বুধবার, নভেম্বর ২০
TheWall
TheWall

আবেগ-উন্মাদনা থাক, আর যেন না ফেরে ৮০’র ১৬ অগস্ট

দেবাশিস সেনগুপ্ত

কার্তিক মাইতি, উত্তম চাউলে, সমীর দাস, অলোক দাস, সনৎ বসু, নবীন নস্কর, কল্যাণ সামন্ত, অসীম চট্টোপাধ্যায়, রবীন আদক, কার্তিক মাঝি, ধনঞ্জয় দাস, শ্যামল বিশ্বাস, মদনমোহন বাগলি, প্রশান্ত দত্ত, হিমাংশু শেখর দাস এবং বিশ্বজিত কর।

এই ১৬টি নাম কারও শোনা? অথবা এঁদের কাউকে আপনারা কেউ চেনেন? মনে পড়ছে না ঠিকঠাক? নাকি আবছা আবছা মনে আসছে কিছু দৃশ্য, কিছু দুঃসহ আর বীভৎস স্মৃতি? না, আর কর চাপাবেন না স্মৃতির উপর। বরং কলকাতা ময়দানের এক বিশেষ দিনের একটা কাহিনী নয়, “গল্প হলেও সত্যি” শুনে যান, আজ।

১৬ অগস্ট ১৯৮০। যে দিনটির কথা গত ৩৯ বছর ধরে তাড়া করে বেড়ায় আমাদের আর কলকাতা ময়দানের মেঠো হানাহানির রক্তাক্ত সময়কে ঘিরে ফেলে এক নিদারুণ লজ্জার ইতিহাস। আজ আবার সেই ১৬ অগস্ট। ৩৯ বছর পিছিয়ে আজ আবার একবার ফিরে দেখে নেওয়া সেই লজ্জার ইতিহাস। এবং সেই গ্লানিবোধে আর একবার প্রায়শ্চিত্ত করি সেই পঙ্কিল পাপের দিনটির মাথা নিচু করে দেওয়া পিচ্ছিল কর্মকান্ডের। সেটা ছিল ১৯৮০ সাল। ময়দানের তিন বড় টিমের তারকা ফুটবলাররা রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলেও তখন ঘিরে ফেলত জনতা। কলকাতা তখন মজে শুধুই ফুটবলে। দুপুর গড়াতে না গড়াতে তখন গড়ের মাঠ লোকে লোকারণ্য। ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান ড্র করলেও তখন কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটত জনতাকে সামলাতে। মহামেডান ম্যাচ হারলেও রেড রোডে অবধারিত ভাবে গাড়ির কাঁচ ভাঙত তখন।

কম্পটন দত্তর নেতৃত্বে মোহনবাগান টিম সে বারে দারুণ ব্যালান্সড ছিল। গোলে শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়, ডিফেন্সে কম্পটন দত্ত-সুব্রত ভট্টাচার্য-প্রদীপ চৌধুরী-শ্যামল বন্দ্যোপাধ্যায়, হাফব্যাকে গৌতম সরকার-প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় আর ফরোয়ার্ডে মানস ভট্টাচার্য-মিহির বসু-জেভিয়ার পায়াস-বিদেশ বসুরা সে বার মোহনবাগানের হয়ে দৃষ্টিনন্দন ফুটবল খেলছিলেন শুরু থেকেই। তবু ফেডারেশন কাপে ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে যুগ্মবিজয়ী হতে হয় মোহনবাগানকে। আর তাই মোহনবাগান মুখিয়ে ছিল কলকাতা লিগ এককভাবে জিততে।

