লক্ষ্মী গণেশ মুখ ফেরালেও এসেছেন সরস্বতী, দিন বদলের আশায় অযোধ্যা পাহাড়ের হতদরিদ্র গ্রাম কেন্দঘুঁটু

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    ছোটনাগপুর মালভূমির একেবারে পূর্ব প্রান্তে আছে পূর্বঘাট পর্বতমালার অযোধ্যা পাহাড়। আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা। আজ থেকে প্রায় আড়াই বছর আগে, সেই এলাকার প্রত্যন্তে থাকা শাল-সেগুন-শিরীষের ছায়া ঘেরা এক গ্রামে কম্বল বিলি করতে গিয়ে বিপদে পড়েছিলেন নৈহাটির কয়েকজন সমাজসেবী। ওঁদের গাড়ি ঘিরে ধরেছিলেন রাগে ফুটতে থাকা কয়েকশ সাঁওতাল।

    মারমুখী গ্রামবাসীদের দাবি ছিল সবাইকে কম্বল দিতে হবে। একটা কম্বলে একজনের শীত কাটবে, আর বাকিরা? কম্বল না দিলে গাড়ি ছাড়া হবে না। গ্রামবাসীরা ভেবেছিলেন সমাজসেবীরা সরকারি লোক। অনেক বুঝিয়ে ঘেরাও থেকে ছাড়া পেয়ে দ্রুত গ্রাম ছেড়েছিলেন আতঙ্কিত সৌমিত্র সাহা, শ্যামসুন্দর নাথ, শুকদেব মিস্ত্রি , সুজাতা সাহা সরকাররা, হরিৎ কর, অপুর্ব চক্রবর্তীরা। গ্রামবাসীদের আচরণে মুষড়ে পড়েছিলেন তাঁরা।মুষড়ে পড়েছিলেন পেশায় গাড়িচালক বাবুলাল মাণ্ডিও। তাঁর গাড়ি নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে দফায় দফায় কম্বল,জামাকাপড় ও অনান্য জিনিসপত্র বিলি করে এসেছেন সমাজসেবীরা। গ্রামবাসীদের এরকম অপ্রত্যাশিত ব্যবহার তিনিও আশা করেননি।

    সেই গ্রাম

     গ্রামটির নাম ছিল কেন্দঘুঁটু

    সমাজসেবীদের দলটি অযোধ্যা হিল টপে ফিরে এসে মনোরঞ্জন মাহাতোর হোটেলে ঢোকে দুপুরের খাবার খেতে। সব শুনে মনোরঞ্জন বলেন, কম্বল, পুরোনো জামাকাপড় অনেকেই দিতে আসেন। খাপছাড়াভাবে সমস্যা না মিটিয়ে, স্থায়ীভাবে কিছু করুন আপনারা। দিতে হলে শিক্ষা দিন, দারিদ্রকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করুন। যাতে আপনাদের থেকে ভিক্ষা না নিয়ে গ্রামবাসীরা নিজেরটা নিজেরা কিনে নিতে পারেন।

    চমকে গিয়েছিল নৈহাটির দলটি। সহজ সরল স্থানীয় মানুষের সোজাসাপটা কথা ওঁদের সামনে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলেন ওঁরা। অযোধ্যা পাহাড় অঞ্চলে দু-একটা স্কুল থাকলেও স্কল ছুটের সংখ্যা প্রচুর। সেদিনই তাঁরা ঠিক করেছিলেন এই অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন এবং কোনও একটি গ্রামেই হবে সেই স্কুল। কিন্তু স্কুলবাড়ি তৈরির টাকা হাতে নেই। তাঁরা আবার শরণাপন্ন হলেন বাবুলাল মান্ডির। এলাকাটিকে যিনি নিজের হাতের তালুর মতো চেনেন। বাবুলালকেই খুঁজে দিতে হবে একটা গ্রাম, যেখানে একটা বাড়ি পাওয়া যাবে।

    বাবুলাল মান্ডি

    কিছুদিনের মধ্যে বাবুলাল জানিয়ে দিলেন, খুঁজে পাওয়া গেছে সেই গ্রাম, বাড়ি ও সম্ভাব্য ছাত্রছাত্রী। টাটা কোম্পানি সেই গ্রামে Corporate Social Responsibility প্রজেক্টে একটি মাটির ঘর বানিয়ে দিয়েছিল স্কুলের জন্য (পরে জানলাম কেবল মাত্র অ্যাসবেস্টাসের ছাদটি বানিয়ে দিয়েছিল)। কিন্তু প্রজেক্টটি না চলায় কার্যত ঘরটি পড়ে আছে। গ্রামটির নাম কেন্দঘুঁটু। আঁতকে উঠেছিলেন সমাজসেবীরা। আবার সেই ভয়ানক গ্রামে!

