রবিবার, সেপ্টেম্বর ২২

প্রিয় ব্যারেটো, দোষটা তো আপনারই!

দেবাশিস সেনগুপ্ত

প্রিয় ব্যারেটো

প্রিয় হোসে রামিরেজ ব্যারেটো,

দোষটা তো আপনারই।

আপনার ‘সবুজ তোতা’ নামটা এক সময় ময়দানের সমস্ত ক্লাবের শ্রদ্ধা আদায় করে নিয়েছিল, আর সেই সময় আপনার ক্লাবের “ঘরের ছেলে” হয়ে গিয়েছিলেন আপনি। বহু দল আপনাকে পাওয়ার জন্য অলআউট ঝাঁপালেও আপনার প্রাক্তন ক্লাবকে ছেড়ে কলকাতার আর কোন ক্লাবে যাননি আপনি, এগুলো কি আপনারই দোষ নয়?

দোষটা তো আপনারই।

আপনাকে আপন করে নিয়েছিল কলকাতার ফুটবল জনতা। আপনার প্রাক্তন ক্লাব সমর্থকরা আপনার জন্য একটা ব্র্যান্ডসঙ্গীত গাইত আপনি খেলতে নামলেই, “শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, ব্যারেটোই ভরসা”। আপনার প্রাক্তন ক্লাব সমর্থকরা আপনাকে ‘কলকাতার যীশু’ শিরোপা দিয়েছিলেন। এগুলো তো দোষই হয়েছে আপনার।

দোষটা তো আপনারই।

দু’দফায় আপনি আপনার প্রাক্তন ক্লাবে খেলেছেন মোট ১১ বছর। ১৯৯৯ সালে প্রথম গঙ্গাপারের ক্লাবে যোগ দেন আপনি।আপনার প্রাক্তন ক্লাবের তৎকালীন কর্মকর্তাদের অন্যায় আক্রমণের মুখে ২০০৪ সালে কাঁদতে কাঁদতে ক্লাব ছেড়ে চলে গেলেও আবার আপনি ফিরে আসেন ২০০৬ সালে। প্রথম সুযোগেই, অনেকটা আর্থিক সুবিধে ত্যাগ করে। সবুজ-মেরুন জার্সি পরে ১১ বছরে ৩৭১টি ম্যাচে আপনি করেছেন ২২৮টি গোল। একক দক্ষতায় আপনার প্রাক্তন ক্লাবকে পার করিয়ে দিয়েছেন বহু কঠিন ম্যাচে। এগুলোকে আপনার দোষ ছাড়া আর কী বলা যায়?

দোষটা তো আপনারই।

বহু ট্রফি আপনার প্রাক্তন ক্লাব ঘরে তুলেছে আপনার সময়ে। যেমন কলকাতা লিগ, জাতীয় লিগ, ফেডারেশন কাপ, আইএফএ শিল্ড, সুপার কাপ। দলের প্রতি দায়বদ্ধতা আপনি প্রমাণ করেছেন বার বার। কত ম্যাচে খেলার মত অবস্থায় না থেকেও পাল তোলা নৌকাকে তীরে ভিড়িয়ে দিয়েছেন আপনি। এগুলোকে আপনার দোষ বলা যাবে না?

দোষটা তো আপনারই।

আপনার প্রাক্তন ক্লাবের হয়ে ইস্টবেঙ্গলকে ৫-৩ গোলে হারানো ম্যাচের মাঝপথে আহত হয়ে চিকচিক করে ওঠা দু’চোখ নিয়ে মাঠ থেকে বেরিয়ে যাওয়া, সাইডলাইনে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়া, ম্যাচশেষে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ড্রেসিং রুমে ঢুকে সতীর্থ মার্কোস পেরেরার চোখের নীচ থেকে বেরনো রক্ত পরিষ্কার করে দেওয়া…. আপনার প্রাক্তন ক্লাবের সমর্থকদের ভালবাসার দাম কীভাবে দিতে হয়, তা আপনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সে দিন। এগুলো আপনার দোষ না?

