ঠিক পথে মোহনবাগান, শুধু আবেগ দেখলে অস্তিত্ব সংকট হত

২৫

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দেবাশিস সেনগুপ্ত

১৯৭১-এর গল্প। বাংলার বাতাসে বারুদের গন্ধ তখন। আমার ১৩ বছর বয়সী দু’চোখে ফুটবলের আকাশটাও মাঝে মাঝে ঢেকে যেত সেই বারুদের কালো ধোঁয়ায়। সৌজন্য খবরের কাগজ আর রেডিও। টিভি তখন অনেক দূর আকাশের তারা। পাশের পাড়ার এক দাদাস্থানীয় অন্তর্ধানে। নাম তমালদা। তখন চব্বিশ। পুলিশ বহু চেষ্টাতেও তাঁকে পাচ্ছে না। তমালদার স্থানীয়  থানার পুলিস অফিসারের নাম অজয়বাবু। বয়স ৩৮। দু’জনেই তখন দু’জনের টার্গেট। অজয়বাবুর চোখ এড়িয়ে থাকেন তমালদা। আর আজয়বাবু ওঁকে খোঁজেন হন্যে হয়ে। কিন্তু সপ্তাহে দু’দিন বিকেলে একই জায়গায় যেতেন দু’জনে। সত্তর মিনিটের রোমহর্ষক আঁচ পুইয়ে ফিরে যেতেন যে যার মত। একসঙ্গে যেতেন না অবশ্য। তবে কয়েক হাজার মানুশেরত মতো তাঁদেরও টান দুটো রং—সবু-মেরুন। মোহনবাগান মাঠ। গ্যালারি জুটলে ভাল, নইলে র‍্যাম্পাট।

তখন সুরেন্দ্রনাথ কলেজের থার্ড ইয়ারের বাম ছাত্রনেতা অমরদার মুখে এই ঘটনাটা শোনা। অমরদা একদিন সেখানে (সপ্তাহে দু’দিন অমরদাও নিয়মিত যাতায়াত ছিল সেখানে) অল্প দূরত্বে দেখে ফেলেন দু’জনকে। সুভাষ ভৌমিকের গোলের পরে লাফাচ্ছিলেন দু’জনে। ভাগ্য ভাল থাকায় ওঁরা দু’জনে কেউ কাউকে দেখতে পাননি সেদিনও (বছর খানেক পরে অবশ্য আলাদা আলাদা এনকাউন্টারে মারা যান দু’জনেই)। প্রাণের ভয় তুচ্ছ করে, রাজনীতি ও পেশা টপকে তাঁদের অমোঘ টানে ছুটিয়ে নিয়ে যেত মোহনবাগান মাঠ। কলকাতার ফুটবল। সপ্তাহে দু’দিন বিকেলে। সেই একাত্তরের বারুদ ঠাসা দিনকালে। মোহনবাগান মাঠের মত এমন ঘটনার সাক্ষী ছিল সেই সময়ে ইস্টবেঙ্গল আর মহমেডান মাঠও।

কলকাতার ফুটবল আসলে আবহমান কাল ধরে চলতে থাকা একটা সভ্যতার নাম। যে সভ্যতা বাঁচিয়ে রেখেছে ভারতীয় ফুটবলকে। যে সভ্যতা ভারতীয় ফুটবলের মেরুদণ্ড।

ব্রিটিশদের হারিয়ে মোহনবাগানের ...

এরপরে ১৯৭৫। একমাত্র ছেলেকে শ্মশানে দাহ করে সোজা মাঠে আসা ক্লাব সমর্থকের ইস্টবেঙ্গলের কলকাতা লিগের খেলা দেখতে আসা। পড়েছিলাম সুরজিত সেনগুপ্তর আত্মজীবনী ‘ব্যাকসেন্টার’-এ। ওই  ১৯৭৫-এরই ৩০ সেপ্টেম্বর আইএফএ শিল্ড ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে পাঁচ গোলে হারে মোহনবাগান। আপাদমস্তক মোহনবাগানী উমাকান্ত পালোধি সেই অপমানের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে জীবনের গ্যালারি ছেড়ে চলে যাওয়াটাকেই জীবনের জয়গান ভেবে নিয়েছিলেন। করেছিলেন আত্মহত্যা। সুইসাইড নোটে পোষণ করা ছিল পরজন্মে মোহনবাগানের ফুটবলার হয়ে পাঁচ গোলে হারার বদলা নেওয়ার মনোবাসনা।

