করোনাকে ধোকা! ঝুটো কোষ ‘ন্যানোস্পঞ্জ’ ঢুকবে শরীরে, তার সঙ্গে জড়াজড়ি করেই মরবে ভাইরাস, টক্কর দিতে তৈরি বিজ্ঞানীরা

মানুষের কোষের নকল করতে পারে এমন ন্যানোপার্টিকলে তৈরি কোষের নাম ‘ন্যানোস্পঞ্জ’ । যদিও সংক্রামক রোগ ঠেকাতে এই ন্যানোস্পঞ্জ নিয়ে গবেষণা অনেকদিনের। এবার করোনা রুখতে নতুন করেই প্রযুক্তিতে কিছু বদল এনে ভাইরাস প্রতিরোধী করে তৈরি করা হয়েছে এই ন্যানোস্পঞ্জকে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনা তো জিন চুরি করে নিচ্ছে, তাহলে রোখার উপায় কি!

কোষে ঢুকে বহাল তবিয়তে বসে মানুষের জিনের গোপন খবর হাতিয়ে নিয়ে নিজেদের সঙ্গে জুড়ে ফেলে নতুন হাইব্রিড জিন বানিয়ে ফেলছে। এই জিন-চোরদের ধোকা দিতে এবার ঝুটো কোষ বানিয়ে ফেললেন বিজ্ঞানীরা। অবিকল মানুষের কোষের মতো। হাবভাবে এক। আকার-গঠন একটু আলাদা হলেও চরিত্র অনেকটা একই রকম। তারা আবার মানুষের কোষের নকল করতে পারে। ভুলিয়ে ভালিয়ে ভাইরাসকে টেনে এনে নিজেদের সঙ্গে জুড়ে নিতে পারে। কৌশলী করোনা সেই ফাঁদে পা দিলেই শেষ। একবার যদি নকল কোষের সঙ্গে আটকে যায়, তাহলেই প্রোটিন সমেত তার ভবলীলা সাঙ্গ করে দেবে এই কোষ। ন্যানোটেকনোলজির সাহায্যে এমনই কৃত্রিম কোষ বানিয়ে ফেলেছেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান দিয়েগো এবং বস্টন ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা।

বস্টন ইউনিভার্সিটির ল্যাবে ন্যানোস্পঞ্জ নিয়ে কাজ করছেন গবেষক আন্না হোনকো

মানুষের কোষের নকল করতে পারে এমন ন্যানোপার্টিকলে তৈরি কোষের নাম ‘ন্যানোস্পঞ্জ’ । যদিও সংক্রামক রোগ ঠেকাতে এই ন্যানোস্পঞ্জ নিয়ে গবেষণা অনেকদিনের। এবার করোনা রুখতে নতুন করেই প্রযুক্তিতে কিছু বদল এনে ভাইরাস প্রতিরোধী করে তৈরি করা হয়েছে এই ন্যানোস্পঞ্জকে। এই গবেষণার দায়িত্বে রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব সান দিয়েগোর লিয়াংফাং ঝ্যাং-এর রিসার্চ টিম। বস্টন ইউনিভার্সিটিতে এই ন্যানোস্পঞ্জের ক্লিনিকাল ট্রায়াল হয়েছে। এই ট্রায়ালের রিপোর্ট এবং ন্যানোস্পঞ্জের গবেষণার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে ‘ন্যানোলেটার’ সায়েন্স জার্নালে।

আরও পড়ুন: মানুষের জিন চুরি করছে করোনা! নিজেদের সঙ্গে জুড়ে বানাচ্ছে ‘হাইব্রিড’, ভয়ানক কাণ্ড ধরে ফেললেন বিজ্ঞানীরা


ফুসফুসের কোষ দিয়ে তৈরি ন্যানোস্পঞ্জ, দেখতে ছোট কিন্তু বুদ্ধিতে তুখোড়

ন্যানোস্পঞ্জ বানানো হয়েছে দু’ভাবে। এই কোষের বেস হচ্ছে পলিমারিক ন্যানোপার্টিকল। অর্থাৎ পলিমারের কোর। তাকে ঘিরে কোষ পর্দা। মানুষের কোষের মতো গঠন দিতে ফুসফুসের এপিথেলিয়াল কোষ (Epithelial Type II Cells) মুড়ে দেওয়া হয়েছে পলিমারের উপরে। এটা গেল এক ধরনের ন্যানোস্পঞ্জ। ভাইরাসকে নানাভাবে ফাঁদে ফেলতে কোষের গঠনে একটু বৈচিত্র্যও এনেছেন বিজ্ঞানীরা। পলিমার কোরকে ঘিরে বসিয়ে দিয়েছেন ম্যাক্রোফাজ কোষ (Macrophage Cells) । এই ম্যাক্রোফাজ কোষও ভাইরাসকে টেনে আনতে পারে।

