বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

জাদুকর লেগস্পিনার, স্পষ্টবক্তা, ক্রিকেটের বাইরে খুব বড় মনের মানুষ ছিলেন আবদুল কাদির

দেবাশিস সেনগুপ্ত

এক যে ছিলেন জাদুকর। না, এক যে ছিলেন লেগস্পিনার। আসলে তাও না, এক যে ছিলেন জাদুকর লেগস্পিনার। যাঁর জন্ম হয়েছিল লাহোরে, ১৯৫৫ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর। ১৯৭৫-৭৬-এ হাবিব ব্যাঙ্ক লিমিটেডের হয়ে তাঁর ক্রিকেটজীবন শুরু হয়।

১৩ বছরের টেস্ট জীবনে (১৯৭৭-১৯৯০) ৬৭ টেস্টে ২৩৬ উইকেট (৫ বার ম্যাচে ১০ উইকেট আর ১৫ বার ইনিংসে ৫ উইকেট) ছিল এই লেগ স্পিনারের ঝুলিতে। আর ১০ বছরের “একদিনের আন্তর্জাতিক” জীবনে (১৯৮৩-১৯৯৩) ১০৪ ম্যাচে ১৩২ উইকেট (২ বার ইনিংসে ৫ উইকেট) পেয়েছিলেন তিনি। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ এই বোলিং পরিসংখ্যানই অসাধারণ মনে হতে বাধ্য, যদি একবার চিন্তা করা হয় যে তার বোলিংয়ের সময় উল্টোদিকে কারা ব্যাট করেছেন! ভিভ থেকে সানি, বর্ডার, কপিল থেকে বথাম, হ্যাডলি, গাওয়ার থেকে লারা, স্টিভ ওয় এবং প্রথম জীবনের শচীনকে বল করতে হয়েছিল তাঁকে। টেস্টে বব উইলিস ছিলেন তাঁর প্রথম শিকার। তাঁর সময়ে তিনিই ছিলেন বিশ্বের সেরা লেগস্পিনার। তিনিই ছিলেন বিশ্বে প্রথম রিস্ট স্পিনার। তাঁর লেগব্রেক আর গুগলি ছিল ব্যাটসম্যানদের কাছ ত্রাসের নামান্তর। সঙ্গে থাকত নাচের সঙ্গে তুলনীয় অদ্ভুত এক বোলিং অ্যাকশন। দু’রকমের গুগলি দিতে পারতেন। এবং এক ওভারের ছ’টা বল ছ’রকম করতে জানতেন।

ভিভ রিচার্ডস একবারও তেমন বড় রান পাননি কাদিরের বিরুদ্ধে। তাঁর বন্ধু-কাম-অধিনায়ক ইমরান খানের মতে তিনি ছিলেন শেন ওয়ার্নের চেয়েও বড় লেগস্পিনার। একই মত পোষণ করেন ইংল্যান্ডের প্রাক্তন ওপেনার-কাম-অধিনায়ক গ্রাহাম গুচ।এত ম্যাচ তিনি দেশে এবং বিদেশে পাকিস্তানকে জিতিয়েছেন যে তা ছিল প্রায় রূপকথার মত। পরে এই রূপকথায় থাবা বসান টপ ফর্মের ওয়ার্ন-মুরলী-কুম্বলেরা। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১৯৮৭ সালে লাহোরে এক টেস্টে ৫৬ রানে ৯ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি, যেটা ছিল যে কোন টেস্ট ইনিংসে তাঁর সেরা বোলিং। “একদিনের আন্তর্জাতিক” ম্যাচে তাঁর সেরা বোলিং ছিল ৪৪ রানে ৫ উইকেট, শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে, ১৯৮৩র বিশ্বকাপে। ইমরান খান এখনও নিশ্চিত যে সেই আমলে আম্পায়াররা ফ্রন্টফুটে এলবিডব্লিউ দিলে এই বোলারেরও ওয়ার্নের মতো ৭০০ উইকেট হয়ে যেত। ব্যাটিংটাও খুব খারাপ করতেন না তিনি। ১০২৯ টেস্ট রান আর ৬৪১ “একদিনের আন্তর্জাতিক” রান এসেছিল তার ব্যাট থেকে।

৫টি টেস্ট এবং ২টি “একদিনের আন্তর্জাতিক” ম্যাচে তিনি পাকিস্তানের অধিনায়কত্ব করেছিলেন। এর মধ্যে ৪টি টেস্ট এবং ১টি “একদিনের আন্তর্জাতিক” ম্যাচে পরাজিত হয়েছিল পাকিস্তান। এই কারণেই তাঁর অধিনায়কত্বর ইনিংস ছিল ক্ষণস্থায়ী।

