প্রিয় রন্টুর মৃত্যুদিনেই চলে গেলেন পিকে স্যার

সময় আজ কোথাও না কোথাও একই তারিখে মিলিয়ে দিল একদা গুরু-শিষ্য, প্রদীপদা-কৃশানুকে। সেখানে হয়তো ফুটবল শুরু হবে আবার, নতুন করে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দেবাশিস সেনগুপ্ত

    সতেরো বছর হল আজ। ২০শে মার্চ ২০০৩, কৃশানুর হারিয়ে যাওয়ার দিন। আর আজ ২০শে মার্চ ২০২০, না ফেরার দেশে চলে গেলেন পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়ও। অদ্ভুত এক সমাপতনে জড়িয়ে গেলেন আশির দশকের কলকাতা ফুটবলের দুই অন্যতম সেরা কোচ ও ফুটবলার। তাঁদের কথা এখানে রইল একসাথে।

    ১)
    ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৩। তখনও কলকাতা ছিল ফুটবলে আচ্ছন্ন। অনেকটাই পিছনে ক্রিকেট। তার চার মাস পরে বিশ্বকাপ ক্রিকেট জিতবে ভারত আর কলকাতার ফুটবলের জনপ্রিয়তায় একটু হলেও থাবা বসাবে ক্রিকেট।

    সন্ধেটা চোখের সামনে এখনও ভাসে। উপচে পড়া মোহনবাগান মাঠ। ফ্লাডলাইটে সন্তোষ ট্রফির ম্যাচ। বাংলা বনাম সার্ভিসেস। বাঁ দিকে নিজেদের লেফট হাফের জায়গায় প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ানো বলটা পেলো বাচ্চা ছেলেটা (১৯৮২-তেই ও প্রথম বড় দলে এসে চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছে ময়দানের)। সামনে ৩ জন। একটু পিছিয়ে এলো ও বলটা নিয়ে ডানদিকে কোনাকুণি। তারপর একটু এগিয়ে হাফটার্নে প্রায় ৩৫ গজ থেকে ওইটুকু চেহারার ছোট্ট বাঁ পা-টা একটা গোলা পাঠালো। গোলরক্ষককে নড়তে না দিয়ে (ডান পোস্ট কভার করেছিল স্বাভাবিকভাবেই) বাঁ পোস্ট আর বারের কোনা দিয়ে গোলে ঢোকে বলটা। ম্যাচটা ৬-০ জেতে বাংলা। আরও ১টা গোল ছাড়াও ৩টে অ্যাসিস্ট ছিলো ওর। আগের সাত-আট মাসে ওর খেলার জাদুতে আচ্ছন্ন হচ্ছিলাম, ওইদিন থেকে ওর ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম। ক্রমশ ওই ছেলেটা হয়ে গিয়েছিল আমার কৃশানু দে। আমার রন্টু।

    Image result for pk banerjee and krishanu dey

    পুরো আশির দশক আর নব্বইয়ের দশকের শুরুটা জুড়ে কলকাতার ঘেরা মাঠে বিকেল হলেই ম্যাজিক শুরু হত। ততক্ষণে শুকিয়ে আসা ভোরের শিশিরবিন্দু দু’চোখ কচলাতে কচলাতে সজল হয়ে যেত আবার। রেমপার্টের এক পায়ে খাড়া উপচে ভরা ভিড়টার সবকটা চোখ পলকহীন তাকিয়ে থাকত। তিনদিকের ঠাসা গ্যালারি ফলের তোয়াক্কা না করেই চোখে চোখে রাখত ছোট্টখাট্টো বাঁ পা টাকে। চোখে হলুদ দেখতেন প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার আর মিডফিল্ডাররা। কিন্তু চোখ ভরে দেখতেন প্রতিপক্ষ ফরোয়ার্ডরা। সময় থমকে গিয়ে মুচকি হাসত চোখ মেলে। বিস্ফারিত চোখে ফুটবল ঈশ্বর দেখতেন আর ভাবতেন ভুল দেশে ভুল সময়ে জন্মেছে ছেলেটা। বাঁ পায়ে তখন ড্রিবলিং করতেন কৃশানু দে। তখন এক একটা ছোট্ট মোচড়ে নিশ্চিত ‘না’ রদ হয়ে ‘হ্যাঁ’ হয়ে যেত মাঠে। কৃশানুর ডজের মতো। কৃশানুর চলে যাওয়ার মত। আশি-নব্বইয়ের ময়দান জানত। আট বছর ইস্টবেঙ্গলে (১৯৮৫, ১৯৮৬, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৮৯, ১৯৯০, ১৯৯১ ও ১৯৯৪) আর পাঁচ বছর মোহনবাগানে (১৯৮২, ১৯৮৩, ১৯৮৪, ১৯৯২ আর ১৯৯৩) খেলা কৃশানুকে খেলতে দেখা আশি-নব্বইয়ের ময়দান একশ বছর পরেও গর্ব করবে তাঁর খেলা নিয়ে।

