চিন চিরকালই আগ্রাসী, শক্তিধর তো বটেই! তাই সুচিন্তিত প্রতিরোধ জরুরি

এই পরিস্থিতিতে নিজস্ব সীমা নিয়ে যে ভারত রয়েছে, তাকে কখনওই ক্ষমতা হিসেবে উঠতে দেবে না চিন। ভারতকে দাবিয়ে রাখাটাই তাদের উদ্দেশ্য।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

কৌশিক রায়

ভারত-চিনের ঝামেলার সূত্রপাত আজকে নয়। ১৯৪৮ সালে যখন মাও সে তুং-এর ‘পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না’ প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই সময় থেকে ভারতকে নিয়ে তাদের তরফে নানা অসুবিধার উদয় হয়। মূলত যে সমস্যা বারবার সামনে আসে, তা হল ম্যাকমোহন লাইন, যেটা কখনওই মানতে চায়নি চিন। ব্রিটিশদের তৈরি করা এই সীমান্ত তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বলে মনে করেছিল চিন। স্বাধীন ভারতের এই লাইন সংশোধন করা উচিত বলে বারবার দাবি করেছিল।

১৯১৪ সালে সিমলা চুক্তির মাধ্যমে, স্যার হেনরি ম্যাকমোহনের নামে ভারত ও চিনের মধ্যেকার আইনি সীমানা চিহ্নিত হয়। স্বাধীনতার পরেও জওহরলাল নেহরু এটাকেই বর্ডার হিসেবে দেখেন এবং মানেন। বস্তুত, ব্রিটিশরা আসার আগে ভারত বা চিনের ফ্রন্টিয়ার বলে কিছু ছিল না। সীমান্ত বলতে স্পষ্ট ধারণা ছিল না। এশিয়ায় ফ্রন্টিয়ার ধারণাটা নিয়েই আসে ঔপনিবেশিকরা।

এই পরিস্থিতিতে নিজস্ব সীমা নিয়ে যে ভারত রয়েছে, তাকে কখনওই ক্ষমতা হিসেবে উঠতে দেবে না চিন। ভারতকে দাবিয়ে রাখাটাই তাদের উদ্দেশ্য। এটা ভারত বলে নয়, অন্য কোনও এশিয়ান দেশেরই আর্থসামাজিক উত্থান মেনে নিতে পারে না চিন। স্বভাবগত ভাবেই পারে না। রাশিয়ারও যে বর্ডারটা এখন চিনের সঙ্গে আছে, সেটাও জোর করে চাপিয়ে দেওয়া বলেই দাবি। শুধু তাই নয়, তাইওয়ান বা হংকংকেও মানতে চায় না চিন। জাপান নিয়েও তার সমস্যা। ফলে আজ ভারতে চিনের সেনা ঢোকা নিয়ে এত গোলযোগ হলেও, সমস্যা একা ভারতের নয়।

এমনকি আরও খুঁটিয়ে দেখতে গেলে, আদতে ভারতের সঙ্গে যে সীমান্ত সমস্যা, সেটা যতটা না সত্যিই সমস্যা সৃষ্টিকারী, তার চেয়েও বেশি করে চিন সেটার অপব্যবহার করে, যাতে ভারতের অবস্থান প্যান-এশিয়ান ক্ষমতার রাজনীতিতে নীচের দিকে থাকে।

তবে এর জন্য ভারতের দিক থেকে কখনওই কোনও দায় বা প্ররোচনা ছিল না বললে ভুল হবে। চিনে সিপিসি ক্ষমতায় আসার আগে ভারতের ক্ষমতার মূলে ছিল জাতীয় কংগ্রেস। চিন নিয়ে তাদের যথেষ্ট রোম্যান্টিসিজম ছিল। তার কারণও ছিল। আসলে ঔপ্যনিবেশিকতার বিরুদ্ধে জন্ম নেওয়া লড়াইয়ে চিনকে বন্ধু ভাবত ভারত। ভাবত, ভারত স্বাধীন হলে চিন তার বন্ধু হতে বাধ্য, কারণ পাশ্চাত্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা হাত ধরবে।