সেই ৭৫-এর ৩৪ বছর পর আসে ২০০৯। ০-১ পিছিয়ে থেকেও ৫-৩ গোলে ইস্টবেঙ্গলকে আইলিগের ম্যাচে হারিয়ে দিয়েছিল মোহনবাগান। পামারবাজারের অধিবাসী, ইস্টবেঙ্গল সমর্থক শম্ভু হাজরা সেই সন্ধেতেই সেদিনের টেনশনের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে আক্রান্ত হয়েছিলেন হৃদরোগে।

Helo ফুটবল | পদ্মশ্রী শৈলেন মান্না ...

২০১৩-র ১লা ডিসেম্বর ছিল রবিবার। স্থান – যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন, প্রেস বক্সের বাঁদিকটায়। আইলিগের একটা ম্যাচে রাংদাজিয়েদের কাছে সদ্য ০-২ হেরেছে মোহনবাগান। মনখারাপের মেঘ মেখে মাঠ থেকে বেরোব বেরোব। এমন সময় কান্নার বৃষ্টি। একটি বছর পনেরোর কিশোর দেখি কংক্রিটের গ্যালারিতে শুয়ে পড়েছে আর অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে। পাশে দুটো বয়ামে লজেন্স আর বাদাম রাখা। ওকে তোলা হল। একটু ধাতস্থ হয়ে জানাল, যাদবপুরে থাকে। যাদবপুরের কলোনিতে। এই লজেন্স আর বাদাম বিক্রি করে মা আর নিজের সংসার টানে। বাবা গত হয়েছেন দুরারোগ্য অসুখে বছর পাঁচেক আগে। সামান্য কিছু টাকা রেখে গিয়েছিলেন বাবা। আরও বলল, ওর পৃথিবীতে একটাই রঙ – মোহনবাগান। একটাই দেবতা – হসে র‍্যামিরেজ ব্যারেটো। ওদের ছোট্ট আট বাই আটের একমাত্র ঘরটার চার দেওয়াল জুড়ে শুধু সবুজ তোতা। ব্যারেটো থাকলে নাকি এই ম্যাচটাও বের করে দিত। সামান্য দৈনিক আয়ে ৪০ টাকার (তখন এই দাম ছিল) কষ্টসাধ্য টিকিট কেটে প্রতিটা ম্যাচ দেখে আর লজেন্স, বাদাম বিক্রি করে। টিম হারার যন্ত্রণা কুরে কুরে খায় ওকে আর এইভাবে কাঁদিয়ে নেয়। বলল, দেখবেন, এ দিন থাকবে না। খুব শিগগিরি আইলিগ জিতবে ওর টিম। এর দেড় বছর পরে ‘ওর টিম’ আইলিগ জিতে নেয় ২০১৫-র ৩১ মে তারিখে। বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে বেলো রেজ্জাকের সেই ঐতিহাসিক হেড। এরপরে আরও বহুদিন ওকে মাঠে দেখেছি। মৃদু হাসিবিনিময়ে দিনগুলো রঙিন হয়েছে কতবার! ওর নামটা জিজ্ঞেস করা হয়নি কোনওদিন।

কাট টু ২০১৭। আমরি, সল্টলেকে সদ্য অস্ত্রোপচার হওয়া সহধর্মিণীর বেডের পাশে ৯০ মিনিট ঠায় দাঁড়িয়ে এক ক্লাব সমর্থকের মোহনবাগানের আইলিগ ম্যাচ দেখা। ২০১৭-তেই বারাসতে ইস্টবেঙ্গলের আইলিগ ম্যাচ হারার এক ঘন্টা পরেও ভেজা চোখ ও নিস্পন্দ মুখ নিয়ে মাঠে বসে থাকা ক্লাব সমর্থকদের তুলতে পুলিশী কর্মব্যস্ততা।

