বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৯

টেরোড্যাক্টিলের ডিম

  • 591
  •  
  •  
    591
    Shares

ব্রাত্য বসু

ইস্টবেঙ্গল ক্লাব একসময়ে, আমার ছেলেবালার খুবই উন্মাদনার এবং প্যাশনের ক্ষেত্র ছিল। কিন্তু এখন আর ততটা নেই। হয়তো বয়স এর একটা কারণ। কিন্তু ভারতীয় ফুটবল, তার সম্পর্কে রাষ্ট্রিক অনাদর,  ফুটবল বিষয়টাই ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে যাওয়া— এ  সব আমাকে ধীরে ধীরে কলকাতার ফুটবল সম্পর্কে বিমুখ করেছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভারতবর্ষের অবস্থা নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু ক্লাব ফুটবলেও তা ক্রমশ চুঁইয়ে পড়ছে। ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড বা লিভারপুল বাদ দিয়ে যেমন ইংল্যান্ডের ফুটবল ভাবা যায় না, এসি মিলান বা ইন্টার মিলান বাদ দিয়ে যেমন ইতালির ফুটবল ভাবা যায় না, বার্সেলোনা বা রিয়েল মাদ্রিদ ছাড়া যেমন স্প্যানিশ ফুটবল ভাবা যায় না, তেমনই ক্লাব ফুটবল বেঁচে থাকতে গেলে রাষ্ট্রীয় ফুটবল চেতনা খুবই উঁচুর দিকে জাগ্রত থাকা উচিত। যেহেতু ভারতবর্ষে খেলাকেন্দ্রিক পুঁজি প্রায় পুরোটাই ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে আবর্তিত, ফলে ভারতবর্ষের উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত সমাজ, মিডিয়া, গুরুত্বপূর্ণ মানুষের নজর ক্রিকেটকে কেন্দ্র করেই। অথচ সিরিয়াস আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে ৭-৮টি দেশ। আর ফুটবল খেলে সারা পৃথিবীতে দেড়শোরও বেশি দেশ। আমাদের দেশের ফুটবল ক্রমশ মুমূর্ষু হতে বসেছে।

