চাঁদের পর সূর্য, ২০২০ জুড়ে একের পর এক মহাকাশ পাড়ি ইসরোর

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: চাঁদ-মুলুকে পাড়ি দিয়েছে ভারত। মঙ্গলের পাড়ায় দিয়েছে উঁকি। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর রহস্যসময় অভিযানের শেষ কিন্তু হয়নি। ২০২০ সালে আরও বড় এবং চমকে দেওয়ার মতো একগুচ্ছ অভিযানের পরিকল্পনা রয়েছে ইসরোর। চাঁদ-মঙ্গলের পর ইসরোর সবচেয়ে বড় লক্ষ্য আদিত্য-অভিযান। আগামী বছরই সূর্যের দেশে পাড়ি দেবে ভারত। কড়া নাড়বে চাঁদের দরজাতেও। মানুষ নিয়ে মহাকাশে চক্কর কাটার প্রস্তুতি নেবে ইসরোর গগনযান। হই হই করে কাজ শুরু হবে দেশীয় স্পেশ স্টেশনেরও।

ইসরোর চেয়ারম্যান কে শিবন জানিয়েছেন, ২০২০ সাল ভারতের মহাকাশবিজ্ঞানের ইতিহাসে নতুন নজির গড়বে। আগামী দিনে আরও বড় মহাকাশযাত্রার ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে ২০২০ থেকেই। পাশাপাশি, দেশের প্রতিরক্ষায় ডিফেন্স রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ডিআরডিও)সঙ্গে যৌথভাবে উন্নত প্রযুক্তির নজরদারি স্যাটেলাইট লঞ্চ করার কথাও আছে ইসরোর। সব মিলিয়ে আগামী বছরে ইসরোর মিশন বেশ টানটান।

ইসরো ২০২০—এক নজরে

সূর্যের দেশে পাড়ি

ইসরোর ‘সোলার মিশন’ নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। কারণ নাসা আর ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ইএসএ বা ‘এসা’) পর ভারতই প্রথম পাড়ি দিচ্ছি সৌর-মুলুকে। এই অভিযান সফল হলে, মহাকাশবিজ্ঞানের ইতিহাসে পাকাপাকি ভাবে সেরার শিরোপাটা ছিনিয়ে নেবে ভারত। ইসরোর চেয়ারম্যান কে শিবন বলেছেন, ‘‘পৃথিবী থেকে ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরে সূর্য ও পৃথিবীর মাঝের এক কক্ষপথ ‘ল্যাগরাঞ্জিয়ান পয়েন্ট’ বা ‘ল্যাগরেঞ্জ পয়েন্ট’-এ ল্যান্ড করবে স্যাটেলাইট আদিত্য এল-১। সূর্যের বাইরের সবচেয়ে উত্তপ্ত স্তর করোনার যাবতীয় তথ্য সে তুলে দেবে আমাদের হাতে। এই সোলার-মিশন তাই সবদিক দিয়েই খুব গুরুত্বপূর্ণ।’’ ২০২০ সালেই ঐতিহাসিক আদিত্য-অভিযানের নজির গড়বে ভারত।

জ্বালানি-সহ প্রায় ১৫০০ কিলোগ্রাম ওজনের এই উপগ্রহ সাতটা সায়েন্স পে-লোড নিয়ে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষ ৮০০ কিলোমিটার থেকে হলো অরবিট ল্যাগরেঞ্জ পয়েন্টের দিকে যাত্রা করবে। পৃথিবী ও সূর্যের মাঝের একটি অরবিট বা কক্ষপথ হলো এই ল্যাগরেঞ্জ পয়েন্ট। পৃথিবী থেকে যার দূরত্ব ১৫ লক্ষ কিলোমিটার। এই পথটাই পাড়ি দেবে ইসরোর সর্বাধুনিক উপগ্রহ আদিত্য এল-১। আদিত্য এল-১ কে তাই সে ভাবেই বানানো হচ্ছে যাতে কক্ষপথের বিপুল চাপ সহ্য করে অন্তত এক বছর ধরে ছবি ও যাবতীয় তথ্য সে অবিরাম পাঠিয়ে যেতে পারে।


