শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

বাইক-লাইব্রেরিতে চণ্ডীগড়ের বই ফেরিওয়ালা, পুরনো বই জোগাড় করে তুলে দেন অভাবী পড়ুয়াদের হাতে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কেউ বই দেবে! বই!

চণ্ডীগড়ের মানুষজনের কাছে এই হাঁকটা খুব চেনা। সপ্তাহ গড়ালে, অথবা মাসের শেষে একবার করে এই চেনা ডাকে বাড়ির বাইরে পা রাখতেই হয়। পুরনো হয়ে যাওয়া বই, ছেলেমেয়ের সিলেবাস পার করা বইখাতা, নোটস, পেন-পেনসিল যা থাকে ঝুলি ভরে নিয়ে যান ওই যুবক। তাঁর বাইক যেন চলমান-লাইব্রেরি। বইয়ের বোঝা বয়ে চণ্ডীগড়ের অলিতে-গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর।

বই সংগ্রহ করাই তাঁর নেশা, হালে পেশাও বটে। সন্দীপ কুমার। চণ্ডীগড়ের মানুষজন বলেন বই-ফেরিওয়ালা। ঝড়তি-পড়তি, ফেলে দেওয়া, ছেঁড়া বইখাতা মেরামত করেই জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন অশিক্ষার অন্ধকারে। ‘রদ্দি সে শিক্ষা’— নিজের অভিযানের এই নামই রেখেছেন বছর আঠাশের সন্দীপ।

‘ওপেন আইজ় ফাউন্ডেশন’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন চালান সন্দীপ। শুরুটা করেছিলেন একা। এখন এই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ২০০ জন। তাঁদের মিশন, বাড়ি বাড়ি ঘুরে পুরনো বইখাতা, পেন, পেনসিল সংগ্রহ করা। সন্দীপের কথায়, ছিঁড়ে যাওয়া বই সেলাই করে নেওয়া সম্ভব। পাতা হারিয়ে গেলে, লাইব্রেরি খুঁজে হাতে লিখেই সেই জায়গায় ভরাট করে দেন। পুরনো পেনে রিফিল ভরলেই আবার লেখা পড়ে আগের মতো। মলিন হলদে হয়ে যাওয়া পাতার বই মলাট দিলেই এক্কেবারে নতুনের মতো। এই সব বই খাতা পৌঁছে যায় অনাথ আশ্রমে, বস্তিতে অভাবীদের শিশুদের কাছে, প্রত্যন্ত এলাকার স্কুলগুলিতে।

চণ্ডীগড়ের বই-ফেরিওয়ালার কথায়, ‘‘সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, অধ্যাপকরা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এখনও এবধি ১০ হাজারের বেশি বই আণরা তুলে দিতে পেরেছি অভাবী পড়ুয়াদের হাতে।’’

জন্ম হরিয়ানার ভিওয়ানি জেলার ধানি মাউ গ্রামে। গ্রামের স্কুল থেকেই দ্বাদশের পরীক্ষা দিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য সন্দীপ চলে আসেন চণ্ডীগড়ে। সেখানকার কলেজ থেকেই বিজ্ঞানের উপর স্নাতক। এর পরে ‘জুনিয়র বেসিক ট্রেনিং কোর্স’ করে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত একটি প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকের চাকরি। ছাত্র পড়ানোর সময়েই সন্দীপ লক্ষ্য করেন, প্রত্যন্ত ওই এলাকার স্কুলের বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই মেধাবী। অথচ পয়সার অভাবে তাদের বই, খাতা নেই। নিদেনপক্ষে একটা পেন দিয়ে পালা করে লিখছে অন্তত চার-পাঁচ ছাত্রছাত্রী। সন্দীপের কথায়, ‘‘ক্লাস ফাইভের ছাত্রদের পড়াচ্ছি। একবার অঙ্ক শেখালেই তারা ফটাফট তুলে নেয়। কিন্তু অভ্যাস করবে কোথায়? খাতা-পেন, পেনসিল কিছুই নেই সঙ্গে। জিজ্ঞেস করলে তারা উত্তর দেয়, আমরা বই, খাতা পাই না মাস্টারজি!’’