এটাই কলকাতার ফুটবল, এটাই কলকাতার ফুটবল সভ্যতা, এটাই কলকাতার ফুটবল আবেগ। কলকাতার ফুটবল আবেগ বিকেল চারটের খেলা দেখতে লাইন দেয় ভোরবেলায়। কলকাতার ফুটবল আবেগ অন্য খেলাকে দশ গোল দেয় সবসময়। কলকাতার ফুটবল আবেগ সারারাত জাগিয়ে রেখে দেয় প্রিয় ক্লাবের জন্য। কলকাতার ফুটবল আবেগ শেষ সম্বল দিয়ে খেলার টিকিট কাটায়। কলকাতার ফুটবল আবেগ শেষ পারানির কড়ি হয়ে ঘোরে স্মৃতির পেনাল্টি বক্সে। কলকাতার ফুটবল আবেগ শেষ বয়সের জীবনযুদ্ধেও বেঁচে থাকে শেষ সম্বল হয়ে। কলকাতার ফুটবল আবেগ জয়ের পরে তৈরি করে চোখের জল। কলকাতার ফুটবল আবেগ জরুরি বিজনেস মিটিং ছেড়ে মাঠে নিয়ে যায় ভিন শহরে। কলকাতার ফুটবল আবেগ রাত দুটোয় রাস্তা ভরে দেয় দলকে স্বাগত জানাতে। কলকাতার ফুটবল আবেগ অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপের আবহেও রাত আড়াইটেয় বিমানবন্দরে উচ্ছ্বাসে ভাসে হাইতিয়ানকে আর বিস্মৃতির আবহে ৩৯ বছরের প্রাক্তন ইরানিয়ানকে নিয়ে। কলকাতার ফুটবল আবেগ মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ছাড়া সবকিছু জুড়ে দেয়।

কিন্তু ব্যক্তিগত ছড়ানোছেটানো উদ্যোগে আসা টাকাপয়সার তিরতিরে স্রোত প্রায় মিলিয়ে গেলে, কতদিন টানতে পারে শুধুই আবেগ? পারে না। ১৯৯১ সাল থেকে একটা অন্য অধ্যায়ে ঢুকে পড়েছিল মোহনবাগান। বাঙালির সেই প্রবাদপ্রতিম প্রবাদটা একটু পাল্টে দিয়ে গৌরী সেন হয়ে গিয়েছিলেন টুটু বসু। ‘লাগে টাকা, দেবে টুটু বসু’। সেটাও দীর্ঘস্থায়ী হল না, কালের নিয়মেই।

১৯৯৮ সালে বিজয় মালিয়ার মালিকানাধীন ইউবি গ্রুপ নামক একছাতার তলায় ঢুকে পড়েছিল মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গলের ফুটবল দল দু’টো। নাম হয়ে গিয়েছিল ম্যাকডাওয়েল মোহনবাগান আর কিংফিশার ইস্টবেঙ্গল। ১৬ বছর পরে ২০১৪ থেকে ইউবি গ্রুপ আর মোহনবাগান সম্পর্কে ফাটল ধরা শুরু হয়। ইউবি গ্রুপের কাছ থেকে টাকা আসা বন্ধ হয় সবুজ-মেরুন তাঁবুতে। যার ফলশ্রুতিতেই ২৬শে ফেব্রুয়ারি ২০১৬-তে মোহনবাগান ছেড়ে বেরিয়ে যায় ইউবি গ্রুপ। ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে ইউবি গ্রুপের সম্পর্কটা টিঁকেছিল আরো বছর দু’য়েক। ২৮শে মে শেষ হয়ে গিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল-ইউবি গ্রুপ সম্পর্ক। ২০১৮-র ৫ই জুলাই নতুন সংস্থা কোয়েস জুড়ে যায় ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে। ৭০ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয় তারা। প্রথম বছরের শেষ থেকেই ‘বেসুরো’ গান বাজতে থাকে কোয়েস ইস্টবেঙ্গলে। ২০১৯-২০তে চুক্তির দ্বিতীয় তথা শেষ বছরে সংঘাত চরমে ওঠে। ২০২০-র ৩১ মে কোয়েস আলাদা হয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল থেকে। তবে কোয়েসের থেকে “স্পোর্টিং রাইটস” এখনও (১৬ জুলাই, ২০২০) ফেরত পায়নি ইস্টবেঙ্গল। এ বছর কোন লিগে খেলবে ইস্টবেঙ্গল, তা এখনও অনিশ্চিত মূলত এই কারণেই।

ATK Mohun Bagan versus East Bengal will bring a lot for the league ...