চন্দ্রযান ৩

চন্দ্রযান ২ অভিযান ব্যর্থ হয়নি, আগেই জানিয়েছিল ইসরো। ল্যান্ডার বিক্রমের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হলেও, চাঁদের কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে নিজের কাজ করে যাচ্ছে চন্দ্রযানের অরবিটার। রহস্যময় দক্ষিণ মেরুর ছবিও পাঠিয়েছে অরবিটার, তার হাই রেজোলিউশন ক্যামেরায় ধরা পড়েছে একাধিক অজানা ক্রেটার। আগামী বছর ফের চাঁদে পাড়ি জমানোর পথে ভারত। চন্দ্রযান ৩ মিশন নিয়ে হইচই চলছে ইসরোর অন্দরে। ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে বিজ্ঞানীদের টিম। তিরুঅনন্তপুরমের বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টারের ডিরেক্টর এস সোমনাথের তত্ত্বাবধানে চন্দ্রযান-৩ কাজ চলবে। ইসরো জানিয়েছে, চন্দ্রযান ২-এর ভুলত্রুটি সংশোধন করা হচ্ছে। তৈরি হয়েছে নতুন গাইডলাইন।


উৎক্ষেপণ হবে নতুন ১০টি স্যাটেলাইটের

ইসরো চেয়ারম্যান কে শিবন জানিয়েছেন, আগামী বছর ১০টা নতুন স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণে করতে চলেছে ইসরো। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট জিস্যাট ১ ও জিস্যাট-১২আর ছাড়াও নজরদারি কৃত্রিম উপগ্রহ রিস্যাট-২বিআর২ ও মাইক্রোস্যাট। উনিশে পৃথিবীর কক্ষে বসেছে ইসরোর ‘গোয়েন্দা উপগ্রহ’ রিস্যাট-২বিআর১ উপগ্রহ। রিস্যাট পর্যায়ের পরবর্তী উপগ্রহগুলোও নজরদারির কাজ চালাবে সীমান্তে। এক্স-ব্যান্ডের সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার (SAR) যা দিন ও রাতে নির্ভুল ছবি তুলতে সক্ষম। মেঘ ফুঁড়ে ভূমির যে কোনও ছবি, শত্রু শিবিরের অবস্থান, সন্ত্রাসবাদীদের গোপন গতিবিধি, তাদের যোগাযোগের মাধ্যম সবকিছুরই তুরন্ত ছবি তুলে পাঠাতে পারবে এই উপগ্রহ। শুধু শত্রদের গতিবিধি নয়, এর সিন্থেটিক অ্যাপারচার সেন্সর আবহাওয়ার তথ্যও দেবে সঠিক ভাবে।


মহাকাশে চষে বেড়াবে গগনযান

বায়ুসেনার অফিসার রাকেশ শর্মা মহাকাশে পাড়ি দিয়েছিলেন রুশ মহাকাশয়ান ‘সয়ুজ টি-১১’-এ চেপে। গগনযান হল প্রথম দেশি মহাকাশযান, যা মানুষ পিঠে নিয়ে মহাশূন্যে ঘুরে বেড়াবে। ভারতের এই ‘Manned Space Mission’এর পরিকল্পনা  ২০২১-২২ সালের। তবে আগামী বছরের শেষ থেকেই গগনযানের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যাবে। ইসরো চেয়ারম্যান শিবন জানিয়েছেন, মহাকাশে গগনযানের ভিতর মোটামুটি সাত দিন থাকবেন নভশ্চররা। এই সময়ের মধ্যে তাঁদের কাজ হবে মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা মাধ্যাকর্ষণ-শূন্য দশা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো। গগনযানের বিশেষ ক্যামেরায় ধরা পড়বে পৃথিবীর কক্ষপথের হাল-হকিকত। গগনযানের ভিতরেও ওজন-শূন্য অবস্থায় থাকবেন মহাকাশচারীরা। সেই সময় তাঁদের অভিজ্ঞতা কেমন, বেঁচে থাকার জন্য তাঁদের কেমন রসদই বা দরকার তার খুঁটিনাটি জানতে পারবে ইসরো।