    গ্রামের নাম শুনে সমাজসেবীরা আঁতকে উঠলেও ভরসা দিয়েছিলেন বাবুলাল। গ্রামের একজন শিক্ষিত যুবক শক্তিপদর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। সে সব ব্যবস্থা করবে। শঙ্কিত চিত্তে আবার সেই কেন্দঘুঁটু গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন সমাজসেবীরা। এবার গ্রামের অন্যরুপ দেখলেন তাঁরা। আক্রমণের বদলে পেলেন সাদর আলিঙ্গন। ২০১৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি নৈহাটিতে গড়ে উঠল মাধুকরী চ্যারিটেবল ট্রাস্ট।

    ২৪ ফেব্রুয়ারি কেন্দঘুঁটুতে যাত্রা শুরু করেছিল ‘মাধুকরী শিক্ষা প্রাঙ্গণ’

    প্রায় একবছর বয়েস হতে চলল মাধুকরী শিক্ষা প্রাঙ্গণের। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা এর মধ্যেই বিয়াল্লিশ। এর আগে তাদের পরিবারে কেউ লেখাপড়া শেখেনি। পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে তারা লেখাপড়া শিখছে। মাধুকরী শিক্ষা প্রাঙ্গণে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চমশ্রেণী পর্যন্ত পড়ানো হয়। পাঠদান চলে সকাল সাতটা থেকে দশটা পর্যন্ত। পড়ান গ্রামেরই দুই যুবক, শক্তিপদ কিস্কু ও অজিত বেহরা। মাইনে পান মাসে দু’হাজার টাকা।

    মাধুকরী শিক্ষা প্রাঙ্গণ

    শিক্ষক শক্তিপদ কিস্কু বলছিলেন, গ্রামের বেশির ভাগ বাচ্চাই স্কুলছুট। এর কারণ নিকটতম স্কুলগুলির দূরত্ব সাড়ে তিন থেকে চার কিলোমিটার। রাস্তা দুর্গম হওয়ায় অধিকাংশ বাবা মা বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে পারেন না। এছাড়া বেশিরভাগ বাচ্চা খুব সকালে বাবা মায়ের সঙ্গে চাষের কাজে, গরুছাগল চরাতে বা কাঠ কাটতে বেরিয়ে যায়। দারিদ্র ও দুর্গমস্থানে অবস্থানের জন্যই আমাদের গ্রামের ছেলেমেয়েদের আয়ত্বের বাইরে ছিল শিক্ষা। আজ শিক্ষাকে আমাদের ঘরের দরজায় এনে দিয়েছে মাধুকরী ট্রাস্ট। অন্য গ্রামের শিশুরা পর্যন্ত আমাদের গ্রামে পড়তে আসতে চাইছে। সপ্তাহে একদিন আমরা পরীক্ষাও নিই। তবে পাঠ সহযোগী উপকরণের এখনও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তবে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে মাধুকরী ট্রাস্ট, কিন্তু আমরা বুঝি ট্রাস্টের সামর্থ্য সীমিত।

    পাঠদান চলছে একমাত্র স্কুল ঘরে

    আর এক শিক্ষক অজিত বেসরার কথায় জানা গেল, গ্রামে মেধার ঘাটতি কোনওদিনই ছিল না। দরকার ছিল সুযোগের। তা পেয়ে, মাধুকরী শিক্ষা প্রাঙ্গণে মাত্র একবছরের কম সময় পড়াশুনা করে চারজন ছাত্রছাত্রী তাদের মেধার জোরে সরকারি বিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েছে। আর কয়েকদিন পর থেকে তারা নিখরচায় হস্টেলে থেকে পড়াশুনা করবে।

    অজিতবাবু জানালেন রোজ সকালে প্রাতরাশ হিসেবে ৫০ গ্রাম মুড়ি আর ১৫ গ্রাম ছোলা উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের দেওয়া হয়। সপ্তাহে একদিন সকালে দেওয়া হয় ডিম। সামান্য মুড়ি আর ছোলা পেয়েই অরুপ মুর্মু, প্রেমচাঁদ বাস্কে, মৌসুমী কিস্কু, প্রতিমা বাস্কে, কেয়ারানী কিস্কুদের মুখগুলো আনন্দে উজ্বল হয়ে ওঠে। এখানে পড়াশুনা করে তারা কেউ ‘মাস্টার’ কেউ ‘ডাক্তার’ কেউ ‘রেল’ চালাবার স্বপ্ন দেখে।