ওদিকে ২০১৬ থেকে স্পনসর খুঁজে খুঁজে বিফলমনোরথ মোহনবাগান ২০১৯-এর মার্চেই ঝুঁকেছিল এটিকে-র দিকে। তখন এটা সম্ভব হয়নি। বেশ কিছুদিন পরে এটিকে-র নাম ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে জড়িয়ে গুঞ্জন উঠেছিল। সেটাও বাস্তবে ঘটেনি।

অবশেষে ১৫ই জানুয়ারি ২০২০, বুধবার দু’পক্ষের মধ্যে দফায়-দফায় আলোচনার পরে চূড়ান্ত হয়ে যায় মোহনবাগান-এটিকের সংযুক্তিকরণ। ঠিক হয়, ৮০ শতাংশ শেয়ার থাকবে এটিকের আর ২০ শতাংশ শেয়ার থাকবে মোহনবাগানের। ১লা জুন থেকে এটিকের সঙ্গে গাঁটছড়া হওয়ার ব্যাপারে মোহনবাগানের হয়ে চুক্তিপত্রে সই করেন সহসচিব সৃঞ্জয় বসু এবং অর্থসচিব দেবাশিস দত্ত। এটাও ঠিক হয়ে যায় যে ২০২০-২১ মরশুম থেকেই নতুন মোড়কে খেলবে এটিকে-মোহনবাগান। এই মরসুমে এটিকে-মোহনবাগান কলকাতা লিগ ছাড়াও খেলবে আইএসএলে।

গত এক বছর ধরেই মোহনবাগানের সঙ্গে এটিকে-র আলোচনা চলছিল। ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গেও তাদের কথা হয়েছিল বলে শোনা যায়। কেন সবুজ-মেরুন জার্সিকেই বেছে নিলেন এটিকে কর্তারা? এটিকে প্রধান সঞ্জীব গোয়েঙ্কার কথায় ‘‘দু’পক্ষ সমান ভাবে এগিয়ে এসেছিল বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।’’ তিনি জানিয়ে দেন, ‘‘মোহনবাগানের ঐতিহ্য নষ্ট হয়, এ রকম কিছু আমরা করব না।’’ আর মোহনবাগান সচিব টুটু বসু জানিয়েছিলেন, ‘‘নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, মোহনবাগান আইএসএল খেলবে। সেটা হচ্ছে। তা ছাড়া এটিকে ফুটবলটা জানে। সমর্থকদের আবেগ বুঝবে। মাঝপথে চলে যাবে না।’’ কত দিনের জন্য চুক্তি, তা অবশ্য সেদিন জানায়নি কোনও পক্ষই। এটিকে-র প্রধান কর্তার বক্তব্য অনুযায়ী ‘‘সারা জীবনের জন্য।’’ কথা হয়েছিল, পয়লা বৈশাখ থেকেই নতুন কোম্পানি কাজ শুরু করবে। জানা গিয়েছিল, মোহনবাগান সদস্যরা কলকাতা লিগে খেলা দেখবেন বিনা পয়সায়। আইএসএলের টিকিটও তাঁরা পাবেন কম দামে।

কিন্তু প্রশ্ন হল, মোহনবাগান কর্তারা কেন এটিকে-কে ৮০ শতাংশ শেয়ার ছেড়ে ফুটবল দলের ক্ষমতা হারাতে রাজি হলেন? এর প্রধান কারণ মূলত আর্থিক। ২০২০-২১ মরসুমে আইএসএলে খেলতে হলে ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি-সহ অন্তত চল্লিশ কোটি টাকা দরকার ছিল। দেশ-বিদেশ ঘুরে অন্তত দশটি কোম্পানির সঙ্গে কথা হলেও এর অর্ধেক টাকার স্পনসরও জোগাড় করতে পারেননি টুটুবাবুরা। ফলে বাধ্য হয়েই তাঁরা ক্লাবের ফুটবল দলের সঙ্গে এটিকে-র সংযুক্তিকরণে সায় দেন। তারপর থেকেই সমর্থকদের মধ্যে চোরাযুদ্ধ শুরু হয় আবেগ-ঐতিহ্য এবং নতুন কর্পোরেটযোগ নিয়ে।

