সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৩

বাড়ি পেল অনাথ ‘বট’, দত্তক নিল রাজগঞ্জের স্কুল, ‘চড়াই-বাড়ি’তে এ বার গাছ-ব্যাঙ্ক বানাতে চলেছেন কুন্তল

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাপের ঘর থেকে আদরের ‘বট’ গেল অন্য ঘরে। নতুন পরিবেশ, নতুন সংসার। দু’হাত বাড়িয়ে তাকে ঘরে তুলে নিলেন নতুন বাপ-মায়েরা।

চড়াই-বাঁচাও অভিযানের মুখ জলপাইগুড়ি বামন পাড়ার কুন্তল ঘোষ ফেসবুকে আর্জি জানিয়েছিলেন, তাঁর বাড়িতে জন্ম নেওয়া একটা ফুটফুটে বটের চারার জন্য উপযুক্ত আশ্রয় খুঁজছেন তিনি। সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসেন  রাজগঞ্জ বন্দর গার্লস হাইস্কুলের টিচার ইনচার্জ অনিন্দিতা ঝা। তাঁর উদ্যোগেই স্কুল প্রাঙ্গণে নতুন করে ঘর বানানো হয় সেই বট চারার। স্কুল কর্তৃপক্ষ থেকে শিক্ষিকা, পড়ুয়াদের উচ্ছ্বাসে, অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঘরে তোলা হয় কুন্তলের আদরের বটকে। চারা রোপণ করেন আর এক শিক্ষিকা ইন্দ্রানী রায়। তিনি বলেছেন, “আজ আমি অবসর নিচ্ছি স্কুল থেকে। আমার হাত দিয়েই এই চারা রোপণ করা হলো। আমি গর্বিত।”

কুন্তল-পিয়ালীর বাড়ি থেকে বট চলল তার নতুন ঠিকানায়

বট চারা দত্তক নেওয়ার আবেদন আরও একজন জানিয়েছিলেন বটে, তবে স্কুলের হাতেই বট চারার দায়িত্ব দিতে রাজি হন কুন্তল। জানিয়েছেন, বাড়ির ছাদে একরত্তি এই বট চারাই তাঁর নয়নের মণি হয়ে উঠেছিল। নিয়মিত যত্ন করে বড় করছিলেন তাঁকে। যদিও তিনি জানতেন, বটের সেই চারা আড়েবহরে বেড়ে ফাটল ধরিয়ে দিতে পারে তাঁর বাড়ির দেওয়ালেই। অথচ বট গাছ পোঁতার উপযুক্ত জায়গা নেই তাঁর বাড়িতে। তাই চারা তুলে মাটি ভরে রেখে দিয়েছিলেন নিজের কাজেই।  অনেকটা কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার মতোই, সেই গাছের উপযুক্ত সমঝদার খুঁজে চলেছিলেন তিনি।

রাজগঞ্জ স্কুলের টিচার ইনচার্জ অনিন্দিতা ঝায়ের কথায়, “কুন্তলের স্ত্রী পিয়ালী আমাদেরই সহকর্মী। তাঁদের গাছ-বাঁচানোর এই প্রচেষ্টাকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি। তাঁদের আদরের বট এখন আমাদের স্কুলের গর্ব।”

আরও পড়ুন: কুন্তল-পিয়ালীর বাসায় ‘মহাসুখে’ বহুতলে ঘর হারানো চড়াইরা

পরিবেশপ্রেমী কুন্তল ঘোষ ও তাঁর স্ত্রী পিয়ালী দেবনাথ ঘোষের পরিচিতি তাঁদের বহু চর্চিত ‘Sparrow House’ -এর জন্য। নিজেদের বাড়িতেই চড়াইদের চড়াইদের ‘সুখের ঘর’ বানিয়ে দিয়েছেন ঘোষ দম্পতি। ফেলে দেওয়া ঠাণ্ডা পানীয়ের বোতল, ভাঁড়ার ঘরের বাতিল মালসা বা নারকেলের মালা, একেবারে ঘরোয়া উপকরণ দিয়েই চড়াইদের ঘর বেঁধে দিয়েছেন এই দম্পতি। কুন্তলের বানানো ‘বার্ড ফিডার’-এর কথা জলপাইগুড়ির লোকের মুখে মুখে ফেরে। শুধু চড়াই নয় ভোর হতেই কুন্তল-পিয়ালীর বাড়িতে ভিড় জমায় দোয়েল, ফিঙে, কাঠঠোকরা, ঘুঘু, শালিকরা।

কুন্তল এবং পিয়ালী ঘোষ

পাখি, গাছ, পরিবেশের প্রতি এক আত্মীয়তার টান অনুভব করেন। যেখানেই পরিবেশ রক্ষার স্লোগান ওঠে, পৌঁছে যান কুন্তল। জেলার নানা জায়গায় ক্যাম্প করে পাখিদের জন্য ‘বার্ড ফিডার’ তৈরির কৌশলও শেখান তিনি। এলাকার লোকজনকে বাড়িতে বার্ড ফিডার বানানোর পরামর্শ দেন তাঁরা। কী ভাবে বানাতে হবে তাঁর উপায়ও বাতলে দেন। সম্প্রতি প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে বার্ড ফিডার বানাচ্ছেন তিনি। আরও বেশি সংখ্যক পাখিকে আশ্রয় দিতে চান নিজের ‘চড়াই-বাড়ি’তে।

কুন্তল বলেন, একটা বটগাছকে ঘিরেই গড়ে ওঠে ‘ইকোসিস্টেম’ বা বাস্তুতন্ত্র। পশু. পাখির আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে বটগাছ। অথচ তাঁর বাড়িতেই এতদিন গাছ রাখার কোনও জায়গা ছিল না। বটের চারাকে বিদায় দিতে তাঁরও অন্তর কেঁদেছিল। তাই নিজের বাড়িতেই গাছ-ব্যাঙ্ক বানানোর পরিকল্পনা করছেন কুন্তল-পিয়ালী। পাখিদের সঙ্গেই গাছেরাও এ বার নিরাপদ আশ্রয় পাবে তাঁদের বাড়িতে।

আরও পড়ুন:

আমার একটা বটগাছ আছে, রাখার জায়গা নেই, আপনারা কেউ নেবেন?

Comments are closed.