সংক্রমণ রুখতে চাই পরিচ্ছন্নতা, চারপাশ তো বটেই নিজেকে কীভাবে সাফসুতরো রাখবেন টিপস দিলেন বিশেষজ্ঞ

বর্তমান বিশ্বে আতঙ্ক তৈরি করেছে যে মারণ ভাইরাস তাকে মহামারী হয়ে ছড়িয়ে পড়া থেকে আটকাতে হলেও সেই হাইজিনই প্রথম কথা। নিজের চারপাশ তো বটেই নিজেকেও সাফসুতরো রাখতে হবে সবসময়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সঞ্জীব আচার্য

    কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

    সুস্থ ও সুরক্ষিত জীবনের চাবিকাঠিই হল পরিচ্ছন্নতা। ঘর-গেরস্থালি, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ তো বটেই, সুস্থ শরীরের জন্য নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাটা সবচেয়ে আগে জরুরি। অপরিচ্ছন্ন জায়গা মানেই সেখানে মনের সুখে বাসা বাঁধতে পারে জীবাণুরা। বেশিরভাগ সংক্রমণ ছড়ায় নোংরা, অপরিচ্ছন্ন জায়গা বা অপরিষ্কার জামাকাপড় থেকে। হাইজিনের অভাব রয়েছে যেখানে সেখানেই আড়েবহরে বাড়তে পারে জীবাণুরা। মাত্র ৮ ঘণ্টায় যে কোনও সংক্রামক জীবাণু বেড়ে এক কোটি ৭০ লক্ষে পৌঁছতে পারে। ছড়িয়ে পড়তে পারে একটা বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে। কাজেই সংক্রামক রোগকে রুখতে হলে সবচেয়ে আগে পরিচ্ছন্নতার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

    বর্তমান বিশ্বে আতঙ্ক তৈরি করেছে যে মারণ ভাইরাস তাকে মহামারী হয়ে ছড়িয়ে পড়া থেকে আটকাতে হলেও সেই হাইজিনই প্রথম কথা। নিজের চারপাশ তো বটেই নিজেকেও সাফসুতরো রাখতে হবে সবসময়। দিনে কয়েকবার জামাকাপড় বদলানো, হাত-পা পরিষ্কার রাখা, বারে বারে হাত সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে ধুয়ে ফেলা, চুল, দাঁত, নখ পরিষ্কার রাখা। বাড়ির দরজা, জানলা, মেঝে, বিছানা এগুলো তো পরিষ্কার রাখতেই হবে।

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা , ইউনেসকো বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করে এখনও পর্যন্ত মানুষকে ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন করতে পারেনি। নির্মল পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে নিজেকে দিয়েই পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করা উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষা বলছে, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, আবর্জনার স্তূপ, নোংরা নিকাশি নালা থেকে জলবাহিত রোগে আক্রান্তদের মধ্যে শিশুদের আধিক্য বেশি। জলবাহিত রোগের মধ্যে অন্যতম হল কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েড প্রভৃতি। কাজেই যে কোনও সংক্রমণ রুখতে হলে পরিচ্ছন্নতাই প্রথম ও শেষ কথা।

    পরিচ্ছন্নতার কারণেই অনেক রোগমুক্তি হয়। কী কী সুবিধা মেলে—১) শরীর থেকে রোগ-জীবাণু নির্মুল করা যায়, ২) শরীরের দুর্গন্ধ দূর হয় ৩) স্ট্রেস ফ্রি লাগে, পেশির ক্লান্তি দূর হয়, ৪) ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়ে, ৫) অনেক বেশি তরতাজা ও ঝকঝকে লাগে, ৬) আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়ে।

    অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পেটের রোগে আক্রান্ত হয়ে ফি বছর ২০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়

     

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষা বলছে, বিশ্বজুড়ে ১০০ কোটির বেশি মানুষ পরিষ্কার জল পায় না। ২০০ কোটির কাছাকাছি মানুষ নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করে। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে অন্তত ২০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় জলবাহিত পেটের রোগে ভুগে। তার মধ্যে পাঁচ বছর বয়সের নীচে শিশুদের মৃত্যুহার বেশি। এর পিছনে মানুষের সচেতনতার অভাব অনেকাংশেই দায়ী। চারপাশের পরিবেশ নোংরা করে রাখা, মলমূত্র ইত্যাদি থেকে ক্ষতিকর জীবাণু ছড়ায়। নালার জলে বা পুকুরের আবদ্ধ জল ব্যবহারে জলবাহিত রোগ যেমন হয় তেমনই চর্ম রোগও হয়। নোংরা জল ব্যবহার করার ফলে মহিলাদের ফাঙ্গাল, ব্যকট্রিয়াল, প্রোটোজুয়াল রোগ হয়।  নোংরা জল ব্যবহারে পেটের রোগের কারণে শিশু, কিশোর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলেছে।অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস ত্যাগ করার ক্ষেত্রে এখনও আমাদের যথেষ্ট সচেতনতার অভাবই এই মৃত্যুর কারণ বলে স্বাস্থ্য আধিকারিকরা মনে করেন।

     

    পরিচ্ছন্নতার পাঠ শুরু হোক নিজেকে দিয়েই। দেখে নেওয়া যাক কী কী ভাবে নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, টিপটপ রাখবেন।

    মাথা ও চুল পরিষ্কার—

    সপ্তাহে দু’বার অন্তত চুলে শ্যাম্পু করা উচিত। অথবা শিকাকাই দিয়ে চুল ধোওয়া উচিত। পরিষ্কার চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ান।


