জাকার্তার এশিয়াড থেকে ময়দানের ডাগআউট, পিকে মানে এক লম্বা ইতিহাস

যতদিন কলকাতার তথা ভারতের ফুটবল নিয়ে আলোচনা হবে এ পৃথিবীতে, সে আলোচনা এই নামটি ছাড়া সম্ভবই হবে না। তিনি অনেক বড় খেলোয়াড় ছিলেন। এবং হয়তো বা তার চেয়েও আরও অনেক বড় কোচ ছিলেন। সাফল্য ও ট্রফির মাপকাঠিতে ছিলেন অনেকেরই উপরে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দেবাশিস সেনগুপ্ত

    প্রদীপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। ডাকনামে পিকে। আপামর ময়দানি দর্শকের কাছে প্রদীপদা।

    যতদিন কলকাতার তথা ভারতের ফুটবল নিয়ে আলোচনা হবে এ পৃথিবীতে, সে আলোচনা এই নামটি ছাড়া সম্ভবই হবে না। তিনি অনেক বড় খেলোয়াড় ছিলেন। এবং হয়তো বা তার চেয়েও আরও অনেক বড় কোচ ছিলেন। সাফল্য ও ট্রফির মাপকাঠিতে ছিলেন অনেকেরই উপরে।

    ২০১৯-এ পিয়ারলেস জেতার ৬১ বছর আগে তিন প্রধানের বাইরে শেষ কলকাতা ফুটবল লিগ জিতেছিল ইস্টার্ন রেল। এবং সেবার ইস্টার্ন রেলের লিগ জেতায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল উইঙ্গার পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ১৯৫১ সালে বিহারের হয়ে সন্তোষ ট্রফিতে খেলেন জামশেদপুরের ১৫ বছরের কিশোর পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৫৪-এ জামশেদপুর থেকে কলকাতায় এসে কলকাতা ফুটবলে তাঁর পায়েখড়ি হয় এরিয়ান ক্লাবের হয়ে। তারপরে টানা ১৩ বছর, ১৯৫৫-১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি খেলেছেন কর্মস্থল ইস্টার্ন রেলের হয়ে। ওই ১৯৫৫-১৯৬৭-র মধ্যে ভারতের হয়ে ৪৫টি ম্যাচ খেলে ১৪টি গোল ছিল উইঙ্গার পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

    ১৯৫৫ সালে ১৯ বছরের প্রদীপদা ঢাকা কোয়াড্রাঙ্গুলার টুর্নামেন্টে ভারতীয় দলের হয়ে প্রথম খেলেন ও চার গোল করেন। ১৯৫৮ সালে টোকিও, ১৯৬২ সালে জাকার্তা আর ১৯৬৬ সালে ব্যাঙ্কক এশিয়ান গেমসেও ভারতীয় দলের রাইট উইঙ্গারের নাম ছিল পিকে। এর মধ্যে ১৯৬২ জাকার্তা এশিয়াডে ভারত সোনা জিতেছিল, যেখানে ৫ ম্যাচে ৪ গোল ছিল তাঁর। ১৯৫৬ সালে মেলবোর্ন আর ১৯৬০ সালে রোম গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে তিনি ভারতীয় দলের সদস্য ছিলেন। ১৯৬০ সালে রোমে তিনি ভারতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন। এছাড়াও ১৯৫৯ আর ১৯৬৪-তে রুপোজয়ী এবং ১৯৬৫-তে ব্রোঞ্জজয়ী ভারতীয় দলের হয়ে খেলেন পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপরে ঘন ঘন চোট আঘাত তাঁকে ১৯৬৭ সালে ফুটবল থেকে অবসর নিতে বাধ্য করে।

    শতাধিক প্রতিভাবান ফুটবল শিল্পীর উপস্থিতি সত্ত্বেও আমাদের সুদূর অতীত কৈশোরের সবুজ কলকাতা ময়দান অতটা সবুজ হতই না প্রদীপদা আর অমলদাকে (২০১৬-তে প্রয়াত অমল দত্ত) বাদ দিলে। আরও কয়েকশ পূজনীয় চরিত্র থাকা সত্ত্বেও সত্তর-আশির স্বপ্নের আকাশে উড়ান দেওয়া কলকাতা ময়দান আজও সশ্রদ্ধভাবে নতজানু হয় প্রদীপদাকে আর অমলদাকে মনে করলেই। কলকাতার ময়দানী ফুটবলে কোচিং ব্যাপারটাও প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মূলত এই দুজনের জন্যই।