অবশেষে ১৭ই জুন ২০২০ তারিখে প্রতিষ্ঠিত হয় এটিকে মোহনবাগান প্রাইভেট লিমিটেড (রেজিস্ট্রেশন নং ২৩৭৫২৭)। ১০০ টাকা প্রতি শেয়ারের এক লক্ষ শেয়ার ধরে শেয়ার ক্যাপিটাল রাখা হয় এক কোটি টাকা। ধনশ্রী টাওয়ার, ৭০, ডায়মন্ড হারবার রোডের তৃতীয় তলা থেকে পরিচালিত এই কোম্পানির ডিরেক্টর হয়েছেন সঞ্জীব মেহরা (ঠিকই পড়ছেন পদবীটা), দেবাশিস দত্ত, সৃঞ্জয় বসু, গৌতম রায় আর উৎসব পারেখ।

তারপরে গত ১০ই জুলাই ২০২০ তারিখের এটিকে মোহনবাগান প্রাইভেট লিমিটেডের প্রথম বোর্ড মিটিং(ভার্চুয়াল) নির্ধারিত করে দেয় আবেগ আর কর্পোরেট পেশাদারিত্বের সুষম মিশ্রণ। ওই মিটিংয়েই ঠিক হয়, ১৩১ বছর প্রাচীন ক্লাবের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হোম ম্যাচে তাদের জার্সির রঙ (অ্যাওয়ে ম্যাচের জার্সি পরে ঠিক হবে) ও লোগো একই রেখে দেওয়া হবে। দলের নতুন নাম হবে এটিকে মোহনবাগান ফুটবল ক্লাব। স্বাভাবিকভাবেই প্রতীকে এই নামই থাকছে।

লকডাউনে জীবন ঝুঁকি নিয়ে মোহনবাগান ...

অনেক প্রশ্ন ছিল সেই জানুয়ারি থেকেই। এবারে নতুন প্রশ্ন ওঠে লোগোতে “FOUNDED 1889” নেই কেন? কী করে থাকবে? এটিকে মোহনবাগান ফুটবল ক্লাব তো ২০২০-র ক্লাব। যেটা মোহনবাগানের ফুটবল উইং (হ্যাঁ, বাকি সব কিছু থাকছে মোহনবাগানেরই) আর এটিকের সংযুক্তিকরণের ফল। বরং “FOUNDED 2020” থাকলেই অসম্মান হত। “FOUNDED” কথাটা না থাকায় যাঁরা উদ্বাহু হয়ে নাচছেন, তাঁদের জন্য জানানো যাক এই লেখার শুরুর দিকের আবেগের কোলাজের বিন্দুমাত্রও ক্ষতি হয়নি এতে। তাঁরা আরও আশা করেছিলেন যে, লোগোর নৌকাতে বাঘ লাফাবে আর লাল সাদা হবে জার্সির রঙ। এগুলো হয়নি। তাই তাঁদের জনয সমবেদনা। ১৮৮৯, ১৯১১ আর মোহনবাগানের জন্য আবেগের ভিত ছিল গৌরবের লম্বা ইতিহাস আর সাফল্যের মেইলফলকগুলো। ১০ই জুলাই ২০২০ তারিখে এএফসি-এর টুইটেও ‘১৮৮৯’-কেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে ‘১৩০+ বছর’-এর উল্লেখ করে। আর নামের আগে এটিকে কেন? এই প্রশ্নর উত্তর আরো সহজ। এর আগেও তো আমরা দেখে ফেলেছিলাম ম্যাকডাওয়েল মোহনবাগান, কিংফিশার ইস্টবেঙ্গল আর কোয়েস ইস্টবেঙ্গল নামগুলো।

মোহনবাগানের দুই ঘরের ছেলে চুনী গোস্বামী এবং সুব্রত ভট্টাচার্য ক্লাবের এই পদক্ষেপকে কার্যত সমর্থনই করেছিলেন জানুয়ারি মাসে, যেদিন এই সংযুক্তিকরণ ঘোষিত হয়েছিল। অসুস্থ চুনী গোস্বামী ফোনে বলেছিলেন ‘‘যা হয়েছে ভালই হয়েছে।’’ আর সুব্রত ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ‘‘ক্লাবের আর্থিক অবস্থা খারাপ। ফুটবলারদের মাইনে দেওয়া যাচ্ছে না। এটা করতেই হত। তবে দেখতে হবে, এই চুক্তিতে সদস্য-সমর্থকদের আবেগে আঘাত লাগছে কিনা। ক্লাবের ঐতিহ্য যেন বজায় থাকে।’’

