রবিবার, সেপ্টেম্বর ২২

গোপাল বসু: না থেকেও থেকে যাওয়ার এক বছর

দেবাশিস সেনগুপ্ত

এক বাঙালি ক্রিকেটারের জন্ম হয়েছিল ২০ মে, ১৯৪৭ তারিখে। সাতের দশকে যাঁর নাম সুনীল গাভাসকারের সঙ্গী ওপেনার হিসেবে হামেশাই বিবেচিত হত। নানা কারণে শেষ পর্যন্ত টেস্টে অভিষেক হয়নি তাঁর। যিনি শুরুতে অফস্পিন করতেন। কিন্তু বোলিং অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় জোর দেন ব্যাটিংয়ে এবং পরিবর্তিত হন এক ওপেনারে। বড় ইনিংস খেলার ধৈর্য্য ছিল তাঁর। চশমা পরা এই ওপেনার ঘরোয়া ক্রিকেটে বাংলার হয়ে বেশ সাফল্যও পেয়েছিলেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৭৮ ম্যাচে ৩৭৫৭ রান করেছেন তিনি। গড় ৩০.৭৯। আটটি শতরান ছিল তাঁর নামে। সর্বাধিক ১৭০। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ছিল ৭২ উইকেটও।

১৯৭৩-৭৪ ইরাণী ট্রফিতে বোম্বাইয়ের (তখনও মুম্বইয়ের জন্ম হয়নি) বিরুদ্ধে অবশিষ্ট ভারতের হয়ে অপরাজিত ম্যারাথন ১৭৪ রান প্রথম ভারতীয় ক্রিকেটের পাদপ্রদীপের সামনে নিয়ে এসেছিল এই সোজাসাপ্টা স্পষ্টভাষী বাঙালী ওপেনার-ক্রিকেটারকে।

তার পরেই তিনি নির্বাচিত হন ভারতীয় দলের ওপেনার হিসেবে শ্রীলঙ্কা সফরে “বেসরকারি টেস্ট”( তখন অনুরা টেনিকুনের নেতৃত্বাধীন শ্রীলঙ্কা সরকারি টেস্ট দল হিসেবে গণ্য হতো না) দলে।

কলম্বোর সেই বেসরকারি টেস্টে ভারত প্রথম ইনিংসে ১৪১ রানে পিছিয়ে পড়েছিল। তিনি শ্রীলঙ্কায় বেসরকারি টেস্টে ওপেন করতে নেমে গাভাসকারের সঙ্গে প্রথম উইকেটে ১৯৪ রান যোগ করেছিলেন। আর জীবনের প্রথম টেস্টেই ( হোক না সে বেসরকারি ) তিন অঙ্কের রান করেছিলেন তিনি (১০৪)। হ্যাঁ, বাঙালি হিসেবে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের আগেই অভিষেক টেস্টে শতরানের রেকর্ড তাঁর নামেই থাকার কথা। কিন্তু যেহেতু শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সেই টেস্ট ‘সরকারি স্বীকৃতি’ পায়নি, তাই তাঁর এই সাফল্যও রেকর্ড বইতে জায়গা পায়নি। কিন্তু রেকর্ড বইতে না থাক, বাঙালির নস্টালজিয়ায় চিরস্থায়ী আসনের বন্দোবস্ত করে রেখেছেন তিনি। শতরানও। পরের ম্যাচে তিনি করেছিলেন ৫৪ ও ৫। শেষ পর্যন্ত তিনি ‘সরকারি টেস্টে’ সুযোগ পাননি।

 

বরাবরই স্পষ্টভাষী ছিলেন এবং এই কারণেই যে কোনও অন্যায়ের প্রতিবাদে গর্জেও উঠতেন তিনি, আপস না করে। হয়তো ভারতের স্বাধীনতার অব্যবহিত আগে জন্ম হয়েছিল বলেই খুব স্বাধীনচেতা ছিলেন এই ক্রিকেটার। সেই কারণে অনেক দরজা বন্ধও হয়ে গিয়েছিল তাঁর সামনে। ১৯৭৪ সালে ইংল্যান্ড সফরে গিয়েছিলেন। তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন একটি একদিবসীয় ম্যাচে (২৫-২৬ জুলাই ১৯৭৪)। তাতে ১৩ রান করেন। পুরো ১১ ওভার বল করে নিয়েছিলেন ডেভিড লয়েডের উইকেট। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আর সুযোগ পাননি এই বাঙালি ওপেনার। টেস্ট দলে তাঁকে বসিয়ে ওপেন করানো হয় সুধীর নায়েককে দিয়ে, যিনি চূড়ান্ত ব্যর্থ হন মাঠে ও মাঠের বাইরেও (মোজা কান্ড)। ১৯৭৪-৭৫ মরসুমে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভারত সফরের সময় ফের তাঁর কথা ভেবেছিলেন জাতীয় নির্বাচকরা। ১৪ সদস্যের ভারতীয় দলে সুযোগ পেয়েও শেষ পর্যন্ত তাঁকে কোনও এক অজ্ঞাত কারণে দল থেকে ছেঁটে ফেলা হয়। এরপর গোটা কেরিয়ারে আর কখনওই দেশের জার্সি গায়ে চাপানোর সুযোগ পাননি। চিরতরে এই বাঙালি ওপেনারকে ভারতীয় দলের বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়।