    পড়াশুনা চলছে বারান্দাতেও

    শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলার সময় পাশে এসে বসেছিলেন গ্রামের দুই ভাই, মুকুন্দ বাস্কে ও কালীপদ বাস্কে। স্কুলের জমিটি এঁরাই দান করেছেন। নিজেরা লেখাপড়া জানেন না। কিন্তু তাঁরা চান গ্রামের শিশুরা লেখাপড়া করুক। তাই একটুও দ্বিধা না করে জমিটি স্কুলের জন্য দান করে দিয়েছেন। নিঃসন্তান মুকুন্দ বাস্কে আমাকেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, নিজের নেই তো কী হয়েছে, আমার এতগুলো ছেলেমেয়ে লেখাপড়া শিখবে, গ্রামকে দাঁড় করাবে এ চেয়ে আনন্দের কী পাব এ জীবনে!

    গ্রামের উন্নয়নে তাঁদের সেরা জমিটি দিয়েছেন মুকুন্দ বাস্কে ও কালীপদ বাস্কে

      “কিছুই এখনও দেওয়া যায়নি, তবে চেষ্টা আছে আপ্রাণ” 

    মাধুকরী চ্যারিটেবল ট্রাস্টের চেয়ারম্যান সৌমিত্র সাহাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম মাধুকরী শিক্ষা প্রাঙ্গণ নিয়ে তাঁদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্বন্ধে। তিনি বলেছিলেন, ট্রাস্ট চায় মাধুকরী শিক্ষা প্রাঙ্গণ একটি আদর্শ স্কুলে পরিণত হোক। কারণ স্কুল বলতে যা বোঝায় মাধুকরী শিক্ষা প্রাঙ্গন সে জায়গায় পৌঁছায়নি। একটি কুড়ি ফুট বাই দশ ফুটের স্যাঁতস্যাঁতে মাটির ঘরই তাঁদের সম্বল। ৪২ জন শিশুকে ঘরে ও বারান্দায় বসাতে হয়। মাটিতেই বড় প্লাস্টিক পেতে বসে শিশুরা। আরও দশজন ছাত্রছাত্রী স্কুলে আসতে চাইছে, কিন্তু নেওয়ার উপায় নেই আর্থিক কারণে। সৌমিত্রবাবু জানালেন, গরমকালে খুব কষ্ট হয় শিশুদের। গত বছরে ঘরে দু’টি পাখা লাগানো হয়েছে। কিন্তু বারান্দায় পড়াশুনা করা ছাত্রছাত্রীদের খুবই অসুবিধা হয়।

    নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে কচিকাঁচার দল

    শিক্ষা প্রাঙ্গণের মধ্যে দেখলাম একটা প্রায় আব্রুহীন টয়লেট। সেটাই ব্যবহার করে ৪২ জন ছাত্রছাত্রী। জানা গেল মাধুকরী চ্যারিটেবল ট্রাস্ট কলকাতার একটি সংস্থাকে আবেদন করেছে আধুনিক টয়লেটের জন্য। সেই সংস্থা ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য দুটি আধুনিক টয়লেট মাধুকরী শিক্ষা প্রাঙ্গনকে উপহার দিতে চলেছে। দেখলাম, শিশুদের খেলার জন্য মাঠ ও খেলার উপকরণের ব্যবস্থা করা যায়নি এখনও। ব্যবস্থা করা যায়নি নিয়মিত মিড ডে মিলেরও। যদিও এঁরা মাঝে মাঝে খিচুড়ি বা ভাত খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। যেদিন খাওয়ান সেদিন কেবল পড়ুয়া নয়, সমস্ত গ্রামবাসীকেই খাওয়ানোর চেষ্টা করেন।

    ৫০ গ্রাম মুড়ি আর ১৫ গ্রাম ছোলা খেয়ে হাসিমুখে স্কুল শুরু করে খুদেরা

    শিশুদের জন্য ট্রাস্টের শুভানুধ্যায়ীরা কেউ দিয়েছেন স্কুলের পোশাক, কেউ দিয়েছেন মাঙ্কি ক্যাপ, কেউ দিয়েছেন স্কুলব্যাগ। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের বেশিরভাগের পায়েই জুতো নেই। “খালি পায়ে স্কুলের পোশাক বড্ড বেমানান লাগছে।”  শুনে মুখ ম্লান হয়ে উঠেছিল সৌমিত্র সাহা, পিকলু বিশ্বাস, অসিত প্রামানিকদের। জানি ওঁদের ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই। যেমন তাঁদের ইচ্ছে আর একজন মহিলা শিক্ষক নিয়োগ করার। কারণ বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছে যাওয়া ছাত্রীরা অনেক সময় পুরুষ শিক্ষকদের কাছে গুটিয়ে থাকে। কিন্তু কোথা থেকে প্রতিমাসে আসবে আরও দু’হাজার টাকা !

