‘সোশ্যাল বাবল’ মডেলে কমছে কোভিড সংক্রমণের হার, ঘুচছে মানসিক অবসাদ, গবেষণায় দাবি অক্সফোর্ডের

সামাজিক স্তরে মেলামেশা করা যাবে কিন্তু স্বল্প পরিসরে। একটা ছোট গণ্ডিতে যেখানে চেনা পরিচিত মানুষজনই থাকবে কম সংখ্যায়। ছোট ছোট দলে মেলামেশা তবে নিয়ম মেনেই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনাভাইরাসকে নির্মূল করতে পারবে এমন ভ্যাকসিন বা ওষুধ এখনও বাজারে আসেনি। এরপরেও ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে হলে কার্যকরী ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি হল ‘সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং’ বা সামাজিক দূরত্ব। সহজে বলতে গেলে সামনাসামনি হলেও একে অপরের ছোঁয়া বা সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা অর্থাৎ পারস্পরিক দূরত্ব। এই ছোঁয়াচ বিধিকে রীতিমতো নিয়ম করে সার্বিক পর্যায়ে নিয়ে যেতেই লকডাউনের এত কড়াকড়ি। তবে যে সমস্যাটা মাথাচাড়া দিয়েছে, সেটা হল সামাজিক দূরত্বের এত নিয়মেও সংক্রমণকে কি খুব একটা ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে? মানুষ তো আসলে সামাজিক জীব, নিয়ম ভেঙে অনিয়ম চলছেই, কাজেই সংক্রমণও ছড়াচ্ছে পাল্লা দিয়ে। তাছাড়া পারস্পরিক মেলামেশায় সীমারেখা টেনে দেওয়ার ফলে মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মুখে। গবেষক, সমাজবিজ্ঞানীরা ঠিক করলেন এমন প্রক্রিয়া যদি চালু করা যায় যেখানে মেলামেশা করাও যাবে আবার সংক্রমণও বড় গণ্ডিতে ছড়াবে না, তাহলে লাভ অনেকদিকে। লকডাউন উঠে যাওয়ার পরেও একটা শৃঙ্খল বজায় থাকবে।

    এই ধারণা থেকেই একটা নতুন মডেল চালু হয়েছে বিশ্বের অনেক দেশেই। সমাজবিজ্ঞানীরা যাকে বলছেন ‘সোশ্যাল বাবলস’ (Social Bubbles) । অর্থাৎ সামাজিক স্তরে মেলামেশা করা যাবে কিন্তু স্বল্প পরিসরে। একটা ছোট গণ্ডিতে যেখানে চেনা পরিচিত মানুষজনই থাকবে কম সংখ্যায়। ছোট ছোট দলে মেলামেশা তবে নিয়ম মেনেই। এক একটি দলে কতজন মানুষ থাকতে পারে তার সংখ্যাও বেঁধে দিয়েছে সে দেশের সরকার। এই সোশ্যাল বাবলস-এর প্রক্রিয়ায় নাকি গোষ্ঠীস্তরে সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব এবং তাতে কাজও হয়েছে। সম্প্রতি এমনটাই দাবি করেছে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণা। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এই পদ্ধতিতে মানুষ তার গৃহবন্দী হাঁসফাঁস অবস্থা থেকেও কিছুটা মুক্তি পেয়েছে এবং নির্দিষ্ট পরিসরে মেলামেশার ফলে সংক্রমণ ছড়াবার হারও কমেছে। ‘নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার’ জার্নালে এই গবেষণার রিপোর্ট সামনে এসেছে।

     

    সোশ্যাল বাবল ঠিক কী রকম?

    স্বল্প পরিসরে মেলামেশার একটা নিয়ম আছে। যেমন কেউ ঠিক করতে পারেন তিনি সপ্তাহে একদিন পাঁচ জনের সঙ্গে দেখা করবেন। যদিও কতজনের সঙ্গে মেলামেশা করা যাবে সেটা সে দেশের সরকারি নির্দেশিকায় বলা থাকবে। যাই হোক, এই পাঁচজন হতে হবে নিজের চেনা পরিচিত জনের মধ্যেই। আত্মীয়, বন্ধু বা খুব কাছের চেনা কোনও মানুষ। এই গণ্ডির মধ্যেই তাঁকে মেলামেশা করতে হবে।

    অক্সফোর্ডের সোশিওলজি বিভাগের গবেষক পার ব্লক বলছেন, এই সোশ্যাল বাবল হল এমন একটা মডেল যার মাধ্যমে হোম-আইসোলেশনে থাকা মানুষজনের মানসিক স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হয়, একাকীত্ব ও অবসাদ কাটে এবং একই সঙ্গে সংক্রমণও ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয়। ব্রিটেনে এই পদ্ধতিতে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে। তবে এই সোশ্যাল বাবলকে প্রয়োজনে বড় করাও যায়। অনেক দেশ তেমন পথেই হাঁটছে। পাঁচজনের জায়গায় একটা দলে থাকতে পারেন দশ জন। সংক্রমণ যদি ছড়ায় তাহলে দশজনের মধ্যেই থাকবে, গোষ্ঠীস্তরে ছড়াতে পারবে না।