এরপর থেকে আজীবন বাংলার হয়েই খেলেছেন এই ডান হাতি ব্যাটসম্যান ও অফ-ব্রেক বোলার। জাতীয় দলের হয়ে মাত্র একটি একদিবসীয় ম্যাচ (১৯৭৪, বনাম ইংল্যান্ড, ১৩ রান ও ১১ ওভারে ৩৯/১) খেললেও এই দুর্ধর্ষ ডানহাতি ব্যাটসম্যান ঘরোয়া ক্রিকেটে বাংলার হয়ে বরাবর সফল ছিলেন। তখন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের কথা বললেই সবার আগে গোপাল বসুর নাম চলে আসত। সেই সময়কার ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির শিকার হয়েছিলেন তিনি, নতুবা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আরও বহুবার তাঁর প্রতিভাকে চাক্ষুষ করতে পারত। কলকাতার ক্লাব ক্রিকেটে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, কালীঘাট আর স্পোর্টিং ইউনিয়নের হয়ে খেলতেন তিনি, অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে। সাতের দশকেই তিনি ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছিলেন।

বাঙালি ক্রিকেটপ্রেমীদের মনের মণিকোঠা থেকে তাঁকে সরানো যাবে না কোনদিন। সেখানে থেকে যাবেন তিনি চিরদিন।বাংলার ক্রিকেটের যে গর্বের  ইতিহাস, তাতে উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা থাকবে তাঁর নাম। তাঁর ক্রিকেট গরিমায় একটা সময় বাংলা ক্রিকেটকে প্রাণিত করেছিলেন তিনি। পৌঁছেছিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আঙিনায়। কিন্তু, ভারতীয় ক্রিকেটে বাংলার খেলোয়াড়দের বঞ্চনার যে গল্প বরাবর শোনা গিয়েছে, তারই বহমান চরিত্র ছিলেন তিনি। তবু থেমে থাকেননি তিনি। ক্রিকেট ছাড়ার পর কোচ হিসাবে বাংলাকে একের পর এক সফল ক্রিকেটার উপহার দিয়েছেন। খেলা ছাড়ার পরও ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। বাংলার নির্বাচক হয়েছিলেন। জুনিয়র পর্যায়ে কোচিংও করিয়েছেন বাংলা দলে। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, শরদিন্দু মুখোপাধ্যায়, রণদেব বসু সহ অনেক জুনিয়র ক্রিকেটারেরও উঠে আসার নেপথ্যে অবদান ছিল তাঁর। বাংলার হয়ে তাঁর অবদান বাঙালি ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

২০০৮ সালে বিরাট কোহলির নেতৃত্বে ভারতের যে দল অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, তার ম্যানেজারও ছিলেন গোপাল বসু। ক্রিকেটজীবনে টেস্ট ক্যাপ না জুটলেও ম্যানেজার হিসেবে পেয়েছিলেন বিশ্বজয়ীর পদক। যা কিছুটা প্রলেপ হয়ে উঠেছিল যন্ত্রণায়।

আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে, ২৬/০৮/২০১৮ তারিখে ভোরে, লন্ডনে বার্মিংহামের হাসপাতালে ৭১ বছর বয়সে প্রয়াত হন বাংলার এই প্রবাদপ্রতিম ক্রিকেটার গোপাল শঙ্কর বসু। বাংলা ক্রিকেট যাকে চিনত “গোপালদা” নামে। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে গোপালদাকে এক সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমী ও বাংলার তরফ থেকে জানাই অন্তরের শ্রদ্ধা ও প্রণাম।

Comments are closed.