সেই সময়ে এমন ভাবনাটা যে একেবারেই অমূলক ছিল, তা নয়। তবে দু’জন এটা মানতেন না কখনও। প্রথম জন সুভাষচন্দ্র বসু। তিনি বলতেন, ভারত ও চিনের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা আসতে বাধ্য। কারণ মাওয়ের চিন্তাধারায় পুষ্ট চিন কখনও ক্ষমতার লোভ ছাড়বে না। দ্বিতীয় জন ছিলেন সর্দার বল্লভভাই পটেল। তিনি মৃত্যুর আগে জওহরলাল নেহেরুকে একটি চিঠি লিখেও এ বিষয়ে সাবধান করেছিলেন। বলেছিলেন, চিনকে এত হাল্কা ভাবে নেওয়া ঠিক হচ্ছে না। ভারত-চিনের সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়াতে হবে।

চিনের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য ছিল হান সাম্রাজ্য। ভারতের মৌর্য সাম্রাজ্যের সমসাময়িক এই সময়ে মধ্য এশিয়া ছাড়িয়ে বার্মা, নেপাল, ভিয়েতনামকে নিয়ন্ত্রণ করত চিন। মাও সে তুং-এর নতুন রেড চায়না সেটাই দাবি করে বসল যেন। তাই তখন থেকেই তার ভিয়েতনামের সঙ্গে যুদ্ধ, বার্মার সঙ্গেও যুদ্ধ। সময় ও রাজনীতির বদল হলেও আগ্রাসী সেই মনোভাবের বদল হল না। একসময়ে তো ভারতের মৌর্য সাম্রাজ্য আফগানিস্তান নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু তাই বলে আজ যদি ভারত সেই ধারণা নিয়ে বসে থেকে ভাবে আফগানিস্তানও ভারতেরই অংশ, তা তো সত্যি নয়!

তিব্বত ছিল চিনের অধীনে, সেমি-অটোনমাস দেশ। তৎকালীন নেপাল, সিকিম, ভুটান– এই প্রদেশগুলিও তাদের ছিল। আবার নেপালের অধীনে ছিল কোচবিহার, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল। তবে সে ইতিহাস পার করে এসে সমাজ-রাজনীতি নতুন করে গঠন হয়েছে। সময়ের দাবিতেই চূড়ান্ত সীমান্ত চেয়েছিলেন নেহেরু। চিন মানেনি কখনও।

সেই সময়ে ভারতের দুটো মতামত ছিল। একটি হল, চিনের পক্ষে– যাঁরা মনে করতেন কালচারাল ব্রিজ তৈরি হওয়া সম্ভব দুই দেশে। সে চেষ্টা চলেছিল নানা ভাবে। সে দেশে গিয়ে স্বয়ং রবি ঠাকুরও উষ্ণ অভ্যর্থনাও পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। তবে এটাও ঠিক, রবি ঠাকুর সেখানে একটি বক্তৃতায় চিনা সভ্যতা এবং ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি সমকক্ষ বলে উল্লেখ করলে, তা নিয়ে ক্ষুব্ধ হন স্বয়ং মাও সে তুং, চরম জাতীয়তাবাদী মনোভাবের পরিচয় দেন ও প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ করেন। শোনা যায়, এ বিষয়টি নেহেরুর কাছে খুলে বলেননি রবীন্দ্রনাথ। এই আচরণ আড়াল করে গিয়ে, পরোক্ষে খানিক ভুল পথেই চালিত করেছিলেন ভারতীয় রাজনীতিকে। সেই সময়ে নেহেরুর সমর্থনেই চিনের রাষ্ট্রপুঞ্জে স্থান পাওয়া সহজ হয়ে যায়।

তাই সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের পাশাপাশিই চলতে থাকে চিন-ভারতের অর্থনৈতিক লেনদেন। যদিও ভারত শুধুই আমদানি করে চিন থেকে, এ দেশের জিনিস চিনে যায় না। এমন একটা পরিস্থিতি, চিনের থেকে আসা জিনিস বন্ধ করা যাবে না, তবে আরও অবাধে ঢুকতে দিলে ভারতের বাজার পুরো খেয়ে ফেলবে চিন। এই বিষয়টিও মাথায় রাখা জরুরি। একইসঙ্গে এটাও মাথায় রাখতে হবে, বাণিজ্যিক আদানপ্রদান থাকা মানেই যে যুদ্ধের সম্ভাবনা মিলিয়ে গেল, তা নয়। জার্মানি ও রাশিয়া (১৯৪১) অথবা চিন এবং আমেরিকা এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। বাণিজ্য বা অর্থনীতি দিয়ে যুদ্ধ আটকানো যায় না। এখনও তেমনটাই ঘটছে।