গত শতাব্দীর আটের দশকে চিরিচ মিলোভান নামের এক যুগোস্লাভ কোচ (তখন সাবেক যুগোস্লাভিয়া বিদ্যমান) ভারতবর্ষে আসেন। আমার মতে, যিনি ভারতীয় ফুটবলকে একটি মাত্রাগত উচ্চতায় তুলে দিয়েছিলেন। মিলোভানকে যথেষ্ট বিতর্কের মধ্যে দেশ ছাড়তে হয়। দুটো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন তিনি। এক, ফুটবলারদের তিনি পতিতা বা বারাঙ্গনাদের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। যাদের কোনও নির্দিষ্ট খদ্দেরের কাছে দায়বদ্ধতা নেই। এবং দুই, তিনি ক্লাব ফুটবলকে বাঁচিয়ে রাখার পিছনে সামাজিক মনোযোগের কথা বলেছিলেন। ওই আটের দশক থেকেই ভারতবর্ষের ক্রীড়াকেন্দ্রিক এক ধরনের শিফটিং অফ ফোকাস হয়। প্রুডেনশিয়াল কাপ জেতার পর যা কিনা মূলত উচ্চবিত্তের খেলা বলে পরিচিত ছিল অর্থাৎ ক্রিকেট, তাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় মধ্যবিত্ত গণহারে আকৃষ্ট হতে শুরু করে। পাশাপাশি, ইস্টবেঙ্গল বা মোহনবাগান ক্লাব ওই গত শতাব্দীর আটের দশক থেকে মধ্যবিত্তের আকর্ষণ হারাতে শুরু করে। কারণ, ১৯৮২তে স্পেন বিশ্বকাপের (এসপানা ৮২) দুটি সেমিফাইনাল, তৃতীয় স্থানাধিকারের ম্যাচ এবং ফাইনাল খেলাটি সরাসরি ভারতীয় দূরদর্শন সম্প্রচার করে। ১৯৮৬-তে মেক্সিকো বিশ্বকাপের প্রাথমিক রাউন্ড থেকে ফাইনাল পর্যন্ত পুরোটা দেখায়। ফলে যা সাতের দশক পর্যন্ত হয়নি, অর্থাৎ বেকেনবাওয়ারের সঙ্গে কখনও গৌতম সরকারের সরাসরি তুলনা হয়নি। গর্ডন ব্যাঙ্কসের সঙ্গে তরুণ বসু বা জিয়াচিন্তো ফ্যাচেত্তির সঙ্গে সুধীর কর্মকারের তুলনা হয়নি। আটের দশকে কৃশানু দে বা কার্তিক শেঠ বা সত্যজিৎ চ্যাটার্জি বা বিকাশ পাঁজিদের সঙ্গে ভারতীয় তথা বাঙালিরা সরাসরি তুলনা করতে পারল মারাদোনা, জিকো, প্লাতিনি বা সক্রেটিসের। ফলে অবস্থাটা ফিকে হতে শুরু করল। গত শতাব্দীর নয়ের দশক থেকে ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে সমস্ত পুঁজি আবর্তিত হতে শুরু করল। বেটিং শব্দটি মাঝখানে এসে সাময়িক ভাটা তৈরি করল বটে, কিন্তু তা সার্বিক উন্মাদনা কমাতে পারল না। রঞ্জি ট্রফি চালু হওয়ার অন্তত ৪০ বছর পর বাংলা রঞ্জি ট্রফি জিতেছিল সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে। বাঙালির ক্রিকেট নিয়ে এক ধরনের হীনমন্যতা ছিল। সম্বরণ বা অরুণলাল সেই হীনমন্যতা দূর করতে পেরেছিলেন। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়কত্ব লাভ বাঙালির কাছে ক্রিকেটকে এক অন্য গরিমা, অন্য মাত্রায় তুলে দিল। পাশাপাশি কলকাতা ফুটবল প্রথমে মদ্য ব্যবসায়ীদের হাতে, তারপর অংশত চিটফান্ড ব্যবসায়ীদের হাতে পড়ে সাময়িক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারল বটে, কিন্তু সার্বিক পুঁজির সঙ্গে তারা যুঝে উঠতে পারছিল না।

বাইচুং ভুটিয়া, সুনীল ছেত্রী একক উদ্যোগে ইউরোপের কোনও ক্লাবে ফুটবল খেলতে গেলেও, সেটা তাঁদের ব্যক্তি-উদ্যম হিসেবে দেখাই ভাল। তার পিছনে কোনও রাষ্ট্রিক ভূমিকা ছিল না। অন্যদিকে ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর তৈরি হওয়া নতুন দুই শব্দ ঘটি এবং বাঙাল, তারাও তাদের মাহাত্ম্য হারাতে শুরু করেছিল। কারণ, বহু বাঙাল বিয়ে করেছেন ঘটিকে, বহু ঘটি বিয়ে করেছেন বাঙালকে। ঘটি-বাঙালের চিরন্তন রেষারেষিটা তাঁদের পরের প্রজন্মের বুঝে ওঠা স্বাভাবিক ভাবেই সম্ভব ছিল না। এ দিকে তারা দেখছে সারা ভারতে ফুটবলের মান কমে যাচ্ছে। ফুটবলটা ক্রমশ প্রান্তিক মানুষের খেলা হয়ে উঠল। সারা পৃথিবীতেই ফুটবল সাবঅল্টার্নদেরই খেলা। কিন্তু সমাজের গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা সাবঅল্টার্নের স্বার্থে এবং নিজেদের পুঁজির স্বার্থে ফুটবলকে কেন্দ্র করে এই উন্মাদনা টিকিয়ে রাখেন। আমাদের দেশে সেই চেষ্টা দেখা গেল না। ফলে ইস্টবেঙ্গল বা মোহনবাগান ডাইনোসরের মতো বৃহৎ হয়েও ক্রমশ তাদের মাহাত্ম্য হারাতে শুরু করল। আজকে ইস্টবেঙ্গল ১০০ বছরে পড়তে যাচ্ছে সেটা খুবই আনন্দের খবর ঠিকই, কিন্তু স্বাধীনতার পর ৭০ বছর হয়ে গেলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভারত ক্রমশ পিছিয়ে গিয়েছে। সমাজের মূল চাহিদাটা ক্রিকেটের দিকেই।

