রানিগঞ্জের রাজার মাথায় রুপোর মুকুট! প্যারা-ব্যাডমিন্টনে বিশ্বজয়ীকে অবশ্য কেউ চেনে না

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

    প্রচারের দুনিয়ায় এই ধারা নতুন নয়। এক অংশে সব আলো একসঙ্গে পড়ে যাওয়ায় অন্য অংশগুলো অন্ধকারই থেকে যায়। অথচ সেই অন্ধকারেই হয়তো লুকিয়ে ছিল মণিমুক্তো!

    এমনটাই হয়েছে রাজা মোগত্রার সঙ্গে। রানিগঞ্জের যুবক রাজাও কয়েক দিন আগেই রুপো জয় করেছেন প্যারা-ব্যাডমিন্টনে। সুইৎজ়ারল্যান্ডের বাসেলে টুর্নামেন্টে দেশের হয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন তিনি। সেই টুর্নামেন্ট, যে টুর্নামেন্টে সোনা এনে দেশের ইতিহাসে সোনার অক্ষরে নাম লিখেছেন পিভি সিন্ধু। পিভি সিন্ধুর কয়েক দিন পরেই জানা গিয়েছিল প্যারা ব্যাডমিন্টনে সোনা জয় করা মানসী জোশীর কথা। সেই মানসীর পাশের কোর্টেই ‘ডোয়ার্ফ ক্যাটেগরি’তে খেলেছেন রাজা, পেয়েছেন রুপো। অথচ উচ্ছ্বাসের একটি কণাও এসে পৌঁছয়নি রাজার কাছে। খ্যাতির কথা ছেড়েই দেওয়া যাক।

    “প্যারা ব্যাডমিন্টনে দেশকে রুপো এনে দিলাম, আমিই প্রথম। একটা ফোন পর্যন্ত পাইনি জানেন? কেন্দ্রীয় স্তরে কারও প্রশংসা আশা করি না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী দূরের কথা, রাজ্যের কোনও এক জন মন্ত্রীও একটি শুভেচ্ছাবার্তা জানানোর সময় পাননি। কেউ হয়তো জানেনই না! অবশ্য জানেন না-ই বা বলি কী করে, না জানলে তো টাকার প্রতিশ্রুতি পেতাম না!”– রানিগঞ্জের শিয়ারশোল গ্রামের বাড়িতে বসে বলছিলেন রাজা। ছোট সাদামাঠা ঘরে, কাকু-কাকিমার সঙ্গে থাকেন রাজা। বাবা-মা মারা গেছেন। ব্যাডমিন্টনই ধ্যানজ্ঞান এখন। পরিবার পাশে রয়েছে, কিন্তু ওইটুকুনিই। ন্যূনতম প্র্যাকটিসটুকু করার জন্যও কেউ পাশে দাঁড়ায়নি তাঁর।

    টাকার প্রতিশ্রুতি কী রকম পেয়েছিলেন? প্রশ্ন করলে রাজা জানান, তিনি বছর দুয়েক আগে আন্তর্জাতিক স্তরে ব্রোঞ্জ মেডেল নিয়ে আসার পরে এক সাংবাদিক বন্ধুর মারফত খবর পান, আসানসোলের মেয়র তাঁকে ৫০ হাজার টাকা দেবেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি আসছেন চেক নিয়ে। সেইমতো অপেক্ষা করেন সকলে। তাঁর দেরি হচ্ছিল। তাই সরকারি সাহায্য পেয়ে কেমন লাগে সে বিষয়ে সাংবাদিক বন্ধুকে একটি প্রতিক্রিয়াও দিয়ে দেন রাজা। সে প্রতিক্রিয়া সম্প্রচারও হয়ে যায় সংবাদমাধ্যমে। কিন্তু তার পরে না এসেছে সেই টাকা, না এসেছে সেই মেয়রের একটিও ফোনকল।

    “আমার কোনও আলো নেই, কোনও প্রচার নেই। আমার কথা কেউ শোনার নেই। তাই আমায় সঙ্গে এ রকম প্রতারণা করা যায়।”– আক্ষেপ রাজার।

    আক্ষেপ অবশ্য একটা নয়। রানিগঞ্জে একটা প্র্যাকটিস করার জায়গা পর্যন্ত জোটেনি রাজার। ১৫-১৬ কিলোমিটার বাসে করে উজিয়ে হয় আসানসোল নয় দুর্গাপুরে প্র্যাকটিস করতে যেতে হয় তাঁকে। সপ্তাহে সাত দিন এই রুটিন। রানিগঞ্জের প্রশাসনকে বহুবার এ অসুবিধার কথা জানিয়েছেন রাজা। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর। এখন রাজা ভাবছেন, নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে যদি একটা ব্যাডমিন্টন কোর্ট বানানো যায়।

