ব্যাঙের কোষ থেকে তৈরি মাংসল জীব, মানব শরীরে ঢুকে রোগ সারাবে, রুখবে প্লাস্টিক দূষণ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: জীবন্ত রোবট। চলেফিরে বেড়ায়। নিজেই নিজের রোগ সারায়। যান্ত্রিক দেহ নয়, মাংসল, পিচ্ছিল শরীর। চোখ-কান-নাক-মুখ-হৃদপিণ্ড-ফুসফুস কিছুই নেই। তবুও প্রাণ আছে। মার্কিন বিজ্ঞানীদের তৈরি এই আজব জীব নাড়িয়ে দিল গোটা বিশ্বের বিজ্ঞানী মহলকে। সত্যিই রোবট কি? তা তো নয়। কিন্তু চালনা করছে মানুষই। ব্যাঙের স্টেম সেল (Stem Cell) থেকে তৈরি আজব এই জীবের নাম ‘জ়েনোবট’ (Xenobot)। ইন্দ্রিয়হীন এই প্রাণ কাজ করবে মানুষেরই জন্য।  রোগ সারাবে, দূষণ রুখবে, তেজস্ত্রিয় বর্জ্য নির্মূল করবে, বড় অস্ত্র হবে প্রতিরক্ষায়।

বার্লিংটনের ইউনির্ভাসিটি অব ভারমন্ট ও টাফ্ট ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা তৈরি করছেন এই জীবন্ত কোষ জ়েনোবট। আকারে ০.৪ ইঞ্চি। ছোট মাংসল চেহারা। মানুষের শরীরে রক্তের মাধ্যমে অনায়াসে বাহিত হতে পারে। এই জীব হাঁটতে পারে, সাঁতার কাটতে পারে, খাবার না খেয়েও  কাটিয়ে দিতে পারে সপ্তাহের পর সপ্তাহ। একসঙ্গে অনেকগুলো জ়েনোবট একত্রিত হয়ে জোট তৈরি করতে পারে ঠিক শ্বেত রক্তকণিকার মতো। শরীরে ঘাপটি মেরে থাকা রোগ-জীবাণুর প্রতিরোধ করতে পারে সম্মিলিতভাবে। শুধু রোগ প্রতিরোধ নয়, জ়েনোবটের ব্যবহার হবে আরও নানাকাজে। পরিবেশ রক্ষার বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে এই ছোট্ট জীব, এমনটাই দাবি বিজ্ঞানীদের।

‘প্রসিডিংস অব ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’ বিজ্ঞান পত্রিকায় এই আবিষ্কারের কথা প্রথম লেখেন ইউনিভার্সিটি অব ভারমন্টের বিজ্ঞানীরা। ইউভিএমের কম্পিউটার সায়েন্টিস্ট এবং রোবোটিক্স এক্সপার্ট জসুয়া বোনগার্ডের কথায়, ‘‘জ়েনোবট তথাকথিত রোবট নয়। এটি জীব। তবে নির্দিষ্ট কোনও প্রজাতিও নয়। এমন জীব যা আগে কখনও কেউ দেখেনি। মানুষের হাতে বানানো এই প্রাণ মানব কল্যাণেই ব্যবহার করা হবে। এই আবিষ্কার বিশ্বের বিস্ময়।’’


রোবট না জীব—জ়েনোবট আসলে কী?

বোন ম্যারোতে থাকা অপরিণত কোষকে বলা হয় স্টেম সেল। শরীরের আদি কোষ একেই বলে। এই স্টেম সেল আলাদা আলাদা ভাবে রক্তে লোহিতকণিকা, শ্বেতকণিকা ও অনুচক্রিকা তৈরি করতে পারে। যে প্রক্রিয়াকে বলে হেমোটোপিসিস। স্টেম সেল অবিকল নিজের মতো নতুন কোষ তৈরি করতে পারে।

মৃত কোষের মেরামতি, নতুন কোষ প্রতিস্থাপন, শরীরের কোনও অঙ্গ কাজে ইস্তফা দিলে স্টেম সেল থেরাপির মাধ্যমে তার চিকিৎসা সম্ভব। জ়েনোবট তৈরি করতে স্টেম সেলকেই বেছে নেন বিজ্ঞানীরা। তাই জ়েনোবটকে ঠিক রোবট বলা যায় না, আবার নির্দিষ্ট প্রজাতির জীবও বলা যায় না। ইউনির্ভাসিটি অব ভারমন্টের রোবোটিক্স বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী জোসুয়ার কথায়, জ়েনোবট হল ‘জীবন্ত মেশিন।’ নতুন ধরনের ‘আর্টিফ্যাক্ট’ যার প্রাণ আছে এবং যাকে প্রোগ্রাম করা সম্ভব। মোদ্দা কথা জ়েনোবট হল গোলাপি রঙা মাংসল ‘প্রোগ্রামেবল অর্গানিজম (Programmable Organism)।’