অন্যদিকে সুরজিত সেনগুপ্তর নেতৃত্বে দলবদলের বাজারে তছনছ হয়ে যাওয়া ইস্টবেঙ্গলকে সে বার প্রায় একা টানছিলেন ইরানের প্রাক্তন বিশ্বকাপার মজিদ বাসকার। সাথে বুড়ো ঘোড়া মহম্মদ হাবিব আর সুধীর কর্মকার এবং টগবগে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য। কলকাতায় ফেডারেশন কাপে মজিদের খেলা দেখে ইস্টবেঙ্গল জনতা বুঝে যায় যে, ছেড়ে যাওয়া ফুটবলারদের জন্য তাঁদের আর আফশোস করতে হবে না। তাঁদের ত্রাণকর্তা এসে গেছেন। কলকাতা লুফে নিয়েছিল তাঁকে। ফেডারেশন কাপে মোহনবাগানের সঙ্গে যুগ্মবিজয়ী ইস্টবেঙ্গল কলকাতা লিগেও সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছিল মোহনবাগানকে।

২টি গ্রুপে ভাগ করে খেলা হচ্ছিল সে বার কলকাতা লিগে। একই গ্রুপে ছিল ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান। অন্য গ্রুপে ছিল সুরজিত সেনগুপ্তর সৌজন্যে সে বারের অমিত শক্তিধর মহমেডান স্পোর্টিং টিম। ১৬ অগস্ট ১৯৮০ তারিখে গ্রুপের ম্যাচে ইডেনে মুখোমুখি হয় মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে সেমিফাইনালে মহমেডান স্পোর্টিংকে এড়িয়ে যাওয়া যেত, তাই মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল দুই পক্ষই মরিয়া ছিল ওই ম্যাচটি জিততে। সেই লজ্জা-দিনের খেলোয়াড়রা, কোচরা ও রেফারির নাম ছিল এইরকম:-

মোহনবাগান

শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়, কম্পটন দত্ত (অধিনায়ক), সুব্রত ভট্টাচার্য, প্রদীপ চৌধুরী, শ্যামল বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌতম সরকার, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, মানস ভট্টাচার্য, মিহির বসু, জেভিয়ার পায়াস (উলগানাথন) ও বিদেশ বসু।

অতিরিক্ত

জগদীশ ঘোষ, প্রতাপ ঘোষ, ফ্রান্সিস ডি’সুজা, শ্যাম থাপা, রঞ্জিত মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণ মিত্র, মুনীশ মান্না, সঞ্জীব চৌধুরী ও অশোক চক্রবর্তী।

কোচ – অরুণ ঘোষ।

ইস্টবেঙ্গল

দিলীপ পাল, দিলীপ পালিত, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, সমর ভট্টাচার্য, সত্যজিত মিত্র (অধিনায়ক), মহম্মদ হাবিব (হরজিন্দার সিং), সুধীর কর্মকার, মহম্মদ খাবাজী ( কাজল চট্টোপাধ্যায় ), তপন দাস, জামশিদ নাসিরি ও মজিদ বাসকার।

অতিরিক্ত

নাসির আহমেদ, মহম্মদ নাজিব, সুভাষ রায়, অমিত গুহ, সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ লতিফুদ্দিন, সুমিত বাগচী, টমাস ম্যাথুজ ও বিভাস সরকার।

কোচ – পি.কে. বন্দ্যোপাধ্যায়।

রেফারী – সুধীন চট্টোপাধ্যায়।

এই পটভূমিকায় খেলা শুরু হতেই চোরাগোপ্তা এবং সরাসরি বিসদৃশ ফাউলের বন্যা বইতে থাকে প্রথমার্ধে। মরিয়া ফাউলের স্ট্র্যাটেজিতে দু’পক্ষই প্রতিপক্ষের খেলা নষ্ট করার মারণখেলায় মেতে ওঠে। তিলধারণের জায়গা না থাকা গ্যালারিতে দু’দলেরই সমর্থকরা ফুঁসে ফুঁসে উঠছিলেন মাঝে মাঝেই। মাঝে মাঝেই ইঁট ছোঁড়াছুঁড়ির সমান্তরাল খেলা চলছিল রঞ্জি স্টেডিয়াম (যেখানে এমনিতে টিকিট দেওয়া হত না, সে দিন হয়েছিল) আর আকাশবাণীর সামনের গ্যালারির দর্শকদের মধ্যে।