দোষটা তো আপনারই।

অবশেষে সেই ৫ই মে, ২০১২। আপনার প্রাক্তন ক্লাবের হয়ে শেষ ম্যাচ যুবভারতীতে পুনে এফ সি-র বিরুদ্ধে। ক্রিকেটের জনশ্রুতি এই যে ডন ব্র্যাডম্যান নাকি আবেগে চোখে জল এসে যাওয়ায় শেষ ইনিংসে এরিক হোলিসের বলটা দেখতে পাননি, আর তাই শূন্য রানে বোল্ড হয়ে যান ওভালে। চোখের সামনে দেখেছিলাম যে আপনার আবেগাশ্রু কিন্তু মুছে গিয়েছিল সেদিন মাঠে নামার পরে। যে গতিতে হাডসন লিমার পাসটা ধরে, কোণাকুনি শটে দেশের এক নম্বর গোলরক্ষক সুব্রত পালকে বোকা বানিয়ে ১-০ করেছিলেন সে দিন, তা ছিল “আদি অকৃত্রিম ব্যারেটো”। যে সূক্ষ্মতায় আপনি কিছু পাস সে দিন বাড়িয়েছিলেন, তাও “আদি অকৃত্রিম ব্যারেটো”। পুণে এফ সি শেষ দিকে চাপ বাড়াচ্ছিল দেখে সে দিন যিনি নীচে নেমে ট্যাকল করছিলেন নিজের বক্সে, তিনিও তো “আদি অকৃত্রিম ব্যারেটো”। মাঠে নেমে সে দিনও ছিল আপনার বাঁচার লড়াই, প্রতিদিনের মতো। বল তাড়া করা। পাসের পর পাস। শেষ মিনিট পর্যন্ত শৃঙ্খলা দেখানো। সে দিনের কোচ সুব্রত ভট্টাচার্যকে আপনি বলেছিলেন, শেষ মিনিট পর্যন্ত মাঠে রাখতে। দ্বিতীয় গোলের রাস্তার পাসটাও শুরু করলেন আপনিই। দুর্দান্ত শটে ২-০ করেছিলেন ওডাফা। যার হাতে সে দিন অদৃশ্য ব্যাটন তুলে দিয়ে গিয়েছিলেন আপনি। সে দিনের মতো চোখের জল তার আগে বা পরে আর দেখেনি গালাগাল এবং মারপিটের বৃত্তেই আটকে থাকা কলকাতা ফুটবল। সেই রবিবারের বিকেল ২৮ বছরের যুবভারতীকে প্রথমবারের জন্য কাঁদতে শিখিয়েছিল। আপনি স্টেডিয়ামের ট্র্যাক ধরে হাঁটছিলেন, সঙ্গে গ্যালারিতে অজস্র তরুণ দৌড়চ্ছিল এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, মনে মনে আপনার সঙ্গে, আপনি হতে চেয়ে। ওদের চোখে ছিল জল। মুখে ছিল আপনার জয়ধ্বনি।

বাঁশিহীন হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা মনে হচ্ছিল আপনাকে। বা প্রদীপহীন আলাদিন। না কি অন্য কিছু? এই ম্যাচ শুরুর আগে আপনি বলে দিয়েছিলেন যে চিরকাল হৃদয়ে থাকবে আপনার প্রাক্তন ক্লাব। আলোয় থাকতে থাকতে কয়েক হাজার ফুটবলার রাতারাতি অবহেলার অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছেন কলকাতায়। ১৯৯০য়ে মোহনবাগান মাঠে সুব্রতর শেষ ম্যাচ দেখার জন্য উপচে পড়েছিল ময়দান। তার পরে কলকাতা আর দেখেনি ফুটবলারদের অভিজাত বিদায়। মনোরঞ্জন, তরুণ, সত্যজিৎ, তুষারের মতো বিখ্যাত ঘরের ছেলেরাও নীরবেই প্রাক্তন হয়ে গিয়েছিলেন নির্মম ময়দানে, এক সকালে। সেখানে আপনি ছিলেন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। এগুলো ছিল আপনার মস্ত দোষ।