     

    আজও ঝাপসা চোখদুটো দিয়ে স্পষ্ট দেখছি কৃশানুকে। মিষ্টি ডজ করতে করতে ওইতো বাড়াচ্ছে ঠিকানালেখা পাস, যা থকে গোল না করাই কঠিন। অথবা দূর থেকে কামানের গোলার মতো শটে গোল করছে গোলরক্ষককে নড়তে না দিয়ে। এখন প্রতিদিন স্পষ্টতর দেখছি কৃশানুকে। এই সুপরিকল্পিতভাবে কলকাতা তথা ভারতীয় ফুটবলকে শেষের দিকে ঠেলে দেবার দিনকালে। এটাকে “মিষ্টি ডজ” করার আজ আর কেউ নেই। কলকাতা তথা ভারতীয় ফুটবল শেষ হয়ে যাওয়াটা এখন সময়ের অপেক্ষা। ভবিতব্য। পারলে ক্ষমা করো, কৃশানু। মাঝে মাঝে মনে হয়, তোমার দিক দিয়ে ভালই হয়েছে। আজ থেকে সতেরো বছর আগে চলে যাওয়া “ভারতীয় মারাদোনা”কে অন্তত এই দিনগুলো দেখতে হয়নি।

    Image result for pk banerjee and krishanu dey

    রন্টু, পারলে দেখে নাও আজ, যেভাবে মাথা নিচু করে ড্রিবল করতে করতেও দেখে নিতে সহ খেলোয়াড়কে উঠে আসতে আর অভ্রান্ত পাসগুলো বাড়িয়ে দিতে তাদের দিকে। আজও সারাদিন তোমার জন্য চোখের জল ফেলছে কলকাতা তথা বাংলার মাঠ ময়দান। যেমন ফেলেছিল কুড়ি মার্চ দু’হাজার তিন-এ। মাত্র একচল্লিশে তোমার জীবনের মাঠ থেকে মৃত্যুর ড্রেসিংরুমে চলে যাবার দিনে। কলকাতা তথা বাংলা তার দু’চোখ দিয়ে আজও খোঁজে শুধু তোমার পা দু’টোকেই।

    ভাল থেকো, রন্টু।

    ২)

    কাকতালীয় হলেও সত্যি যে কৃশানু দে-র প্রয়াণের দিনটিই বেছে নিয়ে প্রদীপদা চলে গেলেন না ফেরার দেশে, আজ ২০শে মার্চ ২০২০ তারিখে। বয়স হয়েছিল ৮৩। বেশ কিছুদিনের গভীর অসুস্থতাজনিত কারণে আজ জীবনের নব্বই মিনিটের বাইরে চলে গেলেন ময়দানের পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়, যাঁর আত্মজীবনীর নাম ছিল “বিয়ন্ড নাইন্টি মিনিটস”।

    প্রদীপদার জন্ম ১৯৩৬ সালের ২৩ জুন, জলপাইগুড়িতে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর রক্তে ছিল ফুটবল। ১৯৫১ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিহারের হয়ে সন্তোষ ট্রফিতে খেলেন তিনি। ১৯৫৪ তে কলকাতায় চলে আসেন জামশেদপুর থেকে। কলকাতায় এসে কলকাতা ফুটবলে তাঁর প্রথম ক্লাব ছিল এরিয়ান ক্লাব। তারপরে টানা ১৩ বছর ( ১৯৫৫-১৯৬৭ ) তিনি খেলেছেন কর্মস্থল ইস্টার্ন রেলের হয়ে। তাঁর অধিনায়কত্বেই ১৯৫৮-তে কলকাতা ফুটবল লিগ চ্যাম্পিয়ন হয় ইস্টার্ন রেলওয়ে। এর ৬১ বছর পরে তিন প্রধানের বাইরে কোনও টিম হিসেবে পিয়ারলেস কলকাতা লিগ জেতে ২০১৯ সালে। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের হয়ে কার্যত খেলেননি। আর বড় ক্লাব নয়, প্রতিভা আর স্কিলই পায় সম্মান আর কুর্নিশ, কথাটা তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন মাঠের লড়াইয়ে।