মিলে গেল জীববিজ্ঞান আর রোবোটিক্স–ব্যাঙের স্টেম সেলের ভোল বদলে দিল সুপারকম্পিউটার

আফ্রিকান প্রজাতির Xenopus laevis ব্যাঙের স্টেম সেল দিয়েই জ়েনোবট বানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। দক্ষিণ আফ্রিকায় এই ব্যাঙের দেখা মেলে বেশি। এই ব্যাঙের ত্বক ও হৃদপেশী থেকে স্টেম সেল সংগ্রহ করেন বিজ্ঞানীরা। টাফ্ট ইউনিভার্সিটির গবেষক লেভিন এবং মাইক্রোসার্জন ডগলাস ব্ল্যাকিসটন বলেছেন, এই স্টেম সেলগুলো সংগ্রহ করে তাদের আলাদা করা হয়। তারপর ইনকিউবেটরে রাখা হয় কোষগুলোকে। সূক্ষ্ম ফরসেপ এবং ইলেকট্রোড দিয়ে কোষগুলোকে কেটে আলাদা করে ফের তাদের জোড়া লাগানো হয় নির্দিষ্ট আকার দেওয়ার জন্য। নতুন জীবের ডিজাইন করে সুপারকম্পিউটার (Supercomputer)। এমনভাবে আকার দেওয়া হয়েছে এই জীবন্ত কোষকে যাতে সেটি সহজেই মানব শরীরে ঢোকানো যায় বা সূক্ষ্ম কাজের জন্য ব্যবহার করা যায়। বিজ্ঞানী জোসুয়া বলেছেন, ত্বকের স্টেম সেল এর গঠনকে নমনীয় করেছে। হার্টের স্টেম সেল থাকার জন্য এর মধ্যে প্রাণের স্পন্দন আছে এবং এটি সহজেই চলাফেরা করতে পারে।

সুপার কম্পিউটারে ডিজাইন করা হয় জ়েনোবটের গঠন

আরও পড়ুন: ‘বন্ধু’ ব্যাকটেরিয়া চোঁ চোঁ করে টানছে কার্বন-ডাই অক্সাইড, গপাগপ খাচ্ছে দূষিত গ্যাস, উল্লাস বিজ্ঞানীদের

রোগ প্রতিরোধে বড় অস্ত্র হবে জ়েনোবট, রুখবে প্লাস্টিক দূষণ, বদল আনবে প্রতিরক্ষায়

জীববিজ্ঞানীরা বলছেন, পরীক্ষা করে দেখা গেছে মানুষের শরীরের জন্য একেবারেই নিরাপদ জ়েনোবট। সেল বায়োলজির (Cell Biology) গবেষণায় আগামী দিনে এর বিশাল প্রয়োগ হতে চলেছে। গবেষক জোসুয়া বলেছেন, সব জ়েনোবটের গঠন সমান নয়। বিভিন্ন কাজের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে একে। জীববিজ্ঞানের গবেষণার জন্য নির্দিষ্ট জ়েনোবটের মাঝে থাকবে একটি গর্ত। তার মধ্যে ওষুধ বা ক্যামেরা ফিট করে মানব শরীরের ভেতরে ঢোকানো যাবে। শিরা-ধমনীর মধ্যে প্রবেশ করানো যাবে জ়েনোবটকে। ক্ষতিগ্রস্থ কোষকে সামনে থেকে আক্রমণ করবে জ়েনোবট। চ্যালেঞ্জ ছুড়বে ক্যানসার বা টিউমার কোষগুলিকে। সম্মিলিতভাবে জোট বেঁধে নিশানা করবে জীবাণুকে। সুপারকম্পিউটারে প্রোগ্রাম করেই জ়েনোবটকে পাঠানো হবে মানুষের শরীরে। নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও ফ্যাট সে নিয়ে যাবে বাইরে থেকেই। কয়েক সপ্তাহ মানুষের শরীরে বেঁচে থাকতে পারবে এই জীবন্ত রোবট। কাজ শেষ করে বিজয় গর্বে ফিরে আসবে বাইরে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জিনগত ব্যধি, ট্রমাটিক ইনজুরি, কোনও অঙ্গের ক্ষত মেরামত-অঙ্গ প্রতিস্থাপন, এমনকি অ্যান্টি-এজিং-এর গবেষণাতেও কাজে লাগানো হবে জ়েনোবটকে।

পরিবেশ দূষণ রুখতেও কাজে লাগানো হবে এই জীবন্ত রোবটকে। বিশেষত সমুদ্রে প্লাস্টিক ও  প্লাস্টিকজাত উপাদান সংগ্রহ করবে জ়েনোবট। সমুদ্রের লবণাক্ত জলে বেঁচে থাকার মতো করেই তৈরি করা হয়েছে এটিকে।

তেজস্ক্রিয় বিকিরণের কারণে জন্ম নেওয়া রোগ-ব্যধি বা সংক্রমণ রুখতেও জ়েনোবটকে ব্যবহার করবেন বিজ্ঞানীরা। ওষুধ বা জটিল অস্ত্রোপচারেও যে রোগ বা সংক্রমণ বশ মানে না, তাকেই কাবু করবে জ়েনোবট।

ইউভিএমের রোবোটিক্স বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ়েনোবট তৈরিতে বিশাল অনুদান দিয়েছে ‘ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজোক্টস এজেন্সি।’ প্রতিরক্ষায় বড় অস্ত্র হতে পারে জ়েনোবট। শত্রু মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে সেনাবাহিনীকে। হাইব্রিড রোবট-অর্গানিজমের গঠনে বদল এনে তাকে দু্র্গম স্থানে নজরদারির কাজে পাঠানো যেতে পারে। শত্রুপক্ষকে কুপোকাৎ করতে এর প্রয়োগ আর বৃহত্তর অর্থে হতে পারে বলেই জানিয়েছেন রোবোটিক্স বিশেষজ্ঞরা। তবে গোপন সেই প্রযুক্তি নিয়ে এখনই মুখ খোলেননি বিজ্ঞানীরা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More