শুনেছি বিরাট কোহলি এবং তাঁর নবপরিণীতা ফিল্মস্টার স্ত্রীর শুধু বিজ্ঞাপন থেকে বার্ষিক আয় এক হাজার কোটি টাকা। এর থেকে ২০০ কোটি টাকা যদি ভারতীয় ফুটবল পেত এবং ক্লাব ফুটবলকে চাঙ্গা করার জন্য সত্যিকারের পুঁজিপতিরা আগ্রহী হতেন, তাহলে ক্লাব ফুটবল এবং ভারতীয় ফুটবল একই সঙ্গে চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারত। লক্ষ করলে দেখা যাবে  তৃতীয় বিশ্বের যে দেশগুলি গত কয়েক বছরে বিশ্বকাপ খেলেছে তাদের দেশের আর্থিক উন্নতি প্রবল ভাবে বেড়েছে। আমি মনে করি ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগানের মতো ঐতিহ্যশালী ক্লাব  রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছাড়া বাঁচতে পারে। রাষ্ট্র ভাববে রাষ্ট্রীয় ফুটবল নিয়ে। ব্যক্তিগত অন্ত্রপ্রনোয়াররা ভাববেন ক্লাব ফুটবল নিয়ে। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় দরকার। আমার মনে হয় মোহনবাগান সাবেক বাঙালিয়ানা এবং ভারতীয় ফুটবলকে প্রতিষ্ঠা করেছে। একই ভাবে দেশভাগের পর হিন্দু বাঙালরা যে সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠল না, তার একটা বড় কারণ ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের উপস্থিতি। অর্থাৎ এই দুই ক্লাবেরই বিরাট ঐতিহ্য আছে। মোহনবাগান ১০০ পেরিয়েছে। ইস্টবেঙ্গল পেরোতে যাচ্ছে। কিন্তু এরা কি এখন একই মুদ্রার এ পিঠ-ও পিঠ নয়? যে মুদ্রাটি অচল এবং বর্জনযোগ্য! আসলে মুদ্রাটিই পাল্টানো দরকার। সেটা পাল্টাতে গেলে যে সামাজিক আলোড়ন প্রয়োজন, তা দুর্ভাগ্যবশত ভারতবর্ষের কেন্দ্রীয় সরকার বোঝেন না। কোনওদিনই বোঝেননি। আগামী দিনেও বুঝবেন বলে মনে হয় না। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের ১০০ বছরে আমি গর্বিত ঠিকই, কিন্তু সেই গর্বের মধ্যে বেশ কয়েক ফোঁটা চোখের জলও লুকিয়ে রয়েছে। আমি নিজের প্রতি করুণা দেখাতে আগ্রহী নই। স্বভাবতই আমার প্রিয় ক্লাবের পিছনেও সেই করুণা দেখাতে হবে তা আমি চাইব না। আমাকে যদি ব্যক্তিগত ভাবে জিজ্ঞেস করেন, গুপী গাইন-বাঘা বাইনের ভূতের রাজার থেকে কোন তিনটি বর আমি চাইতে পারি, তার মধ্যে অবশ্যই একটা থাকবে ভারতবর্ষের ফুটবল বিশ্বকাপ খেলা। চাইলেই ভূতের রাজা আমায় সেই বর দিতে পারবেন কিনা জানি না। আপাতত আমি সেই দিকেই তাকিয়ে রয়েছি।

Comments are closed.