দোষটা তো আপনারই।

আপনি জানেন নিশ্চয়ই আপনার প্রাক্তন এক কোচের খেলোয়াড়জীবনে একটানা ১৭ বছর ধরে একমাত্র “বড় দল” ছিল আপনার প্রাক্তন ক্লাব, যাদের হয়ে উনি জিতেছিলেন ৭৮টি ট্রফি। পরে কোচ হয়ে তিনি অন্য বহু ট্রফির সঙ্গে সঙ্গে দু’বার জাতীয় লিগ চ্যাম্পিয়নও করেন ওই ক্লাবকে। তিনদিন আগের ক্লাবের অনুষ্ঠানে তিনিও মঞ্চে বসার স্থান পাননি, যদিও মঞ্চে ছিলেন বহু স্বনামধন্য রাজনীতিবিদ। এবং তিনি বহুবার অপদস্থ হয়েছেন আপনার প্রাক্তন ক্লাবের শীর্ষ কর্তৃপক্ষর কাছে।এগুলো জেনেও সম্মান বা আমন্ত্রণ পাবার আশা করাটা তো উচ্চশ্রেণির দোষ।

দোষটা তো আপনারই।

এ বারে একটা “গল্প হলেও সত্যি” শুনে যান আপনি। একটা রবিবার। সম্ভবত ১ ডিসেম্বর ২০১৩। স্থান – যুবভারতী। প্রেস বক্সের বাঁদিকটায়। একটা আই লিগ ম্যাচে রাংদাজিয়েদের কাছে সদ্য ০-২ হেরেছে মোহনবাগান। মনখারাপের মেঘ মাঠ জুড়ে।এমন সময়, কান্নার বৃষ্টি। একটি বছর পনেরোর কিশোর কংক্রিট গ্যালারিতে শুয়ে পড়ে অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে। পাশে দুটো বয়ামে লজেন্স আর বাদাম রাখা। ওকে তোলা হল। একটু ধাতস্থ হয়ে বলল, যাদবপুরে থাকে। কলোনিতে। সেই যাদবপুরে, যেখানে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদেরই সংখ্যাধিক্য। এই লজেন্স আর বাদাম বিক্রি করে মা আর নিজের কলোনির সংসার টানে।বাবা গত হয়েছেন দুরারোগ্য অসুখে বছর পাঁচেক আগে। সামান্য কিছু টাকা রেখে। আরও বললো, ওর পৃথিবীতে একটাই রঙ – মোহনবাগান। একটাই দেবতা – ব্যারেটো। ওদের ছোট্ট আট বাই আটের একমাত্র ঘরটার চার দেওয়াল জুড়ে ব্যারেটো আর ব্যারেটো। ব্যারেটো থাকলে নাকি এই ম্যাচটাও বের করে দিত। আরও জানাল, সামান্য দৈনিক আয়ে ৪০ টাকার (তখন এই দাম ছিল) কষ্টসাধ্য টিকিট কেটে প্রতিটা ম্যাচ দেখে আর লজেন্স, বাদাম বিক্রি করে। টিম হারার যন্ত্রণা কুরে কুরে খায় ওকে আর এইভাবে কাঁদিয়ে দেয়। বললো, দেখবেন, এ দিন থাকবে না। খুব শিগগিরি আই লিগ জিতবে ওর টিম। এর ঠিক দেড় বছর পরে “ওর টিম” আই লিগ জিতে নেয় ২০১৫র শেষ মে দিবস অন্তে, এক স্বপ্নিল সন্ধেতে, বেঙ্গালুরুর কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে। এরপরে আরও বহুদিন ওকে মাঠে দেখেছিল অনেকে। মৃদু হাসিবিনিময়ে দিনগুলো “রঙিন” হয়েছিল সবার, কতবার! ওর নামটা জিজ্ঞেস করেনি, কেউ কোনওদিন। কী দরকার? সবাই জেনে গিয়েছিল, ওর নামও ব্যারেটো। আসলে কলকাতার প্রতিটি ফুটবলপ্রেমীদের বুকের মধ্যে খোদাই হয়ে থাকা ব্যারেটো নামটা আজও সমান ভাস্বর। এরপরেও বলবেন, আপনি দোষী নন?

