মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৫

পুজোয় চুটিয়ে খান মাংস, ‘রেড মিট’ মোটেই ক্ষতিকর নয়, ভোজনরসিকদের মনের কথা বললেন গবেষকরা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাঙালির উৎসব মানেই রেড মিটের বিলাসিতা। গরম ভাতে কচি পাঁঠার ঝোল থেকে নানের সঙ্গতে মটন কষা, হালে ভেড়া, চিজ বেক্‌ন ঠাসা নরম মাংসের চাকতিও রেড ওয়াইন সসের ছোঁয়ায় জমকালো। কোলেস্টেরল, ইউরিক অ্যাসিডে কাহিল বাঙালি ইদানীং মুরগির ঝোলে মন দিলেও, রেস্তোরাঁয় জমিয়ে মাটন কষার স্বাদ না পেলে মন ঠিক ভরে না। তবে গোটা বিশ্বজুড়েই নিউট্রিশনিস্টরা যেভাবে চোখরাঙানি দিতে শুরু করেছিলেন, তাতে খাবারের তালিকা থেকে রেড মিট ছেঁটে ফেলেছিলেন অনেকেই। কিন্তু আর নয়। নতুন গবেষণা একেবারে মন খুশি করে দিয়েছে ভোজনরসিকদের।

গবেষকরা জানিয়েছেন, রেড মিটেও রয়েছে এমন সব গুণ যে রয়েসয়ে খেলে উপকারের পাল্লাই ভারী হয়৷ যেমন, ভাল জাতের প্রোটিন, আয়রন, ভিটামিন বি ১২৷ কাজেই যে দেশে অপুষ্টি ও রক্তাল্পতার এত রমরমা, সেখানে একে পুরোপুরি বর্জন করার কথা না ভাবাই ভাল৷

রেড মিটের সুফলের কথা বেশ জোর গলায় ঘোষণা করেছেন অন্তত ১৪ জন গবেষক। Annals Of Internal Medicines নাম একটি জার্নালে গবেষকরা জানিয়েছেন রেড মিট কম খাওয়ার মানেই হয় না। ডালহৌসি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ব্র্যাডলে জনস্টনের মতে, বুঝেশুনে রেড মিট খেলে কোলেস্টেরলও বশে থাকে আর হার্টও ভালো থাকে। তবে প্রক্রিয়াজাত (প্রসেসড) মাংস একেবারেই নয়। যত রোগের ডিপো ওই সসেজ-বেকন-সালামি। কারণ এই ধরনের খাবার সংরক্ষণের জন্য যে বিশেষ রাসায়নিক (প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয়, তাকে এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।

স্নেহপদার্থ মানেই ব্রাত্য নয়, মন্দ ফ্যাট হল ট্রান্স ফ্যাট 

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) জানিয়েছে, আমরা যেমন ভাবি, ফ্যাট মানেই খারাপ, তা কিন্তু নয়৷ ভালো ফ্যাটও আছে। যেমন, মোনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড বা পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড। চর্বিহীন খাবার খেতে গিয়ে খেতে তাদের বাদ দিয়ে দিলে বিপদ৷ গবেষকদের মতে, স্যাচুরেটেড ফ্যাটও পুরোপুরি বাদ দেওয়ার দরকার নেই৷ খাবারের মোট ক্যালোরির ১০ শতাংশের মতো স্যাচুরেটেড ফ্যাট থেকে এলে তাতে কোনও ক্ষতি হয় না৷ বরং শরীর ভাল রাখতে বাতিল করতে হবে ট্রান্স ফ্যাট৷ সেই হল যত নষ্টের গোড়া।

ট্রান্স ফ্যাট বেশি খেলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল এলডিএল বাড়ে, কমে ভাল কোলেস্টেরল এইচডিএল৷ ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে আশঙ্কা বাড়ে ডায়াবিটিসের৷ খারাপ হতে শুরু করে হার্ট৷ রেড মিটে এই মন্দ ফ্যাট থাকে সামান্য পরিমাণে, তাতে খুব একটা ক্ষতি হয় না৷ ক্ষতি হয় বেশি প্রসেসড মিট খেলে।

‘আমেরিকান ডায়েটারি অ্যাসোসিয়েশন’-এর মতে, প্যাকেটবন্দি মাংস সংরক্ষণের জন্য সোডিয়াম ওমাডিন নামে একটি রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যার জেরে শরীরে ট্রান্স ফ্যাট জমার প্রবণতা অনেকটাই বেড়ে যায়। তার ওপরে প্রসেসড ফুড বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্লাস্টিকের মোড়কে থাকে। সোডিয়াম ওমাডিন সেই প্লাস্টিক থেকে কার্সিনোজেনিক বা ক্যানসার সৃষ্টিকারী পদার্থগুলিকে বার করে খাবারে মিশতে সাহায্য করে।

গবেষণা যতই গলা ফাটাক, বাঙালির পেটে একটু রয়েসয়েই থাক রেড মিট

গবেষণার সূত্র ধরে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন গরু, শুয়োর বা খাসির মাংসের সব বিপদের মূলে শুধু স্যাচুরেটেড ফ্যাট আর কোলেস্টেরল নয়৷ নিয়মিত ও প্রচুর পরিমাণে এই জাতীয় মাংস খেলে পাকস্থলিতে কিছু ক্ষতিকারক ব্যাকটিরিয়া দ্রুত গতিতে বাড়তে শুরু করে৷ এদের উপস্থিতিতে মাংসের কারনিটিন নামের উপাদান ভেঙে গিয়ে ট্রাইমিথাইল্যামিন যৌগে পরিণত হয়। যা হার্টের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম রক্তনালীতে চর্বি জমিয়ে ইসকিমিক হৃদরোগের জন্ম দেয়। কাজেই রেড মিট খান তবে একটু বুঝেশুনে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে।

রোগের বাড়াবাড়ি না থাকলে ও ডাক্তার বারণ না করলে সপ্তাহে এক থেকে দু’দিন রেড মিট চলতেই পারে। একেবারে কবজি ডুবিয়ে না খেয়ে বরং একটু ছাড় দিন।

রেড মিট কেনার সময় যে অংশে চর্বি কম আছে, সেই অংশ থেকে মাংস কিনুন, যাকে বলে ‘লিন কাট’৷

লিন কাট থেকে দৃশ্যমান সব চর্বি ছেঁটে ফেলুন ও মাংস কষানোর পর ভেসে ওঠা তেল ফেলে দিন৷ রান্নার পর মাংস ফ্রিজে রেখে দিলে গ্রেভিতে মিশে থাকা চর্বি শক্ত হয়ে যায়৷ তখন সেটা ফেলে বাকিটা গরম করে খান৷

রান্নায় কম তেল দিন৷ খুব কষিয়ে বা ভেজে রান্না করার বদলে বেক, গ্রিল, রোস্ট, স্টার ফ্রাই, সতে বা স্টু খেলে বেশি উপকার৷

Comments are closed.