    ট্রফি বা সাফল্যের জন্য এনাদের মধ্যে প্রদীপদাকেই আগে মনে পড়ে ফুটবল অনুরাগীদের। প্রদীপদার টানা সাতবার কলকাতা লিগ (১৯৭০ থেকে ১৯৭৬) আর টানা আটবার আইএফএ শিল্ড (১৯৭২ – ১৯৭৯) জেতার অনন্য রেকর্ড আজও অক্ষুণ্ণ। আজকের বিদেশি কোচ নির্ভরতার ক্লাব ফুটবল সময়ে প্রদীপদাদের সময়টাকে মনে পড়ে আরও বেশি করে এবং এই মনে পড়াটা আলোয় আলোয় উদ্ভাসিত করে তোলে স্মৃতিকে। তাঁর কোচিংয়ের সর্বগ্রাসী উপস্থিতি তাঁর ফুটবলকেও ভুলিয়ে দেয়, যে ফুটবল একসময় কাঁপিয়ে দিয়েছিল কলকাতা তথা ভারতীয় ফুটবলকে। বিভিন্ন সময়ে (১৯৭২-২০০৪) কলকাতার তিন বড় ক্লাবেই কোচ ছিলেন প্রদীপদা। ১৯৭২-১৯৮২ আর ১৯৮৫-৮৬তে ভারতীয় ফুটবল দলেরও কোচ ছিলেন তিনি। ১৯৮২ সালে দিল্লি এশিয়াডে তাঁর কোচিংয়ে মনে রাখার মত ফুটবল খেলেছিল ভারতীয় দল।

    ১৯৬১ সালে অর্জুন পুরস্কার, ১৯৯০ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়কে “বিশ শতকের সেরা ভারতীয়” ফুটবলার উপাধি দিয়েছিল আইএফএফএইচএস। তাঁকে ফিফা অর্ডার অফ মেরিট নামক ফিফার সর্বোচ্চ পুরস্কার দেওয়া হয়।

    তিরাশিতে পা দেওয়া নিয়মনিষ্ঠ প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় সল্টলেকের জিসি ব্লকের বাড়ি থেকে রোজ ভোরে গাড়িতে চেপে, নিয়মিত হাঁটতে যেতেন নিউটাউনের পেঁচার মোড় অঞ্চলে, কিছুদিন আগে পর্যন্তও। সল্টলেকের বাসভবনে মাঝে মধ্যেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তেন। ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে এক  সকালে সল্টলেকে নিজের বাড়িতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। দ্রুত তাঁকে বাইপাসের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল৷ স্নায়ু বিশেষজ্ঞ সুনন্দন বসুর তত্ত্বাবধানে ভর্তি ছিলেন তিনি। সে সময়  অবস্থা দ্রুত স্থিতিশীল হওয়ায় ভাল  হয়ে বাড়ি ফেরেন  জনপ্রিয় ফুটবলার৷ তবে নিয়মিত তাঁকে চিকিৎসকদের কড়া নজরে  থাকতে হত৷

    ফেব্রুয়ারিতে হঠাৎ করেই আবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন পিকে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে মেডিকা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত দু’সপ্তাহ ধরে ওই বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ভেন্টিলেশনে রাখা হয় তাঁকে। গঠন করা হয় চার সদস্যের একটি মেডিক্যাল টিম। তাঁরাই চিকিৎসা করছিলেন ভারতীয় ফুটবল দলের প্রাক্তন অধিনায়ক ও কোচকে। জানানো হয়, বুকে সংক্রমণ ছাড়াও তাঁর স্নায়ুর রোগও বেড়েছে। এছাড়াও  দীর্ঘদিন ধরে পারকিনসনে  আক্রান্ত ছিলেন পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়।

    ২০১৯-এর কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত প্রদীপদার আত্মজীবনীর নাম ছিল “বিয়ন্ড নাইনটি মিনিটস”।

    অসুস্থতাজনিত কারণে আজ জীবনের নব্বই মিনিটের বাইরে চলে গেলেন ময়দানের পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রদীপদাকে প্রণাম, এক সাধারণ ময়দানি ফুটবলপ্রেমীর তরফ থেকে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More