ছোট থেকেই ভিতরে ‘জেদ’ পুষে এতটা ছুটলেন ‘ভিকি’

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দেবাশিস সেনগুপ্ত 

ছোটবেলা থেকেই মন পড়ে থাকতো খেলার মাঠে। ওইটুকু বয়সেই দুটো জিনিস তার মন কাড়ত। ছোটবেলার কোচ অভি দত্তরায় ( ঢাকুরিয়া শক্তি ও সংহতি ক্লাব ) এবং পাড়ার বড়দের খেলা। ছোট বয়সেই তার মনে হতো কবে অফুরন্ত দম নিয়ে নিজের ১০০ শতাংশ দিয়ে খেলবে সে।

১৯৯৮ সালে, মাত্র ১৩ বছর বয়সেই বারুইপুর থেকে এসে কলকাতার প্রথম শ্রেণীর দল কালীঘাটে নাম লেখানো। পরের বছরই এফসিআই-এ যাওয়া। দু’বছর সেখানে যোগ্যতার সঙ্গে খেলার পর ২০০১ সালে টালিগঞ্জ অগ্রগামীতে যাওয়া ( তখন জাতীয় লিগের দল ছিল এই টালিগঞ্জ অগ্রগামী )। সেখানেও ২ বছর নিজের সবটা দিয়ে খেলার পর নজরে পড়ে যান মোহনবাগানের। মোহনবাগানই তাঁর প্রথম বড় দল।

২০০৩ সালে সবুজ-মেরুনে যোগ দেওয়া মেহতাব প্রথম থেকেই নিজের সবটা উজাড় করে খেলতেন। ১০০ শতাংশ দিতেন। অফুরন্ত দম, দলের জন্য যান লড়িয়ে দেওয়া আর সেইসঙ্গে প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারদের আটকে দেওয়া মারাত্মক ট্যাকল। এটাই ছিল মেহতাবের ইউএসপি। ডিফেন্ডারদের সামনে ডিফেন্সিভ স্ক্রিন, কিংবা মাঝমাঠ, যেখানেই কোচ খেলাতেন, সবটা দিয়ে খেলতেন। তাঁর এই বৈশিষ্ট্যই তাঁকে কোচের কাছে অপরিহার্য করে তুলেছিল। ২০০৫ সালে মোহনাবাগানের অধিনায়ক ছিলেন মেহতাব।

২০০৭-এ মোহনবাগান ছেড়ে পা দিলেন পড়শি ক্লাব ইস্টবেঙ্গলে। তারপর টানা ১০ বছর মেহতাব ও ইস্টবেঙ্গল যেন সমার্থক হয়ে উঠেছিল। দলের ‘মিডফিল্ড জেনারেল’ বলা হতো তাঁকে। প্রায় প্রত্যেকটা ম্যাচে নব্বই মিনিট মাঠে থাকা। দলের মাঝমাঠকে নেতৃত্ব দেওয়া। ডিফেন্সকে সাপোর্ট দেওয়া। এই সবই করতেন নিরলসভাবে।

ইস্টবেঙ্গলে থাকাকালীন মাঝে দু’বার কেরল ব্লাস্টার্সের হয়ে আই এস এল খেলেন। ২০১৭য় ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে জামশেদপুর এফসি’র হয়ে খেলেন শুধু আইএসএল।

২০১৮ সালে ফের ফিরে এলেন মোহনবাগানে। অনেক ইন্টারভিউতে মেহতাব বলেছিলেন, যে ক্লাবে খেলে তাঁর পরিচয় হয়েছে, সেই ক্লাবেই শেষ করতে চান নিজের কেরিয়ার। ঠিক ছিল শুধুমাত্র কলকাতা লিগ খেলেই তুলে রাখবেন বুটজোড়া। কিন্তু কলকাতা লিগ জেতার পর আই লিগের জন্যও তাঁকে খেলতে রাজি করান কর্তারা।

দেশের হয়েও খেলেছেন ৩৩টি ম্যাচ। করেছেন ২টি গোল। ২০১৫তে তিনি জাতীয় দল থেকে অবসর নিয়ে ফেলেছিলেন মেহতাব হোসেন।

মাঠে তিনি হার্ড ট্যাকলার ছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে খুবই নরম-সরম আর আন্তরিক মেহতাব ছিলেন একদম বিপরীত মেরুতে। টিমম্যান মেহতাবকে অজ্ঞাত কারণে দিনের পর দিন বসিয়ে রাখা হয়েছে এ বছর মোহনবাগানে। হয়তো তাঁকে নিয়মিত খেলালে আই লিগে মোহনবাগানের ফল এত খারাপ হত না। তাঁর মানের খেলোয়াড়ের পক্ষে অতিরিক্ত তালিকায় বসে থাকা ছিল খুব কষ্টকর। কিন্তু তাও থেকেছেন। আদ্যন্ত টিমম্যান মেহতাব কোনওদিন কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি। কোনওদিন মাথা নিচু করে কোনও ক্লাবে না খেলা মেহতাব হোসেন মাথা উঁচু করেই প্রাক্তন হয়ে গেলেন বৃহস্পতিবার।

দলের জন্য জান লড়িয়ে দেওয়া এই ফুটবলারকে মনে রাখবে কলকাতার ফুটবল সমাজ, ময়দান আর যুবভারতী। ভারতীয় ফুটবলেও যতদিন খেলেছেন মাঝমাঠকে প্রাণবন্ত রেখেছেন তিনি। আইএসএলেও।  একটাই আফশোস থেকে গেছে তাঁর ফুটবল জীবনে। বহু ট্রফি জিতলেও (২০০৩ আর ২০১২তে আই এফ এ শিল্ড দু’বার, ২০০৭, ২০০৯, ২০১০ আর ২০১২তে ফেডারেশন কাপ চারবার, ২০০৫, ২০১০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত কলকাতা লিগ আটবার) একবারও জাতীয় লিগ / আই লিগ না জেতার দুঃখ সারা জীবন বহন করতে হবে তাঁকে। ২০১৮তে সবুজ মেরুন জার্সি পরার পরে প্রতিপক্ষ সমর্থকদের কটু মন্তব্যগুলোও তাকে পীড়া দেবে অনেকদিন। অবসর জীবনে স্ত্রী মৌমিতা হোসেন (পুরকায়স্থ) আর ছেলে জিদানকে নিয়ে ভাল থাকুন দীর্ঘ সময় জুড়ে ময়দানের হার্টথ্রব মেহতাব হোসেন। ময়দানের ‘ভিকি’।

ছবি সৌজন্যে ফেসবুক 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More