    চোখ, নাক, কান পরিষ্কার-

    দিনে কয়েকবার পরিষ্কার জল দিয়ে চোখ ধোওয়া উচিত।

    সপ্তাহে একবার কটন বাড দিয়ে কান পরিষ্কার করা ঠিক হবে। তবে বেশি খোঁচাখুঁচি নয়, সাবধানে কান পরিষ্কার করা উচিত।

    নাকে যেন ময়লা না জমে সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। পরিষ্কার জল, কাপড় নিয়ে নাক পরিষ্কার রাখুন। ছোট বাচ্চাদের সর্দি হলে, তাদের নাকও পরিষ্কার রাখা উচিত।


    মুখ পরিষ্কার রাখতেই হবে-

    দিনে দু’বার ব্রাশ করা বাধ্যতামূলক। একবার ঘুম থেকে ওঠার পরে, আর একবার রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে।

    খাবার খাওয়ার পরে ভাল করে মুখ ধোওয়া উচিত। তা না হলে দাঁতের ফাঁকে খাবার জমে সেখানে জীবাণু তৈরি হয়। যার থেকে দাঁতের ক্ষয়, ক্যাভিটি, মাড়ি থেকে রক্তপাত সবই হতে পারে।

    পুষ্টিকর খাবার খাওয়া অবশ্যই উচিত। কম মিষ্টি জাতীয় খাবার, চকলেট, আইসক্রিম, পেস্ট্রি বা জাঙ্ক ফুড একেবারেই নয়।

    দাঁতের যে কোনও সমস্যায় অভিজ্ঞ ডেনটিস্টের পরামর্শ নেওয়া দরকার।


    ত্বকের যত্ন—

    প্রতিদিন সাবান বা ভাল বডি সোপ দিয়ে স্নান করা দরকার। তা নাহলে রোমকূপে ঘাম জমে সেখানে থেকে শরীরে দুর্গন্ধ ছড়ায়। যার থেকে সংক্রমণ খুব তাড়াতাড়ি ধরতে পারে।

    সাবানের বিকল্প হতে পারে নিম। নিমের রস বা নিম পাতা বাটা দিয়ে ত্বকের যত্ন নেওয়া যেতে পারে। এতে ত্বকে বাসা বাঁধা ক্ষতিকর জীবাণু নাশ হয়। নিমের সঙ্গে হলুদও খুব উপযোগী। হলুদ একে অ্যানটিসেপ্টিক, তার উপর তেলতেলে ত্বকের যত্নে এর প্রভাব বেশ অনেকটাই। ভেষজ গুণ থাকায় ঘরোয়া ফেসপ্যাকেও মেশানো যায়।


    হাত পরিষ্কার রাখা জরুরি—

    বারে বারে হাত ধোওয়ার অভ্যাসটা খুবই জরুরি। খাবার খাওয়ার পরে, যে কোনও সামান্য কাজই হোক তার পরে সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলা জরুরি। কারণ সেই হাতই আমরা বেশিরভাগ সময় নাকে, মুখে দিয়ে থাকি। এভাবেই সংক্রমণ ছড়ায়।

    নখ পরিষ্কার রাখা দরকার। নিয়মিত নখের যত্ন নিতে হবে।

    বাড়িতে ছোট বাচ্চা থাকলে তার হাত পরিষ্কার রয়েছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে।

    মলমূত্র, রক্ত, বা লালা-থুতু এগুলো কখনওই হাত দিয়ে পরিষ্কার করবেন না। যদিও কোনও কারণে হাত দিতেই হয়, তাহলে সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে ভাল করে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে।


    গোপন অঙ্গকে হেলাফেলা নয়–

    নারী-পুরুষ সকলই তাদের গোপন অঙ্গের যত্ন নিতেই হবে।

    ঋতুস্রাবের সময় মহিলাদের পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। দিনে অন্তত দুবার স্যানিটারি ন্যাপকিন বদলাতে হবে।

    মহিলাদের সাদা স্রাব হলে সঙ্গে সঙ্গেই স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

    সেক্সের সময় অবশ্যই কন্ডোম ব্যবহার করা উচিত। সঙ্গমের আগে ও পরে যৌনাঙ্গ পরিষ্কার রাখতে হবে।

     

    সাফসুতরো থাক রান্নাঘর–

    রান্নাঘর অপরিষ্কার রাখলে সেখান থেকে সংক্রামক রোগ ছড়ায়। কাজেই কয়েকটা টিপস মেনে চলতেই হবে।

    রান্নার গ্যাস, জায়গা ও বাসনপত্র পরিষ্কার রাখুন।

    পচা ও বাসি খাবার একেবারেই নয়।

    রান্নার আগে ভাল করে নিজের হাত পরিষ্কার করা উচিত।

    কাঁচা আনাজ, মাছ, মাংস ভাল করে ধুয়ে তবেই রান্না করা উচিত।

    খাবার রেখে দেওয়ার সময় পরিষ্কার পাত্রে ঢেকে রাখা উচিত।

    রান্নাঘরে জমা বর্জ্য প্রতিদিন পরিষ্কার করা উচিত।

    প্যাকেটজাত খাবার কিনলে লেবেলে তারিখ দেখেই কিনুন। সময় পেরিয়ে যাওয়া জিনিস কিনে নিজের ক্ষতি করবেন না।

    মেডিক্যাল হাইজিন

    ক্ষতস্থান ভাল করে পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করতে হবে।

    ওষুধ কেনার সময় এক্সপায়ারি ডেট দেখেই তবে কিনুন।

    অপ্রয়োজনীয় ও মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া ওষুধ জমা করে রাখবেন না।

    ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ কেনা ঠিক হবে না।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More