করোনা সারলেও হানা দিচ্ছে অবসাদ, বাইপোলার-ইনসমনিয়ার ঝুঁকি বাড়ছে, আতঙ্ক নয় সতর্ক থাকতে বললেন গবেষকরা

গবেষকরা বলছেন, আতঙ্কের কিছু নেই।এমন সমস্যা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া দরকার। সঠিক সময় চিকিৎসা শুরু হলে সারানো সম্ভব।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনার থেকে যেন রেহাই নেই।

কোভিড সারিয়ে ওঠা সুস্থ মানুষও আচমকাই আক্রান্ত হতে পারেন মস্তিষ্কের জটিল রোগে। এমন সম্ভাবনার কথা আগেও বলেছিলেন বিজ্ঞানীরা। ইতালির গবেষকরা প্রমাণ দিয়ে এই তথ্যই ফের সামনে এনেছেন।

করোনা সারিয়ে ওঠার পরবর্তী সময় অর্থাৎ পোস্ট-কোভিড পর্যায়ে নানারকম অসুখে ভুগছেন রোগীরা। কখনও রক্ত জমাট বাঁধছে হার্টে, কখনও প্রদাহ হচ্ছে হৃদপেশীতে। আবার কখনও রোগের আতঙ্কে মানসিক অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়ছে রোগী। ইতালির বিজ্ঞানীরা তাঁদের নতুন গবেষণায় দাবি করেছেন, ভাইরাসের আতঙ্ক এমনভাবে মনে প্রভাব ফেলছে যে রোগী সেরে উঠলেও ট্রমার মধ্যে থাকছে। পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD)দেখা দিচ্ছে অনেক রোগীরই। সেই সঙ্গেই গ্রাস করছে অবসাদ। প্রচণ্ড উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা থেকে ঘুম কম হচ্ছে। ফলে ইনসমনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে অনেকে।

এখানেই শেষ নয়। তীব্র মানসিক অবসাদ থেকে বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও থেকে যাচ্ছে। কারণ এই করোনাভাইরাস শুধু ফুসফুসে নয়, ধাক্কা দেয় শরীরের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে, এক-হৃদপিণ্ড, দুই-মস্তিষ্ক। তাই পোস্ট-কোভিড পর্যায়ে হার্টের রোগ যেমন দেখা দিতে পারে, তেমনি মস্তিষ্কের রোগ হওয়ার সম্ভাবনাও কম নয়।

ইতালির মিলানে সান রাফায়েল হাসপাতালে ৪০২ জন কোভিড রোগীকে দীর্ঘ সময় ধরে নজরে রেখে, তাদের শারীরিক পরীক্ষানিরীক্ষা করেই এমন তথ্য দিয়েছেন গবেষকরা। ‘ব্রেন, বিহেভিয়র অ্যান্ড ইমিউনোলজি’ সায়েন্স জার্নালে এই গবেষণার রিপোর্ট ছাপা হয়েছে।


উদ্বেগ-অবসাদ, আতঙ্ক, বাইপোলার থেকে ইনসমনিয়া, রোগের নানা ধরন

ইতালির গবেষকরা বলছেন, ৪০২ জন করোনা রোগীকে চিকিৎসা শুরুর সময় থেকে সেরে ওঠার পরবর্তী সময় অবধি নজরে রাখা হয়েছিল। তাতে নানারকম রেজাল্ট পাওয়া গেছে। অন্তত ৫৫ শতাংশ রোগী নিজে থেকেই বলেছেন তাঁরা মানসিক রোগে ভুগছেন, হয় তীব্র অবসাদ, না হলে সোশ্যাল ফোবিয়া। তাছাড়া ভুল বকা, ভুলে যাওয়া, স্লিপিং ডিসঅর্ডার তো রয়েছেই। ২৮ শতাংশ রোগী করোনা সারিয়ে ওঠার পরে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হয়েছেন। ৩১ শতাংশ তীব্র মানসিক অবসাদে ভুগছেন। ৪২ শতাংশের মধ্যে দেখা গিয়েছে প্রচণ্ড উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। অসুখ আবারও ধরতে পারে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে বেশিরভাগেরই মনে।

আরও পড়ুন: করোনা সারিয়েও ৭৮% রোগী আক্রান্ত হচ্ছেন হৃদরোগে, তীব্র প্রদাহ হৃদপেশীতে, গবেষণায় দাবি বিজ্ঞানীদের