এইভাবে চলতে চলতেই প্রথমার্ধ শেষ হয়ে যায় গোলশূন্য অবস্থায়। তখনও কেউ জানতেন না কী ঘটতে চলেছে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই কয়েক মিনিটের মধ্যেই। বিদেশ বসুর তীব্র গতি সামলাতে না পেরে কোচের নির্দেশে অনভ্যস্ত রাইট ব্যাকে খেলা টাফ ডিফেন্ডার দিলীপ পালিত বেশ কয়েকবার বাজে ফাউল করে ফেলেছিলেন বিদেশ বসুকে, প্রথমার্ধে। তখন থেকেই ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটছিল বিদেশ বসুর। দ্বিতীয়ার্ধের খেলার বয়েস বারো মিনিট তখন। আবার একটি বিশ্রী ফাউল করেছিলেন দিলীপ পালিত, বিদেশ বসুর বিরুদ্ধে। এবার  বিদেশ বসু বলছাড়া পাল্টা লাথি মেরে বসেন দিলীপ পালিতকে। তখনই রেফারী সুধীন চট্টোপাধ্যায় দু’জনকেই লালকার্ড দেখান ।

আগুনের ফুলকি হয়ে থাকা গ্যালারিতে ঘি পড়ে সেই মুহূর্তে। রঞ্জি স্ট্যান্ডেই দু’পক্ষের সমর্থকদের মুখোমুখি সংঘর্ষ, কয়েকজনের পড়ে যাওয়া আর প্রাণভয়ে ভীত সমর্থকদের নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে সৃষ্ট হুড়োহুড়িতে পড়ে যাওয়া সমর্থকদের মাড়িয়ে চলে যাওয়া – সব মিলিয়ে নরক হয়ে যায় ইডেন সে দিন। মারা যান ১৬ জন সমর্থক। আহত আর মৃত দেহগুলি হাতে হাতে ঝুলিয়ে আপার টায়ার থেকে নামানো হতে থাকে নীচের টায়ারে। এ সময় প্রায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে থাকা পুলিশ কিছু পরে লাঠিচার্জ শুরু করে অন্য গ্যালারিতে নিরীহ দর্শকদের উপর। বহু লোক তাতে আহত হন। কলকাতার হাসপাতালগুলি বীভৎস চেহারা নেয় সেই সন্ধেয়।

খেলা শেষ হয়েছিল ঐ গোলশূন্য অবস্থায়। লিগও আর শুরু করা যায়নি সে বার। সে দিনের সেই মেঠো লজ্জা আজও তাড়িয়ে বেড়ায় ফুটবলপ্রেমীদের আর সে দিনের খেলোয়াড়দের। মনে করতেও ভয় পান তাঁরা সেই দিনটাকে। আইএফএ ১৯৮১ থেকে প্রতি বছর এই দিনটা ফুটবলপ্রেমী-দিবস হিসেবে পালন করে ইডেনের ক্লাবহাউসে রক্তদান অনুষ্ঠান সংগঠন করে, যেখানে প্রশংসাপত্র সই করেন পুরনো দিনের কোনও বিখ্যাত ফুটবল তারকা। পরে মান্না দে তাঁর বিখ্যাত গান“খেলা ফুটবল খেলা” গেয়েছিলেন এই দিনের স্মরণে। সে দিনের সে লজ্জা কিন্তু এসবে ঢাকেনি। ফিরে আসেনি হারিয়ে যাওয়া জীবনগুলোও।

আজ আবার একটা ১৬ই অগস্ট। আজ মনে পড়বেই ৩৯ বছর আগের সেই কালো দিনটার কথা। সে আপনি সবুজমেরুন বা লালহলুদ, যে রঙেরই সমর্থক হোন না কেন! আবেগ, উন্মাদনা, উত্তেজনা……সব থাকুক। কিন্তু আর নয় ১৬ই অগষ্ট ১৯৮০।সেই ১৬ জনকে আমার সেলাম। বেঁচে থাক কলকাতার ফুটবল।

Comments are closed.