এসেছেন স্প্যানিশ কিবু। এই খেলা ভারতের মাটিতে বহুদিন দেখা যায়নি। এই দলের প্রধান বিষয় হল প্রেসিং ফুটবল। নিজেদের পায়ে বল থাকলে পাস খেলে খেলে সামনের দিকে এগোও। আর যখন প্রতিপক্ষের পায়ে বল, তখন সেই বল কাড়তে ঝাঁপিয়ে পড়। বিপক্ষকে এক ফোঁটাও সুযোগ দিও না। এই এক মন্ত্রেই সফল বাগান। আইলিগের প্রথম থেকে এই একই ছবি দেখা গিয়েছে। শুধুমাত্র প্রথম একাদশের ফুটবলাররা নন, রিজার্ভ বেঞ্চও এই সিস্টেমের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। আর তাইতো গতকাল ১০ জন প্রায় ৩০ মিনিট খেলে দেওয়ার সময় একবারও মনে হয়নি একজন ফুটবলার কম রয়েছে মাঠে। এটাই কিবুর সাফল্য। সেইসঙ্গে মাঠের বাইরে মাটির মানুষ কিবু। অহঙ্কার দেখান না। বাস্তবে থাকতে চান। তিনি জানেন, লিগ চ্যাম্পিয়ন হলে তবেই সবাই তাঁকে মনে রাখবে। সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছেন বাগানের হেডস্যার।

    সেইসঙ্গে প্রশংসা প্রাপ্য সাপোর্ট স্টাফদের। যেভাবে ম্যাচের পর ম্যাচ ফুটবলাররা সুস্থ হয়ে খেলছে, তার কৃতিত্ব কিন্তু তাঁদেরই। এই বয়সেও আশুতোষ মেহতা কিংবা ধনচন্দ্র গতিতে পরাস্ত করছেন তাঁদের থেকে অনেক ছোট প্লেয়ারকে। এই ম্যাচ ফিটনেস, স্ট্রেন্থ ধরে রাখতে পারছে বলেই সফল হচ্ছে বাগান। জানুয়ারি মাসের সেরা কোচ হওয়ার পরেও তাই কিন্তু কিবু সেই ট্রফি সাপোর্ট স্টাফদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন।

    মোহনবাগানের এই সাফল্যের আর একটা কৃতিত্ব প্রাপ্য কর্মকর্তাদেরও। জানুয়ারির ট্রান্সফার উইন্ডো তাঁরা যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তা বোধহয় আর কোনও দল করতে পারেনি। পাপা বাবাকার দিওয়ারা ও তুরসুনভের অন্তর্ভুক্তি এই দলকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। সত্যিই এই বছর বাগানের বিদেশিরা বাকি দলগুলির তুলনায় অনেক এগিয়ে। আর শুধু বিদেশি প্লেয়াররাই নয়, সঙ্গে রয়েছেন নওদম্বা নওরেম, শেখ সাহিলের মতো তরুণ ভারতীয়রা। এই দলে এত ভাল ফুটবলার রয়েছে, যে চুলোভার মতো প্লেয়ারকে রিজার্ভ বেঞ্চে বসে থাকতে হচ্ছে।

    তবে ভাল প্লেয়ার থাকলেই কিন্তু লিগ জেতা যায় না। তার জন্য দুরকার একটা সুস্থ ড্রেসিং রুম। সেটা এবার বাগানে রয়েছে। এই ফুটবলাররা একে অন্যের সাফল্য উপভোগ করেন। কেউ স্বার্থপর খেলা খেলেন না। তাঁরা জানেন, আসল কথা লিগ জয়। না জিততে পারলে কিন্তু কেউ ব্যক্তিগত প্রতিভার দাম দেবে না, আর এই টিমগেমটা দলের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারাই হয়তো কিবু ভিকুনার সবথেকে বড় সাফল্য। এই টিমগেমের ঝলক দেখা যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। মাঠের মধ্যে খেলায়, ড্রেসিং রুমে। আর তাইতো তরতরিয়ে এগিয়ে চলেছে মোহন-তরী। আরও এক আইলিগের দিকে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More