২০ শতাংশ রোগী অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডারে (OCD)আক্রান্ত, ৪০ শতাংশের মধ্যে দেখা গিয়েছে ইনসমনিয়া। গবেষকরা বলছেন, করোনার উপসর্গ দেখা দেওয়ার সময়েই মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হয়েছিলেন এমন রোগীও আছে। কিন্তু সংক্রমণ সেরে যাওয়ার পরে তাঁরা অবসাদ কাটিয়ে উঠেছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হল, দেখা গেছে সুস্থ হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর থেকে ফের মানসিক অবসাদ জাঁকিয়ে বসেছে অনেকের মধ্যেই। এমন ২৬ জন রোগী রয়েছেন যাঁরা অবসাদজনিত সমস্যার শিকার। পাঁচ জনের মধ্যে দেখা গেছে বাইপোলার ডিসঅর্ডার। খাবার খেতে সমস্যা হচ্ছে, ঘুমোতে গেলে শরীরে অস্বস্তি হচ্ছে এমন রোগীরাও রয়েছেন তালিকায়।

মানসিক রোগে কি বেশি ভুগছেন মহিলারা?

গবেষকরা বলছেন মহিলাদের মধ্যে মানসিক অবসাদ ও ফোবিয়া বেশি দেখা গেছে। প্রবীণরা শুধু নন, কমবয়সীরাও আক্রান্ত মানসিক চাপ ও উৎকণ্ঠায়। স্লিপিং ডিসঅর্ডার বেশি দেখা গেছে মহিলাদের মধ্যেই। গবেষকরা বলছেন, প্রাথমিকভাবে এই তথ্য সামনে এসেছে। তবে আরও গবেষণার পরেই এর কারণ সবিস্তারে বলা যাবে। সার্স ও মার্স ভাইরাসের সংক্রমণের পরেও পোস্ট-ট্রমাটিক নানা সিন্ড্রোম দেখা গিয়েছিল রোগীদের মধ্যে, তবে করোনা কালে এই সমস্যা অনেক বেশি।

 

ঝড় বইছে মনে-মাথায়!

গবেষকরা বলছেন, ফুসফুসকে আক্রান্ত করার পরে হয় হৃদপিণ্ডকে বা মস্তিষ্ককে টার্গেট করছে করোনা। সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটারি সিন্ড্রোমে আক্রান্ত রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস বাধা পাচ্ছে। ফুসফুস এমনভাবে আক্রান্ত হচ্ছে যে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আরও একটা কাণ্ড ঘটাচ্ছে করোনা, সেটা হল স্নায়ুর উপরে ধাক্কা দিচ্ছে। গোটা সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমকে নিজেদের কব্জায় আনার চেষ্টা করছে। সাইটোকাইন প্রোটিনের মাত্রা বাড়িয়ে তীব্র প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন তৈরি করছে।

ভাইরাল প্রোটিন বা অ্যান্টিজেন শরীরে ঢুকে সাইটোকাইন প্রোটিনের ক্ষরণ অনেকটাই বাড়িয়ে দিচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, এই সাইটোকাইন প্রোটিনের কাজ হল বাইরে থেকে কোনও সংক্রামক ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা প্যাথোজেন ঢুকলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কোষে সেই বিপদ সঙ্কেত পৌঁছে দেওয়া। অজানা সংক্রামক প্রোটিন দেখলেই ঝড়ের গতিতে কোষে কোষে বিপদবার্তা পৌঁছে দেয় এই সাইটোকাইন প্রোটিন। এই প্রোটিন ক্ষরণেরও একটা নির্দিষ্ট মাত্রা আছে। যদি দেখা যায় সাইটোকাইন ক্ষরণ বেশি হচ্ছে বা কম হচ্ছে তাহলে ভারসাম্য বিগড়ে যায়। করোনার সংক্রমণে এই সাইটোকাইনের ক্ষরণ প্রয়োজনের থেকে বেশি হচ্ছে। এত বেশি প্রোটিন নিঃসৃত হচ্ছে যে বিপদবার্তা পৌঁছে দেওয়ার বদলে সে নিজেই কোষের ক্ষতি করে ফেলছে। এই ঘটনাকে বলা হচ্ছে সাইটোকাইন ঝড় (Cytokine Storm)।  এর প্রভাবে তীব্র প্রদাহজনিত রোগ তৈরি হচ্ছে শরীরে। এমনকি মস্তিষ্কেও ব্লাড ক্লট হতে দেখা যাচ্ছে।  যার কারণে ব্রেন স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

তবে গবেষকরা বলছেন, এমন সমস্যা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া দরকার। সঠিক সময় চিকিৎসা শুরু হলে সারানো সম্ভব।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More