    কালেভদ্রে জোটে গরম খিচুড়ি

    কয়েক মাস আগে পুরুলিয়া সদর হাসপাতাল থেকে ডাক্তারবাবুকে নিয়ে এসেছিলেন স্কুলে গ্রামবাসী ও ছাত্রছাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য। ডাক্তারবাবু জানিয়েছিলেন প্রায় প্রত্যেক ছাত্রছাত্রী কৃমির শিকার। তাঁর নিদান ছিল ছাত্রছাত্রী ও তাদের পরিবারের সবাইকে কৃমির ওষুধ খাওয়াতে হবে একই সঙ্গে। ৪২ জন ছাত্রছাত্রী ও তাদের পরিবারকে পুরুলিয়া সদরে নিয়ে যাওয়া দায়িত্ব বর্তেছে দুই শিক্ষকের ওপর। কিন্তু এতজনকে একসঙ্গে পুরুলিয়া সদরে নিয়ে যাওয়া আপাত দৃষ্টিতে প্রায় অসম্ভব। তবে স্বাস্থ্যদফতর কেন গ্রামে গিয়ে কৃমির ওষুধ খাওয়াবে না, সে প্রশ্ন তোলার অধিকারও গ্রামবাসীদের নেই বলেই মনে হল।

    গ্রাম পেয়েছে একমাত্র টিউবওয়েল, স্বাধীনতার ৭৩ বছর পর

    মাধুকরী শিক্ষাপ্রাঙ্গণ জন্ম নেওয়ার পর কেন্দঘুঁটু গ্রামে শহরের লোকজনের যাতায়াত বেড়ে যায়। গ্রামবাসীদের অবাক করেই গতবছর সরকারি খরচে বসে গ্রামের প্রথম টিউবওয়েল।  এতদিন গ্রাম থেকে তিন কিলোমিটার দূরে গিয়ে প্রাকৃতিক প্রস্রবণ ‘বুড়বুড়ি’ থেকে পানীয় জল নিয়ে আসতে হত। কাদামাখা ও পানের অযোগ্য জল পান করে কীভাবে গ্রামবাসীরা এতবছর কাটিয়েছেন ভাবতে অবাক লাগে।

    তিন কিলোমিটার দূরের এই ‘বুড়বুড়ি’র নোংরা জল খেতে বাধ্য হত কেন্দঘুঁটু

    অযোধ্যা হিলটপ থেকে গ্রামে আসার ৯৯ শতাংশ পথই কাঁচা ও দুর্গম। গ্রামে ঢোকার রাস্তার ফুট পঞ্চাশেক অংশে পড়েছে সিমেন্টের প্রলেপ। যার সামনেও মাটির রাস্তা, পিছনেও মাটির রাস্তা। সিমেন্ট বাঁধানো ক্ষুদ্র অংশটুকুকে পাঁচিলহীন জমিতে বসিয়ে দেওয়া গেটের মতোই হাস্যকর ও বিসদৃশ লাগে বহিরাগত চোখে।

    তবুও এই হতদরিদ্র গ্রামেই আদর্শ বিদ্যালয় গড়তে চাইছেন মাধুকরী ট্রাস্টের সদস্যরা। স্কুলের ব্যাপারে সরকারি সাহায্য চাইছেন। স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধান মুকুন্দ মুর্মুর সাহায্য চাইবেন, সাহায্য চাইবেন এমএলএ নেপাল মাহাতোর। স্কুলটি সরকারি সাহায্য পেলে দুই শিক্ষককেও যেন সেই স্কুলে নিয়োগ করা হয় তার দাবিও জানাবেন। কারণ এঁদের দুজনের নিরলস পরিশ্রমের ফলেই আজ মাধুকরী শিক্ষাপ্রাঙ্গণ স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে।

    ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দুই শিক্ষক,শক্তিপদ কিস্কু (ডান দিকে) ও অজিত বেসরা (বামে)

    সাহায্য চাইবেন সাধারণ মানুষদের কাছেও। তবে মাধুকরী ট্রাস্ট সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে সাহায্য হিসেবে টাকা চায় না শুনে একটু অবাক হয়েছিলাম। ওঁরা অকপটে বলেছিলেন,সবে আমরা হাঁটতে শুরু করেছি, টাকা নিয়ে সামলাতে পারব না। তবে স্কুলের যা যা দরকার শুভানুধ্যায়ীরা তা নিজে সরাসরি স্কুলে গিয়ে দিয়ে আসতে পারেন। তাঁরাই সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন। কেউ যদি সময়ের অভাবে যেতে না পারেন, তখন তাঁরা সামগ্রী স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসবেন।

