ইনভার্টেড পিরামিডের পাশে লিওর বুটে থমকে রয়েছে ফুটবল, তিনি উড়ে চলেছেন ডানা মেলে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অর্পণ গুপ্ত 

    জোনাথান উইলসনের উল্টো পিরামিডের পাশে এত অসহায়ভাবে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে নিশ্চিতভাবে বড় কষ্ট পেতেন সাহেব।

    সে যেন কলমিশাকে ভরে ওঠা পুকুর ঘাটের পাশে একাকি দাঁড়িয়ে থাকা গাছ, আলগা হাওয়ায় ঝরে পড়ছে কাঁঠালপাতা। ফুটবল আর কোথায় লিখলেন তিনি? লিখলেন তো জীবন। ফুটবলের স্ট্র‍্যাটেজি পিরামিড উল্টে গেল, নটে গাছটি মুরোলো, আর লিও মেসি?

    ওই ৪-৫-১-এর চক্রব্যুহে গোবেচারা মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভিনগ্রহের বাসিন্দা, প্রতিটা ২৪ শে জুন এলে যে অন্যপাড়ার বন্ধুর সাথে আমি একসাথে বুড়ো হই…।

    ষাটের দশকের ব্রাজিল বা উরুগুয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে যখন নামত তখন ফর্মেশনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল ৩-২-৫। অর্থাৎ ব্যকরণগতভাবে ৫ জন আপফ্রন্ট। সত্তরের শুরুতে একটু পাল্টে সেটা হল ৪-২-৪। মাঝমাঠে মাত্র দুজন। অর্থাৎ দুই দল মিলিয়ে ৪ জন প্লেয়ার মাঝমাঠে। আশির একদম শুরুতে ৩-২-২-৩ এল।কেম্পেসের জমানায় একজন আপফ্রন্ট একটু নেমে এসে মাঝমাঠকে সাহায্যের জন্য আসত। এই অবধি ঠিক ছিল। এই মাঝমাঠে ভিড় বেড়ে যাবার বীজ বোনা হল ছিয়াশির মেক্সিকো বিশ্বকাপ থেকে, যদিও তখন বোঝা যায় নি৷ মারাদোনা জমানায় ভয়ংকর জনপ্রিয়তা পেয়ে গেল ৪-৩-৩ ফর্মেশন। তার আগে যদিও কমলা বিপ্লবের সময় রিনাস মিশেল ফলস নাইন থিওরি বের করে ফেলেছেন।

    ৪-৩-১-২ অর্থাৎ একজন বলপ্লেয়ার থাকবেন দুই স্ট্রাইকারের পিছনে, ফলস নাইন, ইনি গোল করাবেন আবার বল উইংয়ে সরলে ভিতরে এসে মেন স্ট্রাইকার হিসেবে ৩ জন হয়ে যেতে সাহায্য করবেন। এই সময়টা পর্যন্ত মাঝমাঠে ড্রিবলার আসত, সারাবিশ্বব্যাপী আসত। মারাদোনা,বাজ্জিওর মতো স্কিমাররা এলেন, বাংলার মাঠে কৃশানু-মজিদের মতো বল প্লেয়াররা ষাট পয়সা আর একটাকা দশ পয়সার গ্যালারিতে হিল্লোল তুললেন। এই নব্বই দশক পর্যন্ত মাঝমাঠে সর্বোচ্চ তিন জন খেলোয়াড় খেলানোর জায়গা ছিল। কিন্তু এরপর এই ৪-৩-১-২ জন্ম দিয়ে গেল ৪-৪-২ ফর্মেশনের অর্থাৎ ওই ফলস নাইন ও হয়ে গেলেন মিডফিল্ডার৷ ইতালির বিখ্যাত কাতানুচিয়ার হাত ধরে এই ৪-৪-২ হয়ে গেল ৪-৫-১!

    ব্যাস! বিশ্বফুটবলে মাঝমাঠে স্কিল প্লেয়ার আসার যায়গাটা পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে গেল। মাঝমাঠে দু দল মিলিয়ে মোট খেলোয়াড় সংখ্যা বেড়ে হল ১০। এল সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড পজিশন, কিছু ক্ষেত্রে দুজন সি ডি এম। ফলে পায়ের জঙ্গলে স্কিল প্লেয়াররা ক্রমশ হারিয়ে যেতে লাগলেন। স্কিল অবশিষ্ট রইল দুই উইং আর কিছুটা সেন্ট্রাল স্ট্রাইকারের পায়ে, কিন্তু সেটাও অনেক অনেক কম সময়ে, স্কিল পাল্টাল টার্নিং আর পজিশনিংয়ে।

    এই জায়গায় দাঁড়িয়ে যাঁরা ব্যতিক্রমী হলেন তাঁরাই ইতিহাসে লিখলেন নিজেদের নাম। নিজেদের বুটের ডগা দিয়েই। ৯৮-এর পর থেকে জিদান, রোনাল্ডিনহো, রোনাল্ডো নাজারিও এই ভিড়ের ভিতর থেকেই উঠে এলেন কিন্তু এই উঠে আসা স্কিমারের সংখ্যা হাতে গোনা। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো এলেন কিন্তু মাঝমাঠে স্কিমার হিসেবে নয়, উইংগার হিসেবে। হালফিলে নেইমার এলেন একইভাবে… তারপর?

