বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭

কলকাতার এই ডাক্তাররা যেন ধন্বন্তরী! ৬ মাসে জন্মানো শিশুকেও বাঁচিয়ে দিলেন, মিরাকেল!

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সবচেয়ে কঠিন ও খারাপ সময়টার মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। এক দিকে আসন্ন অনাগত সন্তানের প্রাণ, অন্য দিকে স্ত্রীয়ের জীবনসঙ্কট। হুগলির জাঙ্গিপাড়ার বাসিন্দা যতীন্দ্রনাথ ঘোষ চোখ মুছে, দাঁতে দাঁত চেপে চিকিৎসকদের বলেছিলেন, “মা-কে বাঁচান।”

তা-ই করেন চিকিৎসকেরা। জান লড়িয়ে দেন, সন্তানসম্ভবা ভাস্বতী ঘোষকে বাঁচানোর জন্য। মাত্র ২৫ সপ্তাহের মাথায় তাঁর পেট থেকে বার করে আনা হয় সন্তানকে। অপরিণত, অসম্পূর্ণ, ছোট্ট একরত্তি মাংসপিণ্ডের মতো। বাঁচার আশা ছিল না। কিন্তু মিরাকেল হল। অভাবনীয় উপায়ে প্রাণ বাঁচল সেই পুত্রসন্তানেরও। এখন তার পাঁচ মাস বয়স, সুস্থ ও স্বাভাবিক। দিব্যি আছেন মা-ও। সৌজন্যে, চিকিৎসক সৌমব্রত আচার্য।

চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, কোনও মহিলা গর্ভধারণের পরে শিশুর জন্মের সম্ভাব্য তারিখ ও সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু ভাস্বতীদেবীর ক্ষেত্রে, নির্ধারিত সময়ের ১০০ দিন আগেই প্রসব যন্ত্রণা শুরু হয়। মাত্র ২৫ সপ্তাহের প্রেগন্যান্সির শেষে হঠাৎ ব্লিডিং শুরু হওয়ায় সল্টলেক আমরি-তে নিয়ে আসা হয় তাঁকে। ভর্তি হওয়ার খানিক পরেই ওয়াটার ব্রেক করে।

জুলাই মাসের বদলে, এপ্রিল মাসের ২৬ তারিখেই সন্তানকে মায়ের পেট থেকে বার করে নিতে বাধ্য হন চিকিৎসকেরা। ৫০০ গ্রাম ওজনের, অপরিণত শিশু। তৈরি হয়নি সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। ফুসফুসের ভিতরের প্রকোষ্ঠগুলিও তখনও পরিণত হয়নি। ফলে শরীর অক্সিজেন পাচ্ছিল না। হার্টও অপরিণত, ভালভে ফুটো। প্রথমে সকলেই ধরে নিয়েছিলেন, সদ্যোজাত সেই সন্তানের মৃত্যু অবধারিত।

তখন সবে এক মাস।

বাবা যতীন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, “পরিস্থিতি এমন ছিল, মাকে বাঁচাতে বলা ছাড়া উপায় খুঁজে পাইনি। তার পরে জন্ম নেওয়া বাচ্চাকে যখন ডাক্তারবাবুরা দেখালেন, চোখে দেখা যায় না। এক হাতে মুঠো করে ধরার মতো ছোট্ট একটা মাংসের তাল। খুবই ভেঙে পড়েছিলাম ওই দৃশ্য দেখে। ওর মাকে হাসপাতালে রেখে, রাতে ফিরেছিলাম বাড়ি। পরের দিন ফোন এল ডাক্তারবাবুর।”

আমরি হাসপাতালের নিওনেটাল বিভাগের স্পেশ্যালিস্ট চিকিৎসক সৌমব্রত আচার্য বাবাকে ফোন করে জানান, মিরাকেল ঘটে গিয়েছে। বাচ্চা সাড়া দিচ্ছে। পটিও করেছে। অক্সিজেন সাপোর্টে শ্বাস নিতে পারছে। তাঁরা তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে রেখেছেন বাচ্চাকে। সদ্যোজাতদের আইসিইউ বিভাগের বিশেষ ইনকিউবেটরে রয়েছে শিশু।

