রঞ্জি ট্রফিতে সর্বোচ্চ উইকেট নিয়েও জায়গা হয়নি ভারতীয় দলে, ভুল সময়ে ভুল দেশে জন্মেছিলেন রাজিন্দর গোয়েল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দেবাশিস সেনগুপ্ত

    ২৩শে ডিসেম্বর ১৯৫৮ থেকে ৯ই মার্চ ১৯৮৫ – টানা ২৭টি মরশুম জুড়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলা, ১৫৭টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে ৭৫০টি উইকেট নেওয়া, রঞ্জি ট্রফিতে আজও রেকর্ড হয়ে থাকা সর্বোচ্চ ৬৩৭টি উইকেট নেওয়া, এতকিছুর পরেও একজন বাঁহাতি অর্থোডক্স অফস্পিন বোলারের জন্য ভারতীয় দলের দরজা না খুললে তাঁর সে জন্য আর কি করার থাকে? করার থাকে একটিই কাজ। তাঁর ভারতীয় দলের দরজা আগলে দাঁড়িয়ে থাকা বিষেণ সিং বেদীকে এড়িয়ে অন্য টাইম জোনে জন্মানো। তাঁর হাতে ছিল না বলে সেটা তিনি করে উঠতে পারেননি। আর তাই ভারতের হয়ে কোনও দিন কোনও টেস্ট না খেলেই ক্রিকেট কেরিয়ারে দাঁড়ি টানতে হয়েছিল হরিয়ানার ক্রিকেট গর্ব রাজিন্দর গোয়েলকে। গতকাল ২১শে জুন ২০২০ জীবনের পিচ থেকেও হারিয়ে গেলেন দীর্ঘদিন ক্যান্সার আক্রান্ত ৭৭ বছর ৯ মাস বয়সী ভারতীয় ক্রিকেটের সম্ভবত সবচেয়ে আনসাং সৈনিক রাজিন্দর গোয়েল।

    তাঁর জন্ম হয়েছিল ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের নারওয়ানাতে ১৯৪২ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর তারিখে। তাঁর বাবা ছিলেন ভারতীয় রেলের এক সহকারি স্টেশন মাস্টার। রোহতকে কাটে তাঁর স্কুল আর কলেজ জীবন। ১৯৫৭ সালে ১৫ বছরের রাজিন্দরের আন্তঃঅঞ্চল স্কুল ক্রিকেটের ফাইনালে ৪টি উইকেট নেওয়ার উপর ভর করে পশ্চিমাঞ্চলকে হারিয়ে টুর্নামেন্ট জিতে নিয়েছিল উত্তরাঞ্চল।

    প্রথম সারির ক্রিকেটে রঞ্জি ট্রফিতে ১৯৫৮-৫৯ সালে প্রথম অভিষেক হয় তাঁর ১৬ বছর বয়সে, পাতিয়ালার হয়ে। এক বছর পরেই রাজ্য বদলে চার বছরের জন্য (১৯৫৯-৬০ থেকে ১৯৬২-৬৩) তিনি রঞ্জি খেলেন দক্ষিণ পাঞ্জাবের হয়ে। পরের দশ বছর তিনি রঞ্জি খেলেছিলেন দিল্লির হয়ে (১৯৬৩-৬৪ থেকে ১৯৭২-৭৩)। এবং সবশেষে হরিয়ানার হয়ে তাঁর রঞ্জি খেলা ছিল বারো বছরের জন্য (১৯৭৩-৭৪ থেকে ১৯৮৪-৮৫)। ৯ই মার্চ ১৯৮৫ তারিখে, ৪৩ বছর বয়সে অবসরের আগে চার রাজ্যের হয়ে রঞ্জি ট্রফি আর উত্তরাঞ্চলের হয়ে দলীপ ট্রফি মিলিয়ে ১৫৭টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে তাঁর উইকেট সংখ্যা ছিল ৭৫০, যার মধ্যে রঞ্জি ট্রফিতেই ছিল ৬৩৭টি উইকেট।