    গ্রামে ঢোকার আগে শিকারী মান্ডির বাড়ি। মধ্যবয়স্ক শিকারী মান্ডি আমাকে দেখে সরকারি লোক ভেবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। সব জেনে খাটিয়ায় বসতে বললেন। কিছুই জোটেনি শিকারীর জীবনে। সরকার নজর দেয়নি তাঁদের দিকে। গ্রামে বিদ্যুৎ এলেও তাঁর বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। সম্বল বলতে কয়েকটি কাঁসার বাসন।

    শিকারী মান্ডি বললেন, ভগবান মাটিটা ভালো দিয়েছেন বলে রক্ষে।মাটি লাল হলেও জল ধরে রাখতে পারে। জলসেচ ছাড়াই মাটিতে ফসল হয়। বিশেষ করে টমেটো আর সর্ষে। তবুও তাতে সংসার চলে না। জঙ্গলে যেতে হয় শিকার করতে আর কাঠ কাটতে। খাটিয়ার পাশে বসে রোদে পিঠ দিয়ে ভাত খাচ্ছিলেন শিকারী মান্ডির স্ত্রী। তিনি আমার দিকে একবারও মুখ তুলে তাকাননি। কচু জাতীয় তরকারি ভাতে মেখে খেতে খেতে বেশ রাগত স্বরে স্বামীকে বললেন, “কী হবে ওসব বলে? তোমার জীবন তো শেষ”।

    শিক্ষকদের সঙ্গে মাধুকরী শিক্ষা প্রাঙ্গণের পরিচালকরা

    টুরিস্ট আসে যায়, আঁধারে মুখ লুকায় কেন্দঘুঁটু

    কাছেই অযোধ্যা হিলটপ। সেখানে টুরিস্টদের নিয়ে একের পর এক গ্রাড়ি এসে থামছিল। পোর্টেবল স্পিকারে গান বাজছিল। আনন্দমুখর পরিবেশ। পাহাড়ের ঢালে থাকা হোটেলের পিছনের লনে কাঠ জ্বালনের গনগনে আঁচে ফুটছিল পর্যটকদের জন্য বানানো দিশি মুরগী। দ্রুত শুন্য হয়ে যাচ্ছিল বিলিতি মদের বোতল। এক বোতল বিলিতি মদের যা দাম তার চেয়ে কম টাকায় আজ দুপুরে খিচুড়ি খেয়েছে মাধুকরী শিক্ষা প্রাঙ্গণের ৪২ জন বাচ্চা। মুড়ি আকৃতির ১৮ টাকা কেজির চালে বানানো ফুটন্ত খিচুড়ি সাপটে খাচ্ছিল বাচ্চাগুলো। দ্বিতীয়বার নিচ্ছিল না, ওরা চাইছিল সবাই আগে পাক। বুঝলাম ওদের পারস্পরিক বন্ধন জঙ্গলের গাছেদের মতোই ঘন।

    মাধুকরী শিক্ষা প্রাঙ্গণে মাঘের পড়ন্ত বিকেলের রোদ এসে পড়েছে। শাল গাছের ছায়াগুলো ক্রমশ গ্রামকে ঢেকে ফেলছে। পুরুলিয়া স্টেশনে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাবুলাল মান্ডির গাড়ি এসে গেছে। গাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছি, হঠাৎ হাঁটুর পিছনের প্যান্টে টান। দেখি, সকাল থেকে আমার সঙ্গে আড়ি করে থাকা তিনফুটের নির্মতি সরেন।

    তখন আড়ি করে দিয়েছিল নির্মতি সরেন (কমলা সোয়েটার)

    বয়েস খুব বেশী হলে চার বছর হবে। স্কুলের ফ্রকটা সাইজে বড় হওয়ায় নির্মতির শরীরে সেটি মাটি ছোঁয়া ঘাঘরা হয়ে গেছে। চলে যাওয়ার আগে ভাব করতে এসেছে নির্মতি। মাটির দিকে তাকিয়ে বলল,“আবার আসি” (আবার আসিস)। বাংলা না জানা নির্মতিকে কেউ বলে দিয়েছিল হয়তো। পড়ন্ত বিকেলে নির্মতির কাজল কালো চোখের তারায় আমি উদীয়মান সূর্যের ঝিলিক দেখেছিলাম। সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল এটাই সত্যিকারের ভারত। আমি ভীনগ্রহবাসী কোনও জীব।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More