দোষটা তো আপনারই।

“যেমন ভাল মানুষ, তেমনই ভাল ফুটবলার” – চিরদিন এই ইমেজের পতাকাবাহী আপনি জানতেই পারেননি কখন বদলে গেছে ময়দান। শুধু আম সমর্থকদের নিশ্চিন্তির আশ্রয় হয়ে, তাদের শয়নে স্বপ্নে থেকে গিয়ে, তাদের নিশ্চিত ফুটবল নিরাপত্তা দিয়ে আপনি ভুলে গিয়েছিলেন ঠিক জায়গায় তৈলমর্দনের আদবকায়দা। এ যদি দোষ না হয়, তবে দোষ কাকে বলে?

দোষটা তো আপনারই।

এত দোষ করার পরে এখন এসব লিখলে আপনার প্রাক্তন ক্লাবের কর্মকর্তারা ফিরে তাকাবে আপনার দিকে, এটা ভাবাটাই তো দোষ হয়েছে আপনার: “অবসরের পর আমার প্রাক্তন ক্লাব আমাকে কোনও অনুষ্ঠানে আর আমন্ত্রণ জানায়নি। দুঃখ হয়েছে ঠিকই। তবে আমি আমার প্রাক্তন ক্লাব ক্লাবকে মনে করিয়ে দিতে চাই, ক্লাবের হয়ে আমার গোল সংখ্যা এবং দলের হয়ে আমার অবদান যেন ভোলা না হয়।’’ এই লেখার সঙ্গে আপনি একটি ছবিও পোস্ট করেছেন, যাতে আপনার প্রাক্তন ক্লাবের সেই বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি পরে গোলের পর দু’ হাত তুলে ঈশ্বরকে আপনি আকাশে খুঁজছেন। আম সমর্থকদের ঈশ্বর তো ছিলেন আপনিই, একদিন। তাই এই ছবিটি আজও মনে রেখেছেন আপনার প্রাক্তন ক্লাব সমর্থকরা। এটা তো আপনার আরও একটা মস্ত দোষ হয়ে গেল, প্রিয় ব্যারেটো।

দোষটা তো আপনারই।

আপনি জানেন না যে প্রাক্তন ফুটবলারকে ভুলে যাওয়ার ঘটনা ময়দানে বা কলকাতার দু’ প্রধানে নতুন নয়। এরকম ঘটনা ঘটেছে বহু বার। গোষ্ঠ পাল-এর পরিবার আপনার প্রাক্তন ক্লাব দিবসে বহুদিন ডাক পান না। ২৯ জুলাই গোষ্ঠ পালের মূর্তির পাদদেশে অনশনে বসেছিলেন গোষ্ঠ পালের ছেলে নীরাংশু পাল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। ১০০ বছরের অনুষ্ঠানে ইস্টবেঙ্গল না ডাকায় মনোকষ্টে ভুগছেন বহু প্রাক্তন ফুটবলার। আপনার পোস্টেও দেখা গেছে সমর্থকদের বাঁধ ভাঙা আবেগ। উপচে পড়েছে আপনার প্রতি তীব্র ভালবাসা। যে আবেগ, যে ভালবাসা খেলার সময়ে পেয়েছিলেন আপনি, তার কিছুটাও যদি কর্তারা দেখাতেন, তা হলে হয়তো এ ভাবে কষ্ট পেতে হত না আপনাকে।

সমর্থকরা আপনাকে ভোলেনি, ভুলবে না কোনওদিন। এতেই সন্তুষ্ট থাকুন একদা ময়দানের হার্টথ্রব আপনি। অকৃতজ্ঞ শীর্ষকর্তাদের কাছে সম্মান আশা করে নিজের মনকে ভারাক্রান্ত করবেন না, যাদের কাছে ক্লাবকে “রাজনীতির আখড়া” বানানোটাই প্রায়রিটি এখন। বদলে যাওয়া ময়দানে ভাল থাকার আদবকায়দা শিখে নিন “সবুজ তোতা”। আমরা জানি, বন্দি “খাঁচার পাখি” নয়, মুক্ত “বনের পাখি” হয়ে মাথা উঁচু করে সমর্থকদের ভালবাসায় ভালই থাকবেন আপনি।

ইতি – আপনার ফুটবলমুগ্ধ এক আম সমর্থক।

Comments are closed.