শুরু হয় অন্য এক লড়াই। যতীন্দ্রনাথ বলেন, “চিকিৎসকদের ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা নেই। আমরা ভাবিনি, বাচ্চা বাঁচবে! দশ দিন ধরে তিল তিল করে ওকে একটু একটু করে বড় করেন চিকিৎসকেরা। তবে এর পরে সল্টলেক আমরি থেকে মুকুন্দপুর আমরি-তে নিয়ে যেতে হয় বাচ্চাকে। ৪৫ মিনিটের জার্নি। খুব ভয়ে ছিলাম এই সময়টা। কিন্তু সেটাও ভালয় ভালয় পার হয়ে গেল।”

পরীক্ষামূলক ভাবে শিশুটির ফুসফুসের মধ্যে একটি নল ঢুকিয়ে, তার মাধ্যমে বিশেষ ধরনের ওষুধ আড়াই মাস ধরে পাঠানো হয়। ধীরে ধীরে পরিণত করা হয় ফুসফুস। অন্য দিকে তার ওজন বাড়ানোর চেষ্টাও শুরু হয়। বিশেষ মিনারেলস, প্রোটিন, ভিটামিন-সহ তরল তৈরি করে, সদ্যোজাতর চাহিদা অনুযায়ী শিরার মাধ্যমে পুশ করা হয় কয়েক মিলিলিটার করে।

ইনকিউবেটরের ভেতরেই এই লডা়ইটা চলে ৭২ দিন ধরে। একটু একটু করে বাড়ে খাবারের পরিমাণ। তার পরে ইনকিউবেটর থেকে বার করে আরও কিছু দিন বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয় তাকে। শেষমেশ, তিন মাসের মাথায় শিশুটির ওজন ৫০০ গ্রাম থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ২ কিলোগ্রামে। তার ফুসফুসও স্বাভাবিক কাজ করতে শুরু করে।

দিব্যি আছে ছোট্ট সোনা।

এর পরে ফের শিশুটির যাবতীয় শারীরিক পরীক্ষা করে দেখেন চিকিৎসকেরা। এত বড় লড়াইয়ের পরে হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক, চোখ, কান– কোনও রকম ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি তো! না, কোনও সমস্যা ছিল না আর। শহরের শিশু-চিকিৎসায় মিরাকেল ঘটানোর নজির তৈরি করে, তিন মাস পরে সুস্থ শিশু নিয়ে বাড়ি ফেরেন বাবা-মা। সল্টলেক আমরি এবং মুকুন্দপুর আমরি যৌথ ভাবে এই অসম্ভব সাধন করে।

শিশুর মূল চিকিৎসক সুব্রত আচার্য বলেন, “সদ্যোজাতকে যে বাঁচাতে পারব, ভাবিনি। তবে চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলাম। দুই হাসপাতাল মিলে আমরা একসঙ্গে কাজ করি তিন মাস। এখন শিশুটি সম্পূর্ণ সুস্থ। ৫ মাসের ওই শিশুটির এখন ওজন চার কেজি। শরীরের কোথাও কোনও অস্বাভাবিকতা বা অসুস্থতা নেই তার।”

শিশুর মা ভাস্বতী বলেন, “বিশ্বাস করতে পারিনি ওকে নিয়ে বাড়ি ফিরবো। ওর জন্ম হওয়ার ৭২ দিন পরে প্রথম কোলে পেয়েছি ওকে। সুস্থ সন্তানকে মানুষ করছি এখন। নাম রেখেছি, ঋদ্ধিস্মিত।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া বাচ্চাকে বাঁচিয়ে তোলাই একটা চ্যালেঞ্জ। অনেক সময়ে বাঁচলেও, সুস্থতার সম্ভাবনা কমে যায়। কিন্তু এই ঘটনাটি ব্যতিক্রম। কলকাতার চিকিৎসকেরা মিরাকেল ঘটিয়েছেন।

Comments are closed.