Mohun Bagan, ATK announce merger; to play ISL next season - Sportstar

তাঁদের প্রিয় দল আইএসএলে নামলে কয়েক লক্ষ মোহনবাগান সমর্থকের স্বপ্ন পূরণ হবে বলে মনে করেন মোহনবাগানের হয়ে প্রথম দফায় (১৯৯৯-২০০৪) পাঁচটি মরশুমে  ১৫৬ গোল ও দ্বিতীয় দফায় (২০০৬-২০১২) ছ’টি মরশুমে ১৫২ গোল করা মোহনবাগান সমর্থকদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেওয়া ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি ফরওয়ার্ড হোসে র‍্যামিরেজ ব্যারেটোও। মোহনবাগান সমর্থকদের আজও নয়নের মণি ব্যারেটো মোহনবাগানের নাম বদলে এটিকে মোহনবাগান হওয়ায় বেশ খুশি। খুশি সমর্থকদের জন্যও। তাঁর মতে “মোহনবাগান সমর্থকেরা বহু বছর ধরেই আইএসএলে খেলার স্বপ্ন দেখছেন। এ বার তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। এটিকে-র সঙ্গে হাত না মিলিয়ে শুধু মোহনবাগান হিসেবে আইএসএলে নামলে হয়তো এই লিগের গতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে ওদের অনেক সময় লেগে যেত।” তিনি আরো বলেন, “সমর্থকরা ক্লাবের লোগো ও জার্সির রঙের ব্যাপারেই বেশি আবেগপ্রবণ। এটিকে মোহনবাগানের বোর্ড অফ ডিরেক্টর্সের এই সিদ্ধান্তে আমরা খুশি। আসলে মোহনবাগানকে অন্য রঙের জার্সিতে খেলতে দেখার কথা সমর্থকেরা ভাবতেই পারেন না। এটা ওঁদের পক্ষে বেশ কঠিন। প্রাক্তন মোহনবাগানি ও একজন সমর্থক হিসেবে আমি খুব খুশি। মোহনবাগান কর্তারা একটা দারুণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”

১৯৭৪-৭৫। হার, ড্র আর হার । ক্লাবের খেলা দেখতে গেলেই খেলাশেষে ঝামেলা, ঝঞ্ছাট, কাঁদানে গ্যাস আর লাল লাল ভেজা ভেজা চোখে বাড়ি ফেরা। মোহনবাগানকে ফিরিয়ে দিইনি ওইসব ‘বীভৎস’ দিনকালেও বা তার পরেও। আর আজ তো সে তুলনায় ‘সুসময়’। দিনের শেষে দাঁড়িয়ে কোথাও একটা মনে হয়, আবেগ থাকাটা জরুরি। যে আবেগ না থাকলে ক্লাবদু’টোও কিছুতেই থাকবেনা। কিন্তু স্পনসর না থাকলেও, আর্থিক অসঙ্গতি থাকলেও, ফলটা একই হত। আবেগ ধরে রাখতে গিয়ে অস্তিত্বটাই হয়ত মুছে যেত মোহনবাগানের।

আগামীকাল অন্য দিন। আগামীকাল নতুন খেলা। একই থেকে যাওয়া জার্সির রঙ আর লোগোর সৌজন্যে ভবিষ্যতেও মোহনবাগানের জন্য আবেগ একইরকম থেকে যাবে। সবুজ মেরুন জার্সি পরা ফুটবলাররাই এগিয়ে নিয়ে যাবে পালতোলা নৌকাকে আর গ্যালারিতে থাকবে সেই একই শিহরণ জাগানো সমর্থন। ১৩১ বছরের লম্বা প্রাণচঞ্চল ঐতিহাসিক পথ হেঁটে আসা মোহনবাগান আরো বহুদিন বয়ে নিয়ে যাবে কলকাতা ফুটবলের তরী।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More