    ধারাবাহিক ফর্ম এবং ক্রিকেটের জন্য প্যাশন ছাড়া এটা সম্ভব ছিল না। ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের বোলিংয়ে তাঁর বিকল্প ওই ২৭ বছরে খুঁজে পায়নি ভারতীয় ক্রিকেট। নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ আর মাপা ফ্লাইট ছিল তাঁর অস্ত্র। যার পিছনে ছিল নিরলস পরিশ্রম, প্র্যাকটিস আর ব্যাটসম্যানদের মানসিকতা বোঝা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে নিরন্তর প্র্যাকটিস ছাড়া লাইন আর লেংথে অভ্রান্ত থাকার আর কোনও বিকল্প হয় না। ১৫৭টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে ১০৩৭ রান করার পাশাপাশি নেওয়া ৭৫০টি উইকেটের মধ্যে ১৮ বার ম্যাচে ১০টি উইকেট এবং ৫৯ বার ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন হরিয়ানার এই বাঁহাতি স্পিনার। উইকেট নেওয়ার নিরিখে তাঁর পরবর্তী দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পদ্মাকর শিভালকার ও শ্রীনিবাস ভেঙ্কটরাঘবনের উইকেটের সংখ্যা ছিল অনেক পিছনে, যথাক্রমে ৫৮৯ ও ৫৩০। ভি ভি কুমারের ৪১৭ রঞ্জি উইকেটের রেকর্ড ১৯৭৮-৭৯ সালে ভেঙে দেবার পরে তাকে আজ অবধি কেউ ছুঁতে পারেননি রঞ্জিতে নেওয়া উইকেট সংখ্যার বিচারে। মোট ১৫ বার রঞ্জিতে মরশুমে ২৫ বা তার বেশি উইকেট নিয়েছিলেন রাজিন্দর গোয়েল, যার মধ্যে ছিল তাঁর কেরিয়ারের শেষ ৯ বছর, একটানা (১৯৭৬-৭৭ থেকে ১৯৮৪-৮৫)। কেরিয়ারের শেষ বছরেও (১৯৮৪-৮৫) তিনি নিয়েছিলেন ৩৯টি উইকেট।

    ১৯৭৫-৭৬ সালের দলীপ ট্রফিতে মাইকেল দালভি-গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ-ব্রিজেশ পটেল-রজার বিনি-কৃষ্ণস্বামী-আবিদ আলি-সৈয়দ কিরমানি সমৃদ্ধ দক্ষিণাঞ্চল তাঁর ঘূর্ণি সামলাতে না পেরে তাঁকে দিয়েছিল ম্যাচে ১২ উইকেট, ১৩৪ রানে (প্রথম ইনিংসে ৯৮/৭ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৬/৫)।

    তবে চূড়ান্ত সাফল্য তাঁর সঙ্গে লুকোচুরি খেলে গেছে চিরদিন। নিজের সেরা বোলিং সামর্থ্য উজাড় করে দিয়েও সুযোগ হয়নি রঞ্জি ট্রফি জেতার, তিনবার ফাইনাল খেলেও। পূর্ণ হয়নি ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দলে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার স্বপ্নও। কারণ ১৯৬০ সাল থেকে ভারতীয় দলে পাকাপাকি জায়গা করে নিয়েছিলেন বিষেণ সিং বেদী। যদিও অনেকেই নানা স্তরে প্রশ্ন তুলেছিলেন রাজিন্দর গোয়েলের জাতীয় দলে সুযোগ না পাওয়া নিয়ে। অবশেষে এসেছিল শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে একটি বেসরকারি টেস্ট ম্যাচ খেলার সুযোগ, ১৯৬৪-৬৫ সালে। চারটি উইকেটও পেয়েছিলেন সে ম্যাচে। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না তার সরকারি টেস্ট দলে সুযোগ পাওয়ার ব্যাপারে। ১৯৭৪-৭৫ সালে সফররত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে বেঙ্গালুরু টেস্টের আগে প্রকাশ্যে ভারতীয় বোর্ডের বিরুদ্ধে বিবিসি-তে বক্তব্য রাখায় শৃঙ্খলাভঙ্গজনিত কারণে বাদ পড়েন বিষেণ সিং বেদী আর ১৪ জনের দলে আসেন রাজিন্দর গোয়েল। তবু প্রথম একাদশের বাইরেই থাকতে হয় তাঁকে শেষ পর্যন্ত, চরমতম অবিচারের দৃষ্টান্ত হয়ে। তারপরে ১৯৭৯-৮০ সালে সফরকারি কিম হিউজের অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে উত্তরাঞ্চলের হয়ে তাঁর বোলিং ফিগার ছিল ১০২/৬ ও ৪৩/৩। তবু আর সুযোগ আসেনি ভারতীয় দলে খেলার, বেদীর অবসরের পরে দিলীপ দোশী টিমে জায়গা পাকা করে ফেলায়। নিজের ক্রিকেট কেরিয়ার নিয়ে নিজেও দুঃখ করে রাজিন্দর গোয়েল একবার বলেছিলেন, ‘আমি ভুল সময়ে এসে পড়েছি।” আসলে ভুল দেশে ভুল সময়ে জন্মের খেসারত দিতে হয়েছিল তাঁকে। অন্য যে কোনও দেশে জন্মালে হাসতে হাসতে প্রথম দলে ঢুকে যেতেন রাজিন্দর গোয়েল।

