সোমবার, ডিসেম্বর ১৬
TheWall
TheWall

সেই ত্রয়ীর কী হলো? চ্যাম্পিয়নস লিগ কি কোনও ইঙ্গিত দিচ্ছে!

দেবার্ক ভট্টাচার্য্য

এক দশক পরে ছবিটা বদলাচ্ছে। গত ১০ বছরে চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাস দেখলেই দেখা যাবে স্পেন, জার্মানি ও ইতালির দলগুলির রমরমা। এই ১০ বছরে চারবার ট্রফি পেয়েছে রিয়েল মাদ্রিদ। তিনবার ট্রফি উঠেছে মেসিদের হাতে। একবার করে ইন্টারমিলান, বায়ার্ন মিউনিখ ও চেলসি ইউরোপের সেরা ক্লাবের স্বীকৃতি পেয়েছে। মানে গত দশ বছরে ইংল্যান্ডের ক্লাব হিসেবে একমাত্র চেলসির হাতেই কাপ উঠেছে। কিন্তু এ বারের ছবিটা আলাদা। এ বার শেষ আটের লড়াইয়ে চারটি ব্রিটিশ ক্লাব। ম্যাঞ্চেস্টার সিটি, ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড ছাড়াও রয়েছে লিভারপুল ও টটেনহ্যাম হটসপার। স্প্যানিশ ক্লাব বলতে একমাত্র বার্সা। ইতালির ক্লাব জুভেন্টাস ছাড়া রয়েছে নেদারল্যান্ডসের ক্লাব আয়াক্স ও পর্তুগালের ক্লাব এফসি পোর্তো। আর এই ছবির বদলটা কি ইঙ্গিত দিচ্ছে ইউরোপের সামগ্রিক ফুটবলের ছবির বদলের দিকেই?

গত কয়েক বছর ধরে বিশ্ব ফুটবলে দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করেছে স্পেন ও জার্মানি। বিশ্বকাপ, ইউরো কাপ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, সব জায়গায় এই দুই দেশের দাপট। আর তার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে তিনটে ক্লাবের নাম। স্পেনের রিয়েল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা। জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখ। আসলে গত কয়েক বছরে স্পেনের জাতীয় দল মানেই এই দুই ক্লাব। সের্জিও র‍্যামোস, পিকে, জ্যাভি, ইনিয়েস্তা, বুসকেতস, পেদ্রো, ডেভিড ভিয়া অর্থাৎ প্রায় পুরো স্পেন দলটাই খেলত এই দুই ক্লাবে। ফলে শুধু ফিফা টুর্নামেন্টই নয়, গোটা বছর একসঙ্গে খেলতেন তাঁরা। তার সঙ্গে ছিল অ্যাকাডেমি থেকে তুলে আনা ফুটবলার। জার্মানির ক্ষেত্রেও এই জিনিসটা কয়েক বছর ধরে করে গিয়েছে বায়ার্ন মিউনিখ। এই দুই দেশ ছাড়াও ইতালির জুভেন্টাসের নাম করা যায়। জুভেন্টাসের কিয়েলিনি, বোনুচ্চি ও বারজাগলির ডিফেন্স জাতীয় দলের ডিফেন্স। ফলে এই ডিফেন্সের জোরেই ফিফা টুর্নামেন্টে সাফল্য পেয়েছে ইতালিও।

অন্যদিকে ইংল্যান্ডের ক্লাবগুলোর ছবিটা ছিল কিছুটা আলাদা। প্রথম সারির ক্লাবগুলোর বেশিরভাগ ফুটবলারই বাইরের। ইংল্যান্ডের জাতীয় দলের বেশিরভাগ ফুটবলার জায়গা পেতেন না প্রথম সারির এইসব ক্লাবে। তার সঙ্গে সেই সময় ইংল্যান্ডে তরুণ প্রতিভা সেভাবে উঠে আসছিল না। ওয়েন রুনি, জেরার্ড, ল্যাম্পার্ডরা ক্লাবে যতটা সফল, দেশের হয়ে নয়। প্রত্যেক বার ফিফা টুর্নামেন্টের আগে কাগুজে বাঘ ইংল্যান্ড টুর্নামেন্ট শুরু হতেই মুখ থুবরে পড়ত।

কিন্তু সময়ে বদল এসেছে।

স্পেনের জাতীয় দলের প্রধান ফুটবলাররা অনেকেই অবসর নিয়েছেন। তাঁদের জায়গা ভরাট করার মতো ফুটবলার এখনও আনা সম্ভব হয়নি। জার্মানির ক্ষেত্রেও ছবিটা এক। ফিলিপ লাম, মাইকেল ব্যালাকদের শূণ্যস্থান পূরণ করতে পারেননি কেউ। ইতালির ক্ষেত্রে বুঁফো, কিয়েলিনিদের বয়স হচ্ছে, পির্লো, তোত্তিরা আর খেলেন না। এর ফল বোঝা গিয়েছে রাশিয়া বিশ্বকাপে। ইতালি যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। স্পেন আয়োজক দেশ রাশিয়ার কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে। আর জার্মানি তো গ্রুপের বাধা টপকাতে পারেনি।

এর ঠিক উল্টো ছবি ইংল্যান্ডে। ফের নতুন করে উঠে আসছে থ্রি লায়ন্সরা। বিশ্বকাপে দুরন্ত খেলেছেন হ্যারি কেনরা। সেমি ফাইনালে হারলেও অনেক দিন পর মনে হয়েছে, এই দল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ক্ষমতা রাখে। বিশ্বের সব লিগগুলো দেখলে বোঝা যাবে ইংল্যান্ডের লিগে ঠিক কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা। যেখানে লা লিগা, বুন্দেশলিগা বা সিরি এ-তে দু-তিনটে দলের মধ্যেই লড়াই হয়, সেখানে ইংল্যান্ডে ৫-৬টি দল লিগের লড়াইয়ে রয়েছে।

চ্যাম্পিয়নস লিগেও দেখা গিয়েছে এই ছবি। জার্মানির কোনও ক্লাব নেই শেষ আটে। কোয়ার্টার ফাইনালে লিভারপুলের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছে বায়ার্ন মিউনিখকে। স্পেনের একমাত্র প্রতিনিধি বার্সেলোনা। ইতালির একমাত্র প্রতিনিধি জুভেন্টাস। অথচ শুধুমাত্র ইংল্যান্ড থেকেই চার-চারটে দল।

ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, এর আরও একটা কারণ ইউথ সিস্টেম। ইংল্যান্ডের ইউথ সিস্টেম এখন বিশ্বে সবথেকে ভালো। সেটার পরিচয় দেখা গিয়েছে অনুর্ধ ১৭ বিশ্বকাপে। ভারতে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে গোটা বিশ্ব দেখেছেন ফিল ফডেনের মতো তরুণ প্রতিভার বিচ্ছুরণ। এ বছর চ্যাম্পিয়নস লিগে সর্বকণিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে গোল করেছেন ফিল ফডেন। আর এই তরুণ প্রতিভার ফলেই ইংল্যান্ড বিশ্ব ফুটবলের আঙিনায় ফের উঠে আসছে। ফের দেখা যাচ্ছে থ্রি লায়ন্সদের হুঙ্কার। কাগুজে বাঘ থেকে মাঠের বাঘে পরিণত হচ্ছে ইংল্যান্ড।

ফুটবলের ছবিটা বদলাচ্ছে। সে ফুটবল হোক কি রাজনীতির ময়দান, বদলটাই আসলে নিয়ম।

Comments are closed.