    শুধু কি তাই? একটা চাকরিও পাননি এখনও রাজা। তাঁর কথায়, “আমি যদি হরিয়ানা বা উত্তরপ্রদেশ থেকে খেলতাম, এতগুলো পদক আনলাম, কম করে কয়েক লক্ষ টাকা বেতনের চাকরি পেতাম। এই রাজ্যগুলো এত পিছিয়ে থাকা, এতরকম ঘটনা সামনে আসে এসব জায়গা থেকে, কিন্তু স্পোর্টস জগতে কারও কোনও প্রতিভা চাপা থাকে না সেসব রাজ্যে। এখানে সেসবের বালাই নেই। কেউ জানেই না কিছু, কেউ কোনও খবরই রাখে না। আপনি আমার পাড়া থেকে বাইরে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন, কেউ চেনে না রাজাকে।”

    রাজার দাবি, পিভি সিন্ধু এবং মানসী জোশী, দু’জনেই গোপীচাঁদ পুলেল্লার অ্যাকাডেমির ছাত্রী। সেজন্যই এত প্রচার, এত স্পনসর। সে জায়গায় রাজার কোনও অ্যাকাডেমিই নেই। সাই-তে থেকে প্র্যাকটিসের চেষ্টা করেছিলেন তিনি, সে সুযোগও হয়নি। রাজার খেলা দেখে কথা বলেছেন গোপীচাঁদ নিজেও। জানিয়েছেন, কোনও সাহায্য দরকার হলে পাশে থাকবেন।

    কিন্তু এসব অনেক দূরের কথা রাজার জন্য। সেই অবধি পৌঁছনোর জন্যও একটা ন্যূনতম প্রস্তুতি লাগে। প্রতিভাই শেষ কথা নয়। রাজা বলছিলেন, “বিদেশে যখন টুর্নামেন্ট খেলতে যাই, বিশ্বাস করবেন না লুকিয়ে থাকতে হয় আমায়। আমার জামা, জুতো– বাকিদের পাশে দাঁড়াতেই পারি না। লজ্জা করে। জামা-জুতোও ছেড়ে দিন। আমার সহ-খেলোয়াড়রা যেখানে পাঁচ-সাত হাজার টাকার শাট্ল কক ব্যবহার করেন, আমার শাট্ল ককের দাম হয়তো ১০০-২০০। খুব বেশি হলে ৫০০। তার পরেও তো লড়ে যাচ্ছি।”

    দেখুন, কী বলছেন রাজা।

    তবে ব্যাডমিন্টনের জগতে আসাটা কিন্তু পরিকল্পিত নয় রাজার। ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলতেন তিনি। একদিন হঠাৎই মাঠে ব্যাডমিন্টন খেলছিলেন, নজরে পড়ে যান আসানসোলের সুভাষ ইনস্টিটিউটের এক কোচের। তার পরেই খেলা ঘুরে যায়। ন্যাশনালে খেলার সুযোগ আসে। কিন্তু মজার কথা হল, রাজা তখনও জানতেন না, ‘প্যারা ব্যাডমিন্টন’ বলে একটা আলাদা ইভেন্ট অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য। সেখানে আলাদা ক্যাটেগরিতে খেলবেন তিনি। সেই ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে দুটো সোনা পান তিনি। সালটা ২০১৫। কিন্তু তার ওই অবধিই। তার পরে নেই কোনও প্রচার, নেই কোনও স্পনসর।

    ২০১৭ সালে ফের সুযোগ এল বেঙ্গালুরুতে ট্রায়াল দিয়ে, সাউথ কোরিয়ায় ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে যাওয়ার। “এই যে বিভিন্ন চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে যাওয়া, ট্রায়ালে যাওয়া, সেটার পয়সাও ছিল না আমার কাছে। বাড়ির লোকজন, বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে ধার করা। তার পরে প্রাইজ়মানি জিতে এসে ধার শোধ করা। এই ছিল আমার রুটিন।”– বলেন রাজা।

    সামনেই অলিম্পিক্সের আসর বসবে। প্যারা ব্যাডমিন্টনের দিকে তাকিয়ে আছেন বিশ্বতালিকায় পাঁচ নম্বরে থাকা ‘ডোয়ার্ফ ক্যাটেগরি’র খেলোয়াড় রাজা মোগত্র। এখনও জানেন না, সুযোগ পাবেন কিনা, পেলেও যাওয়া হবে কিনা। বাধা তো একটা নয়, বরং বাধাই বেশি। সে সব বাধায় ঢেকে থাকা আকাশের মধ্যে নক্ষত্রের মতো জ্বলে উঠেছে রাজার এক একটা পদক।

    সে আলো এসে পৌঁছয়নি রাজ্যবাসীর চোখে। ঘরের পাশে এ ভাবেই চাপা পড়ে রয়েছে বিশ্বের দরবার জয় করে আসা এক উজ্জ্বল প্রতিভা।

    ছবি ও ভিডিও: ইন্দ্রজিৎ ঘোষ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More