ইন্ডিয়ান স্পেস স্টেশন

আগামী বছর ডিসেম্বরে থেকেই স্পেস স্টেশন বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। পৃথিবীর সর্বনিম্ন কক্ষপথে একটা আস্ত বাড়ি বানানো তো মুখের কথা নয়! পৃথিবী থেকে পাড়ি দেওয়া মহাকাশচারীদের থাকার ঘর করতে হবে। আলট্রাভায়োলেট রশ্মি বা যে কোনও মহাজাগতিক রশ্মির বিকিরণ থেকে স্পেস স্টেশনকে রক্ষা করার মতো পরিকাঠামো থাকতে হবে। স্টেশনের ভেতরে ও বাইরে তাপমাত্রার একটা ভারসাম্য থাকবে। সব মিলিয়ে কাজটা খুবই কঠিন। ইসরোর চেয়ারম্যান কে শিবন জানিয়েছেন, প্রাথমিক ভাবে মালমশলা নিয়ে পৃথিবীর কক্ষপথে জড়ো করার চেষ্টা হবে। মহাকাশবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে  Space Docking Experiment (Spadex)। এই স্প্যাডেক্সের কাজ করবে দুটি স্যাটেলাইট।

ইসরোর ইলাস্ট্রেশন

পিএসএলভি রকেটে চাপিয়ে দুটি উপগ্রহকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের বাইরে। পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতেই স্পেস স্টেশন বানানোর জায়গা বের করে ফেলবে তারা। এর পর শুরু হবে বাড়ি বানানোর প্রক্রিয়া Docking Technology। শিবন জানিয়েছেন, এর জন্য দুটি স্যাটেলাইটের গতি নির্দিষ্ট মাত্রায় রাখতে হবে। না হলে তারা নিজেদের মধ্যেই ধাক্কাধাক্কি করবে। মহাশূন্যে সবকিছুই ভর-শূন্য দশায় থাকে। অর্থাৎ মাইক্রোগ্র্যাভিটি (মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব যেখানে নেই) কাজ করে। কাজেই সব দিক ভেবেচিন্তে, বিচারবিবেচনা করেই নকশা বানাতে হবে স্যাটেলাইট দুটিকে।

২০২০ থেকেই শুরু হবে প্রস্তুতি, ২২শে মঙ্গলযাত্রা ভারতের

উঁচু-নিচু গিরিখাত, প্রলয়ঙ্কর আগ্নেয়গিরি, মেঘে ঢাকা পাহাড়, তারই উপত্যকায় সুবিশাল হ্রদ— রহস্যময় লাল গ্রহের পর্দা একে একে খুলেছে ইসরোর মঙ্গলযান। রাশিয়ার ROSCOSMOS, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাসা (NASA) এবং ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সির (ESA) মতো মঙ্গলযাত্রার ইতিহাসে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে ইসরোর Mars Orbiter Mission (MOM)। ২০১৩ সালের সেই ঐতিহাসিক যাত্রার পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। পরবর্তী মঙ্গল-অভিযানের জন্য তৈরি হচ্ছে ভারত। দ্বিতীয় মঙ্গলযাত্রা হবে ২০২২-২৩ সালেই। লাল গ্রহের রহস্যের খোঁজে ফের ছুটে যাবে ইসরোর Mars Orbiter Mission 2 বা MOM 2

মঙ্গলের মাটির গঠন, চরিত্র, আবহাওয়ার প্রকৃতি, বাতাসে মিথেন গ্যাসের অস্তিত্ব, বাযুমণ্ডলে অ-তরিদাহত কণার গবেষণা চালাবে মঙ্গলযান। ‘মম’ দেখাবে, মঙ্গলে দিন-রাত আছে, ঋতু পরিবর্তন আছে, আছে উত্তর ও দক্ষিণ মেরু, খুব উঁচু পাহাড় আছে, বিরাট আগ্নেয়গিরি আছে, বিশাল নদীখাতও আছে, যা একদা সেখানে জল থাকার প্রমাণ দেয়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More