    বেলজিয়ামে প্রথম চালু হয় সোশ্যাল বাবল,জার্মানি, নিউজিল্যান্ডে জনপ্রিয় হচ্ছে এই মডেল

    বেলজিয়ামে সেই এপ্রিলেই সোশ্যাল বাবল চালু হয়েছিল কোনও কোনও জায়গায়। যদিও বেলজিয়াম সরকারের লকডাউনের গাইডলাইনে এই মডেলের উল্লেখ ছিল না। সেখানকার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, আত্মীয়, বন্ধুদের মধ্যেই ১০ জনের ছোট ছোট দল ভাগ করে মেলামেশা করা যাবে। একটি দলের সদস্যেরা অন্য দলের সঙ্গে মিশতে পারবেন না। তাই শুরুতেই ঠিক করে নিতে হবে তালিকা। পরিচিত গণ্ডির বাইরে মেলামেশা করা যাবে না। সম্প্রতি বেলজিয়ামে আরও একটা নিয়ম চালু হয়েছে। এক পরিবার যে কোনও চারজনকে নিমন্ত্রণ করতে পারে বাড়িতে। এইভাবে যে গ্রুপ তৈরি হবে তার মধ্যেই চলবে মেলামেশা।

    নিউজিল্যান্ডে ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সোশ্যাল বাবলের প্রক্রিয়া। প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেন বহুদিন আগেই এই প্রক্রিয়া চালুর নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে শুরুতে পাঁচদনের দল ঠিক হয়েছিল। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দশে পৌঁছেছে। আত্মীয়-পরিজন ছাড়াও প্রতিবেশীর বাড়িতেও যাওয়া যাবে তবে নিয়ম মেনে। সেক্ষেত্রেও একটা সংখ্যা বেঁধে দেওয়া আছে। যে কোনও দুটি পরিবারের মধ্যে মেলামেশা হবে, তার বাইরে নয়। তবে লকডাউন বিধি পুরোপুরি শিথিল হওয়ার পরে ১০০ জনের দলেও মেলামেশার ছাড়পত্র দেবে নিউজিল্যান্ড। তবে সেক্ষেত্রেও কিছু নিয়ম বেঁধে দেবেন সমাজবিজ্ঞানীরা। লকডাউনের পরে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এই প্রক্রিয়া কাজে দেবে বলেই আশা করা হচ্ছে।

    সোশ্যাল বাবল বনাম সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং

    জার্মানিতে যে কোনও দুই পরিবারের মধ্যে মেলামেশার অনুমতি আছে। অথবা একই এলাকায় দুটি বাড়ির মধ্যে মেলামেশা করার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

    ব্রিটেনে সোশ্যাল বাবলের ধারণা একটু পরে এলেও বর্তমানে সেই মডেলকে কার্যকরী করা হয়েছে সার্বিক স্তরে। ইংল্যান্ডের চিফ মেডিক্যাল অফিসার ক্রিস হুইট্টি বলেছেন, এই প্রক্রিয়া বিজ্ঞানসম্মত যার কারণে সংক্রমণের হারও কমেছে এবং মানুষের অবসাদ কাটছে ধীরে ধীরে। স্বল্প পরিসরের এই গণ্ডি ধীরে ধীরে বড় করা হবে। হুইট্টির কথায় সোশ্যাল বাবল চালু হওয়ার পরে এফেক্টিভ রিপ্রোডাকশন রেট (RT) কমেছে। ভাইরাসের সংক্রমণ কতজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে তারই পরিমাপ হল রিপ্রোডাকশন রেট বা আরটি। লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিকাল মেডিসিন (LSHTM) এর সমীক্ষা বলছে, সোশ্যাল বাবল চালু হওয়ার পর থেকে লন্ডনের আরটি ১। সংক্রমণ ছড়ালেও সেটা একটা গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকছে। একজনের থেকে সংক্রামিত হচ্ছেন একজনই। একজনের থেকে দশজনের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে। কারণ মেলামেশা সীমিত পরিসরের মধ্যেই রয়েছে। লন্ডন স্কুল অব হাইজিনের অধ্যাপক স্টিফেন ফ্ল্যাকের মতে, এই সোশ্যাল বাবল মডেল অনেক নিরাপদ। আগামীদিনে এই মডেল মেনেই ধীরে ধীরে মানুষের মেলামেশার পরিসর বাড়ানো হবে। তবে পরিকল্পিত পদ্ধতিতে এবং নির্দিষ্ট গাইডলাইন মেনেই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More