তার উপর চিন বরাবর অধিগ্রহণে বিশ্বাসী। গোটা দুনিয়াটাকেই ওদের বলে দাবি এবং বিশ্বাস দুই-ই করে। ১৯৫০-এর মাঝামাঝি চিনকে বিপজ্জনক হিসেবে প্রথম বোঝে ভারত। জানা যায়, নেহেরু এই সময়ে গোপনে দার্জিলিং, ঘুম এসব জায়গায় সিআইএ মোতায়েন করেন। চিনের বিরুদ্ধে তিব্বতের যোদ্ধাদের সাহায্য করতে থাকেন গোপনে। এর বদলা হিসেবে নর্থ-ইস্টের জঙ্গি সংগঠনগুলোকে টাকা দিতে থাকে চিন।

১৯৫০-এর পর থেকে ঘনিয়ে ওঠা আগ্রাসনের মেঘে যুদ্ধ যখন আসন্ন, ঠিক তার আগে তৎকালীন চিনা প্রধানমন্ত্রী চৌএন লাই প্রস্তাব দেন, লাদাখ পেয়ে গেলে অরুণাচলের উপর থেকে অধিকার সরিয়ে নেবে তারা। স্বাভাবিক ভাবেই নেহেরু মানেননি। এদিকে উপায় না দেখেই তখন দেশের সেনাখাতে খরচ অনেক কম। কৃষি-শিল্পে জোর দিতেই হতো। এই অবস্থায় সীমান্ত সমস্যা অনেকটাই আড়াল করলেন নেহেরু। সাধারণ মানুষের সামনে আনলেন না সবটা।

কিন্তু ১৯৬১ সাল থেকে দেশে এই ইস্যুতে নেহেরু-বিরোধিতার হাওয়া উঠল। অভিযোগ উঠল, সরকার ভীতু। নেহেরু জবাব দিক পার্লামেন্টে। একটা সময় পরে চাপের মুখে পড়ে নেহেরু বলে বসেন, “আমি ভারতীয় সেনাকে নির্দেশ দিয়েছি, চিনা সেনাদের ছুড়ে ফেলে দিতে।”

এর পরেই শুরু হয় ১৯৬২-র যুদ্ধ। আধুনিক কোনও অস্ত্র ছিল না ভারতের। কার্যত গোহারা হেরে যায় তারা। তবে একটাই ভাল ব্যাপার হয়, চিনের মুখোশ খুলে যায়। এ দেশেও সামরিক খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়। এরই মধ্যে ১৯৬৭ সালে প্রথম পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফেলে চিন। যদিও নেহেরুর বন্ধু ও বিজ্ঞানী হোমি ভাবা আগেই বলেছিলেন এ দেশে পরমাণু বোমা বানাতে, তবে তৎকালীন অর্থনীতি দিয়ে তা সম্ভব হয়নি। ফলে চিনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমেরিকার কাছে সামরিক সাহায্য চাইল ভারত। কিন্তু আমেরিকা তখন চিনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রাশিয়াকে বার্তা দেবে ভেবেছিল।

১৯৬২-র চিন যুদ্ধে হারার পর থেকে ভারতের যে কোনও রাজনৈতিক দলই চিনকে নিয়ে সচেতন হয়ে গেছিল। চিনকে ঠেকিয়ে রাখার দিকে নজর রাখা শুরু হয়। এখনও সেটাই চলছিল, যা সম্প্রতি গন্ডগোলের আকার ধারণ করেছে। লাদাখের প্যাংগং লেকের প্রান্ত বরাবর চিনা প্রহরা নতুন নয়। কিন্তু সমস্যা নতুন করে উস্কে যায় ভারতে মোদী ক্ষমতায় আসার পরে। ভারতের উপর দিয়ে চিন যে সিল্ক রুটের প্রস্তাব দেয়, তাতে বাধা পেয়ে চিন ক্ষুব্ধ হয়। অন্য দিকে নয়াদিল্লির ‘লুক ইস্ট’ পলিসির কারণে জাপান, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া– এই দেশগুলি ভারতের বন্ধু হয়। চিনের শত্রুদেশ বলেই পরিচিত তারা।