    ভারতের হয়ে প্রদীপদা খেলেছেন তিনটি এশিয়ান গেমসে। ১৯৫৮র টোকিও এশিয়ান গেমস, ১৯৬২র জাকার্তা এশিয়ান গেমস ও ১৯৬৬র ব্যাঙ্কক এশিয়ান গেমস ।এর মধ্যে ১৯৬২র এশিয়ান গেমসে সোনা জিতেছিল ভারত। অলিম্পিকেও দারুণ পারফরম্যান্স ছিল তাঁর। তিনি ১৯৫৬-তে মেলবোর্ন অলিম্পিকে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। কোয়ার্টার ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ৪-২ গোলে ম্যাচ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর। তাঁরই নেতৃত্বে ১৯৬০এর রোম অলিম্পিকে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ১-১ ড্র করে ভারত। সেই ম্যাচে দেশের হয়ে সমতা ফিরিয়েছিলেন তিনিই। মারডেকা কাপেও তিনি রুপো (১৯৫৯ ও ১৯৬৪) ও ব্রোঞ্জ (১৯৬৫) এনে দিয়েছেন ভারতকে। ১৯৫৫-১৯৬৭ ভারতের হয়ে ৪৫টি ম্যাচ খেলে ১৪টি গোল ছিল উইঙ্গার পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়ের। এরপরে ঘন ঘন চোট আঘাত তাঁকে ১৯৬৭ সালে ফুটবল থেকে অবসর নিতে বাধ্য করে।

     

    ফুটবলার পিকে-র অবসর। এর পরে ২য় ইনিংস শুরু তাঁর কোচ হিসেবে আর ময়দানে ফুটবল চাণক্যর উত্থান। আর জমিয়ে দেওয়া কলকাতা ময়দানের ফুটবল-লড়াই। ইস্টবেঙ্গলের হয়ে ১১ বছর (১৯৭০-১৯৭৫, ১৯৮০, ১৯৮৩, ১৯৮৫, ১৯৮৮ আর ১৯৮৯) এবং মোহনবাগানের হয়ে ৮ বছর (১৯৭৬-১৯৭৯, ১৯৮৪, ১৯৯০, ১৯৯৪ আর ১৯৯৮) কোচিংয়ের পাশাপাশি এক বছর (২০০৪) মহামেডানের হয়েও কোচিং করিয়েছেন প্রদীপদা। তাঁরই জন্য সৃষ্টি হওয়া নতুন শব্দবন্ধ “ভোক্যাল টনিক” দিয়ে বারবার অনুপ্রাণিত করেছেন তিনি ফুটবলারদের। আর মাঠে গিয়ে আগুন ঝরিয়েছেন তাঁরা। ১৯৭২-১৯৮২ আর ১৯৮৫-৮৬তে ভারতীয় ফুটবল দলেরও কোচ ছিলেন তিনি। ১৯৮২ সালের দিল্লি এশিয়াডে তাঁর কোচিংয়ে মনে রাখার মত ফুটবল খেলেছিল ভারতীয় দল। সন্তোষ ট্রফিতে বাংলা দলেরও একদা কোচ ছিলেন তিনি। নিজের কোচিংয়ে টানা সাতবার কলকাতা লিগ (১৯৭০ থেকে ১৯৭৬) আর টানা আটবার আই এফ এ শিল্ড (১৯৭২ থেকে ১৯৭৯) জেতার প্রদীপদার অনন্য রেকর্ড আজও অক্ষুণ্ণ। আজকের বিদেশি কোচ নির্ভরতার ক্লাব ফুটবল সময়ে প্রদীপদাদের সময়টাকে মনে পড়ে আরও বেশি করে।

    ১৯৬১ সালে অর্জুন পুরস্কার, ১৯৯০ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়কে “বিশ শতকের সেরা ভারতীয়” ফুটবলার উপাধি দিয়েছিল আইএফএফএইচএস। তাঁকে ফিফা অর্ডার অফ মেরিট নামক ফিফার সর্বোচ্চ পুরস্কার দেওয়া হয়।

    সময় আজ কোথাও না কোথাও একই তারিখে মিলিয়ে দিল একদা গুরু-শিষ্য, প্রদীপদা-কৃশানুকে। সেখানে হয়তো ফুটবল শুরু হবে আবার, নতুন করে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More