এটা গেল ন্যানোস্পঞ্জের গঠন। এবার তাকে কৌশলী করে তুলতে কিছু অস্ত্রসস্ত্রও দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই অস্ত্র হল মানুষের দেহকোষের রিসেপটর প্রোটিন, যাদের সঙ্গে ভাইরাস যুক্ত হয়ে কোষে ঢুকতে পারে। এই রিসেপটর প্রোটিনের একটি ACE-2 (অ্যাঞ্জিওটেনসিন কনভার্টিং এনজাইম-২), তাছাড়া করোনার পছন্দের অন্যান্য রিসেপটরও রয়েছে। বস্টন ইউনিভার্সিটির ন্যাশনাল ইমার্জিং ইনফেকশিয়াস ডিজিজ ল্যাবোরেটরি হল আধুনিক বায়োসেফটি লেভেল-৪ ল্যাবোরেটরি, সেখানেই এই ন্যানোস্পঞ্জের টেস্টিং করেছেন বিজ্ঞানীরা।


ভাইরাসকে ফাঁদে ফেলে টেনে আনে, শুষে নেয় সংক্রামক প্রোটিন

এই ন্যানোস্পঞ্জের কাজের পদ্ধতি দু’রকম। মানুষের দেহকোষের মতো গঠন ভাইরাসকে ফাঁদে ফেলে টেনে আনে আর স্পঞ্জ তার সংক্রামক স্পাইক প্রোটিনগুলোকে শুষে নেয়। বস্টন স্কুল অব মেডিসিনের গবেষক অ্যান্থনি গ্রিফিথ বলেছেন, এই ন্যানোস্পঞ্জ ভাইরাস মেরে সংক্রমণ কমাতে পারে দু’ভাবে। প্রথমত, ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনগুলোকে ‘হোস্ট সেল’ অর্থাৎ দেহকোষে ঢুকতে দেয় না। তার আগে নিজেরাই কব্জা করে ফেলে ভাইরাসকে। দ্বিতীয়ত, ভাইরাসের বাড়বৃদ্ধির কারণে মানুষের শরীরে যে সাইটোকাইন প্রোটিনের মাত্রা বেড়ে গিয়ে তীব্র প্রদাহ তৈরি হয়, তাকেও থামাতে পারে এই ন্যানোস্পঞ্জ। এখন দেখে নেওয়া যাক কীভাবে?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ন্যানোস্পঞ্জের কোষ পর্দা মানুষের শরীর থেকে নেওয়া। তাই সার্স-কভ-২ ভাইরাস ভাববে আসলে জীবন্ত কোষ। পাশাপাশি, রিসেপটর প্রোটিনগুলোও হাতছানি দেবে ভাইরাসকে। সত্যিকারের দেহকোষের মায়া ছেড়ে ভাইরাস তখন ছুটবে নকল কোষের দিকে। ন্যানোস্পঞ্জের রিসেপটর প্রোটিনের সঙ্গে নিজেদের স্পাইক প্রোটিন মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে। আর এখানেই ‘চেকমেট’ করে দেবেন বিজ্ঞানীরা। ন্যানোস্পঞ্জ ভাইরাসকে জড়িয়ে নিয়ে তার প্রোটিন শুষে নিতে থাকবে। একেবারে অকেজো করে ছিবড়ে বানিয়ে ফেলে দেবে।

আরও একটা কাজ করবে এই ন্যানোস্পঞ্জ। সান দিয়েগোর ন্যানোইঞ্জিনিয়ার লিয়াংফ্যাং ঝ্যাং বলেছেন, অতিরিক্ত সাইটোকাইন প্রোটিনকেও শুষে নিতে পারবে এই ন্যানোস্পঞ্জ। এই সাইটোকাইন প্রোটিনের বেশি ক্ষরণেই কোষে তীব্র প্রদাহ বা সাইটোকাইন স্টর্ম শুরু হয়। এই প্রোটিনের মাত্রা কমিয়ে দিতে পারলেই রোগীর সংক্রমণ ও প্রদাহ একইসঙ্গে কমতে থাকবে।

ন্যানোস্পঞ্জের ল্যাবোরেটরি ট্রায়াল সফল হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। এপিথেলিয়াল কোষে মোড়া ন্যানোস্পঞ্জ ভাইরাল সংক্রমণ কমিয়েছে ৯৩%, আর ম্যাক্রোফাজে মোড়া ন্যানোস্পঞ্জ কাজ করেছে ৮৮%। এবার হিউম্যান ট্রায়ালের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More