ফলে স্বাভাবিক ভাবেই পাকিস্তান, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কাদের সঙ্গে নিয়ে ভারতকে দাবিয়ে রাখতে চাইছে চিন। পাকিস্তানে ঘাঁটি গেড়েছে, শ্রীলঙ্কায় নৌসেনা মজুত করেছে। বাংলাদেশকেও সঙ্গে নিতে চাইছে। চিনের জন্য আবার ভারত মহাসাগরও খুব দরকারি বিষয়। কারণ তেলের খনি অবধি তাদের পৌঁছতে হবে। ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলিকে তাই সঙ্গী করতে চাইছে চিন।

সাম্প্রতিক রাগের আরও একটা কারণ আছে। ভারত খানিকটা আমেরিকার দিকে ঝুঁকছে। মোদী-ট্রাম্পের বন্ধুত্ব বারবার সামনে এসেছে। এটায় সম্যক সমস্যা দেখছে চিন। তাই সব মিলিয়ে এইসব রাগ থেকেই নতুন করে ঝাঁপ ভারতের উপর।

এই অবস্থায় ভারত চিনকে চটাতেও পারছে না সরাসরি। কারণ সত্যি যুদ্ধ হলে ভারতের জন্য তা চাপ হতে পারে। সীমান্তে ডিএসক্যালেট করার চেষ্টা, আলোচনা চলছে তাই। এটাও আবার চিনের একটা চাল। আলোচনার মাঝে জমিতে ঢুকে পড়তে ওস্তাদ তারা। এছাড়া চিনের ভৌগোলিক সুবিধা অনেক বেশি। ওদের দিকটা বেশ উঁচু, পাহাড় থেকে নেমে এসে আক্রমণ করবে ওরা। আমাদের করতে হবে উঠে গিয়ে। মানচিত্র দেখলে আর একটা জিনিস চোখে পড়বে, সীমান্ত ঘেঁষে চিনের জনসংখ্যা খুব কম। ক্ষয়ক্ষতি কম হবে। কিন্তু চিন আক্রমণ করলে ভারতের সীমান্তের মানুষগুলি বড় বিপদে পড়বে। এছাড়া, ভারতের হিমালয়ে রাস্তা বানাতে গেলেই ধস নামছে, ফলে ভারতের যোগাযোগের অসুবিধা থেকে যাচ্ছে। এখানেও চিন এগিয়ে আছে।

ফলে যুদ্ধ কোনও সমাধান নয় এই পরিস্থিতিতে। কিন্তু আমরা নিজেদের দেশের অংশের অধিকার অবশ্যই ছেড়েও দিতে পারব না। ফলে ঠেকিয়ে রাখতে হবে চিনকে। ভয়টা বজায় রাখতে হবে।

সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশের যে বক্তব্য, ‘বদলা নিতে হবে, চিনকে মারতে হবে’– এটা আসলে শুনতে ভাল লাগলেও, বাস্তবিক সমাধান নয়। ‘একটা মারলে পাঁচটা মারব’ পরিস্থিতি নেই। পঞ্চাশটা আমাদের মরতে পারে, সেটা মাথায় রাখতে হবে। ফলে কূটনৈতিক ভাবে চিনকে সুচিন্তিত ভাবে নিয়ন্ত্রণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের তরফে সীমান্তে এসক্যালেট না করাই বাঞ্ছনীয়। চিন করলে আমরা অবশ্যই ঠেকাব। তবে সাধারণ মানুষের উত্তেজনার কারণে সংবাদমাধ্যম প্রভাবিত হলে, তার প্রতিফলন সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনার ক্ষেত্রে পড়লে, তা এই মুহূর্তে দেশের জন্য মঙ্গল হবে না।

(লেখক সমর ইতিহাসবিদ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, নরওয়ের পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক। মতামত তাঁর ব্যক্তিগত।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More