আরও পড়ুন: বই-সফর! ট্রেনের ভিতরেই আস্ত লাইব্রেরি! থরে থরে বই নিয়ে ছোটে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘বই-ট্রেন’

চণ্ডীগড়ের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে এখনও অশিক্ষা আর কুসংস্কারের অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে। সন্দীপের কথায়, যে গুটি কয়েক স্কুলগুলি টিমটিম করে জ্বলছে, সেখানেও বই-খাতা নেই। নামেই স্কুল। কোনও পরিকাঠামো নেই। ‘‘ভেবেছিলাম কচিকাঁচাদের নিজের মতো করে পড়াবো। প্রথমে আমার বইখাতা দিয়েই শুরু করি। কিন্তু, বিভিন্ন বিষয়ের বই চাই। তাই গ্রামে, শহরে ঘুরে ঘুরে পুরনো বই জোগাড় করি,’’ সন্দীপের কথায়, ‘‘অনেকেই আমার হাতে তাঁদের দামি বই তুলে দিয়েছেন। শুধু পুরনো বই নয়, নানা বিষয়ের উপর অনেক নতুন বইখাতাও আমাকে দিয়ে দেন এলাকার লোকজন। নামী বেসরকারি স্কুলের পড়ুয়ারা তাদের নোটস দিয়েছে আমাকে।’’

চণ্ডীগড়ের সেক্টর ৩৯বি-তে নিজেদের অফিস খুলেছেন সন্দীপ। সেখানে স্বেচ্ছায় কাজ করেন ২০০ জন ছেলে-মেয়ে। পুরনো বই বাঁধাইয়ের পাশাপাশি, স্টেশনারি জিনিসপত্রও জমা করা হয়। সেগুলো বিলি করা হয় গ্রামের ছেলেমেয়েদের মধ্যে। কম খরচে বায়োডিগ্রেডেবল স্যানিটারি প্যাডও বিলি করছেন সন্দীপের ‘ওপেন আইজ় ফাউন্ডেশন’-এর সদস্যেরা। গত চার মাসে প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে অন্তত ৬০০ মহিলার হাতে এই স্যানিটারি প্যাড তুলে দিয়েছেন সন্দীপ ও সংগঠনের সদস্যেরা।

সন্দীপের কথায়, ‘‘বই সংগ্রহ করে ফেরি করাই আমার আদর্শ। এখানে কোনও সামাজিক বার্তা নেই, কোনও সংস্কারের ঘেরাটোপ নেই। শুধু অনাবিল আনন্দ আছে। আমার মনের খেয়ালে শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোই উদ্দেশ্য, এটাই আমার একমাত্র লক্ষ্য।”’

ছুটে বেড়াচ্ছেন সন্দীপ। ক্লান্তি নেই, বিরক্তি নেই। গ্রাম থেকে শহর, চড়াই-উৎরাই ভেঙে ছুটে চলেছে তাঁর বাইক-লাইব্রেরি। সবরকমের বই আছে তাঁর সংগ্রহে। ছোটদের জন্য পড়ার বই, রঙিন ছবির বই যেমন আছে, তেমনি কিশোর-কিশোরীদের জন্য নানা রকম গল্প-উপন্যাস, তরুণদের জন্য সাহিত্য, দর্শন, রাজনীতি, তাঁর সংগ্রহের তালিকাটা দীর্ঘ। হোক না সে সব পুরনো। অথবা জীর্ণ। শিক্ষার আলো তাতে বিন্দুমাত্র মলিন হবে না।

আরও পড়ুন:

তিন চাকার চলন্ত লাইব্রেরিতে বই ফেরিওয়ালা, শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে বই পৌঁছে দিচ্ছেন শিশুদের হাতে

Comments are closed.