    ট্রফি ক্যাবিনেটের হিসেব, ব্যক্তিগত সাফল্য, গোল, অ্যাসিস্ট আজকাল আর খুব একটা বিচলিত করে না, অন্তত মেসির ক্ষেত্রে না। ২৪ জুন কেউ লিখবেন মেসির ক্লাবস্তরে সাফল্য নিয়ে, কেউ লিখবেন আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যর্থতা নিয়ে- কিন্তু বিশ্বফুটবলের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভার পুরো কেরিয়ারটাই প্রায় স্বচক্ষে দেখার পর এখন মেসিকে অদ্ভুতভাবে এক পথভ্রষ্ট পাখির মতো লাগে। রুমাল পাতা জায়গায় টার্ণ নেবার পর মেসির সামনে জোনাল মার্কিংয়ের সাঁড়াশি এলে মনে হয় মারাদোনার একটা ৮৬’ ছিল, তিন গজের একটা লম্বা টাচ ছিল, উত্তাল গ্যালারি ছিল, মেক্সিকান ওয়েভের গর্জন কানে নিয়ে হলুদ পৃথিবীর মাঝখান দিয়ে আড়াআড়ি চিরে সাদা-নীল করে দেওয়ার রোম্যান্টিসিজম ছিল – সেই মহাকাব্যের পাতায় লিওনেল মেসি আসেন না। ফুটবলের জিনিয়াস পরিমাপ করার যদি কোনও মিটার থাকত তবে মেসি নামক ‘বস্তুটিকে’ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করার একটা বন্দোবস্ত থাকলেও কোনও ইতিহাস একথা লিখবে না যে মেসির সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়ত এই যে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মাঝমাঠে শ্বাসরোধী সাঁড়াশির পরেও বলপ্লেয়ার নামক বিরল থেকে বিরলতম ট্র‍্যাডিশনের ব্যাটন বয়ে চলা,একা। একদম একা।

    রোনাল্ডিনহোর চলে যাবার পর বার্সার স্বর্ণযুগের দুরন্ত পেন্টাগন থাকলেও মেসি একমাত্র নিরলস ভাবে খেলে গেছেন বলের দখলের স্প্যান নিয়ে, মাঠের একটা অর্ধের নানান পজিশনে বল দখলে রাখার আলাদা আলাদা সময়ের জন্য কখনও রাইট উইং, কখনো ফলস নাইন, কখনও সেন্ট্রাল মিড, কখনো বা ফ্রি-প্লেয়ার!

    ২০১৩ থেকে এই লড়াই আরও কঠিন হল। মেসির খেলার ধরন পাল্টালো। বলা ভালো নিজেই পাল্টালেন। ২০০৭ থেকে যে শৈল্পিক মেসিকে উঠে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাত ওয়েম্বলি থেকে বার্ণাবিউ,  সেই মেসিই খেলায় স্কিলের সাথে মেলালেন ঈশ্বরপ্রদত্ত অনুমানক্ষমতা। গোল করার চেয়ে বেশি হতে শুরু করল অ্যাসিস্ট।

    ২০১৫-র পর থেকে কার্যত ইউরোপীয় গতি আর আধুনিকতার সাথে লাতিন আমেরিকার শেষ ফুটবল ঘ্রাণ টিকিয়ে রাখার অসম লড়াই, সেই আর্জেন্টিনীয়দের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়া রোজারিওর ছেলেটাই লড়ে চলেছে, আজও…।

    নেইমার বুঝলেন না। সুয়ারেজ বুঝেও অসহায়। সফল লাতিন আমেরিকান ত্রয়ী বিশ্বফুটবলের ইতিহাসে আবার কবে একসাথে ক্লাব বা আন্তর্জাতিক স্তরে আসবেন জানা নেই। তবু, এত একা লিওকে দেখতে ভালো লাগে না আজকাল। জীবনানন্দ একা একা শিশিরের শব্দ শুনতেন, লিও কান পাতলে হয়ত বহুযুগের ওপার থেকে কিছু শুনতে পান। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বলপ্লেয়ারের জন্মই হল বলপ্লেয়িংয়ের ক্ষয়িষ্ণু অধ্যায়ে।

    তবু তো এতগুলো দিন ইনভার্টেড পিরামিডের পাশে একটু যেন থমকে রইল ফুটবল। তবু তো জোনাথান উইলসনের বিখ্যাত বইটার শেষ পাতা পড়তে পড়তে হাসবেন কেউ-
    ” What remains is not one hegemonic style,but a multiplicity of approaches in part conditioned by Guardiola’s Barca…”

    ফুটবলের ইতিহাসের শেষ অধ্যায় থেকে আবার শুরু হবে নতুন কোনো অধ্যায়। ইউরোপীয় গতির পাল্টায় আবার হয়ত অনেক বছর পর উঠে আসবে শৈল্পিক লাতিন আমেরিকা। তবে সে ভবিষ্যতের প্যানোরামায় লিও মেসি থাকবেন না। ইতিহাসে থাকবেন।

    ফুটবলের রেনেসাঁসের স্টেডিয়ামে শেষ যোদ্ধা হিসেবে কেউ ছুটছেন, আর রয় হাডসন পাগলের মতো চিতকার করছেন-
    ” Oh Messi, Messi, Footballing’s bird of paradise is fluffing his feathers beautifully…”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More