    কেরিয়ারের শেষেও মাঠের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অনেক দিন। খেলোয়াড় জীবনের পর পুরুষ ও মহিলা দুই বিভাগের বেশ কিছু ম্যাচেই তিনি আম্পায়ার ছিলেন। নিজে রঞ্জি না পাবার দুঃখ মুছে ফেলেছিলেন তিনি ১৯৯১ সালে, হরিয়ানার টিম সিলেকশন কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে। সেবার কপিল দেবের হাত ধরে রঞ্জি জিতেছিল হরিয়ানা। তাঁর ছেলে নীতিন গোয়েলও হরিয়ানার হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছেন।

    ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর অনস্বীকার্য অবদানের জন্য ২০১৭ সালে বিসিসিআই তাঁকে আজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ (লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট) সি.কে. নাইডু পুরস্কারে ভূষিত করে। কিন্তু জীবনের সেরা পুরস্কার তিনি পেয়েছিলেন ভুখা সিং যাদব নামের এক ফ্যানের কাছ থেকে, যিনি পেশায় ছিলেন ডাকাত। ১৯৮৩-৮৪তে রঞ্জি সেমিফাইনালে মুম্বইয়ের চন্দ্রকান্ত পন্ডিতের উইকেট ছিল তাঁর রঞ্জিতে ৬০০তম উইকেট। এর পরে ১৯৮৫র গ্রীষ্মে গোয়ালিয়র জেল থেকে পাওয়া একটি খামবন্ধ চিঠির খাম ভয়ে খুলতে পারছিলেন না তাঁর বাড়ির কেউ। অনেক সাহস করে রাজিন্দর গোয়েলই সেই খাম খোলেন এবং মৃদুমন্দ হাসতে থাকেন, যেভাবে তিনি হাসতেন উইকেট নেওয়ার পরে। উৎকণ্ঠিত পরিবারকে আশ্বস্ত করে তিনি জানান যে, ডাকাতির জন্য গোয়ালিয়র জেলে বন্দি তাঁর এক ফ্যান ভুখা সিং যাদব তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ওই চিঠিতে, রঞ্জিতে প্রথম বোলার হিসেবে ৬০০ উইকেট নেবার জন্য। “Other side of the law” থেকে আর কোনও ক্রিকেটার কোনওদিন ফ্যানমেল পেয়েছেন কিনা, ইতিহাসই বলতে পারে। রাজিন্দার গোয়েল তাঁর ওই ফ্যানকে প্রতি উত্তর পাঠিয়েছিলেন গোয়ালিয়র জেলে।

    “আইডলস” বইয়ে সুনীল গাভাসকার তাঁকে নিয়ে “The Smiling Assassin’ শিরোনামে লিখেছিলেন “I have never been able to feel comfortable against his left hand spinners and Goel has been one who, because of his flatter trajectory, has not given me the opportunity to step down the track and drive.” তাঁর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ভারতীয় ক্রিকেট মহলে। শোক প্রকাশ করেছেন শচীন তেণ্ডুলকর, বিরাট কোহলি, রবি শাস্ত্রী, বীরেন্দ্র সেহওয়াগ, সুরেশ রায়না, রবিচন্দ্রন অশ্বিন থেকে বিষেণ সিং বেদীও। বিসিসিআই সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন “ভারতীয় ক্রিকেট এক বটবৃক্ষকে হারাল। ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে ৭৫০ উইকেট, বহু পরিশ্রমের ফসল।”

    ঘরোয়া টুর্নামেন্টের বাইরে খেলতে না পারায় তাঁর আক্ষেপ ছিল, আর্তনাদ ছিল না। যেভাবে খেলার সময় আর খেলা ছাড়ার পরেও চুপচাপ ছিলেন চিরকাল, তেমনই চুপচাপ চলে গেলেন ভারতের সর্বকালীন অন্যতম সেরা স্পিনার স্টেট ব্যাঙ্কের প্রাক্তন কর্মী রাজিন্দর গোয়েল। বিজয় থেকে সঞ্জয়, দুই মঞ্জরেকারের বিরুদ্ধেই বোলিং করা রাজিন্দর গোয়েল এর মাধ্যমেই বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর বিরাট স্ক্রীন প্রেজেন্স। কিছু কিছু আশ্রয় থাকে একান্তই নিজস্ব, কোনও বাহ্যিক শোরগোল যাকে ছুঁতে পারে না। ভারতীয় স্পিন বোলিংয়ের তেমনই এক চিরকালীন প্রশান্তির আশ্রয় হয়ে থেকে যাবেন “হাস্যমুখ ঘাতক” রাজিন্দর গোয়েল। ক্রিকেটের যদি কোনও দেবতা থাকেন, তিনি নিশ্চয়ই আজ আনমনে ভাবছেন যে ভুল দেশে ভুল সময়ে জন্মেছিলেন বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিন বোলিংয়ের নিরলস উদাসীন উপাসক রাজিন্দর গোয়েল।

    ভাল থাকবেন স্যার।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More