ইমরান খানকে অন্ধের মত বিশ্বাস করতেন তিনি। অবসরের পরে ইমরানের সঙ্গে যৌথ ব্যবসা শুরু করেন তিনি। তাঁদের কোম্পানির নাম ছিল “IQ SPORTS”। ইমরানের আদ্যক্ষর আই আর তাঁর নামের আদ্যক্ষর কিউ মিলে ছিল এই নামI তিনি চাননি ইমরান রাজনীতিতে নামু্ন। ভারতের বিরুদ্ধে স্পিনিং উইকেটে ব্যাঙ্গালোর টেস্টে তাকে খেলাননি সেই ইমরানই। গাভাসকরের লোকগাথায় ঢুকে যাওয়া ৯৬ সত্ত্বেও সেই টেস্ট জিতে পাকিস্তান সিরিজ ছিনিয়ে নেয়। অধিনায়ক ইমরান তার বিরানব্বইয়ের বিশ্বকাপজয়ী পাকিস্তান টিমে কাদিরের ১৩২ ওয়ান ডে উইকেট থাকা সত্ত্বেও তাঁর জায়গায় সুযোগ করে দেন মুস্তাক আহমেদকে। এতেই ত্বরাণ্বিত হয় ১৯৯৩ সালে তাঁর “একদিনের আন্তর্জাতিক” তথা ক্রিকেট থেকে অবসরগ্রহণ। যার ৩ বছর আগেই টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর ঘোষণা করেছিলেন তিনি।

খুব বড় মন ছিল তাঁর। ১৯৮৯-এ শচীনের প্রথম সিরিজে এক প্রদর্শনী ম্যাচে (বৃষ্টিতে পেশোয়ারের একদিনের ম্যাচ পণ্ড হয়ে যাবার পরে ২০ ওভারের প্রদর্শনী ম্যাচ হিসেবে খেলা হয়) ১৮ বলে ৫৩ করার পথে শচীন তাঁর এক ওভারে ৬,০,৪,৬,৬,৬, মোট ২৮ রান নিয়েছিলেন এবং পেশোয়ার ড্রেসিংরুমের কাচ ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। আগের ওভারেই অন্য এক পাক বোলারকে তেড়ে পেটাচ্ছিলেন শচীন, বিশাল আস্কিং রেট তাড়া করতে গিয়ে। তখন এই বোলার শচীনকে উস্কে দেন “আরে অন্য বোলারকে মারছিস কেন? যদি বড় ব্যাটসম্যান হোস আমায় মেরে দেখা।” অবশ্য খেলার আগে তিনিই শচীনকে সাহস দিয়ে বলেছিলেন তাঁকে এক সাধারণ গলিক্রিকেটের বোলার ভেবে খেলতে। বিশ্ব ক্রিকেটে (যদিও প্রদর্শনী ম্যাচ ছিল) অমর ওই ওভার শেষ হবার পরে ১৬ বছরের শচীনকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন এই বোলার, যাঁকে তখন বিশ্বের সেরা লেগস্পিনার মানা হত। তিনি নিজের থেকেই সাংবাদিকদের বলেছিলেন “মিলিয়ে নেবেন আমার কথা। এই ছেলেটা একদিন ভিভ রিচার্ডসের মতোই বড় হবে।”

তিনি সত্যি বলতেন বুক চিতিয়ে। ২০০৪-এ টিভি টক শো তে হাসান জলিলকে তাঁর বলা “সব সফল পাক ফাস্টবোলারই বল করতেন ‘বানানো’ বলে” প্রচুর বিতর্ক তৈরী করেছিল। যার জেরে পিটিভি তাঁর সঙ্গে যাবতীয় চুক্তি রদ করে। ‘বানানো’ বল বলতে ট্যাম্পার্ড বল বুঝিয়েছিলেন তিনি। বরাবরের স্পষ্টবক্তা বলে মিয়াঁদাদের মতো কোনও মন্ত্রী-আমলাকে ধরতে পারেননি।আর তাই পাক ক্রিকেট প্রশাসনে তাঁর ন্যায্য জায়গাটা পাননি অবসরোত্তর জীবনে। হয়তো ভাগ্যর হাতেই মার খাওয়া এটা।আজ পাক মসনদে ইমরান খান। কিন্তু ইমরানের সেরা লেগস্পিনার পাক ক্রিকেটের অবিসংবাদী সর্বকালীন ট্র্যাজিক নায়ক হিসেবে চলে গেলেন ইতিহাসের পাতাতে।

৯ দিন পরে ৬৪ পূর্ণ করার কথা ছিল কাদিরের। অথচ তাঁর শরীরে কোন রোগের চিহ্ণ ছিল না। কয়েক দিন আগেও তিনি গদ্দাফি স্টেডিয়ামের পিছনে নিজের অ্যাকাডেমিতে কোচিং করিয়েছেন। অথচ হৃদরোগে একান্তই নার্গিস বনের বুলবুলের মত নীরবে থেমে গেল এই পাকিস্তানী ক্রিকেটারের জীবন। যেভাবে তাঁর হাত থেকে অদ্ভুতভাবে ডেলিভারি হওয়া ফ্লিপারগুলো  মাঠ থেকে সরিয়ে দিত সেই সময়ের বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যানদের। নিজের ২২বছর থেকে ৩৮ বছর অবধি বিস্তৃত  ক্রিকেটজীবন যেমন আচমকাই থেমে যেতে বাধ্য হয়েছিল, তেমনই আচমকাই চলে গেলেন আবদুল কাদির।

যতদিন লেগস্পিন বোলিং ক্রিকেটে থাকবে, আবদুল কাদির নামের জাদুকর লেগস্পিনারকে ভুলতে পারবে না ক্রিকেটদুনিয়া।

Comments are closed.