শনিবার, এপ্রিল ২০

প্লাস্টিক-থার্মোকল-বেলুন বাদ, ছোট্ট সানভীর জন্য অভিনব অন্নপ্রাশনের আয়োজন করল ‘সবুজ বন্ধুরা’

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

পরিবেশ হোক দূষণমুক্ত, রাখতে মোদের শরীর সুস্থ।

এই লাইনেই সারা বছর প্রচার চালায় তারা। নিজেদের দায়িত্বে সাফসুতরো রাখে পরিবেশকে। সচেতনতা বাড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে। তা প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করাই হোক, বা বন্যপ্রাণ রক্ষা করা। আরও অনেক পরিবেশপ্রেমী সংগঠনের মতোই নিজেদের সাধ্যমতো লড়াই করে যায় তারা। কিন্তু এই বার তারা ঘটিয়ে ফেলেছে একটা অভাবনীয় ঘটনা। একটা গোটা অনুষ্ঠানবাড়ির আয়োজন করেছে, যেখানে প্লাস্টিক বা থার্মোকলের চিহ্নমাত্র নেই। তাদের দাবি, এমন পরিবেশ-বান্ধব অনুষ্ঠান বাড়ি আগে কখনও আয়োজিত হয়নি।

এমনই পাতা-ফুল দিয়ে সাজানো ছিল প্রবেশ পথ।

তারা তারকেশ্বরের বাসিন্দা, এক দল পরিবেশপ্রেমী মানুষ। সবুজের বন্ধু হিসেবে এলাকার সকলের মধ্যেই পরিচিত। তাদের ভাল নাম, ‘তারকেশ্বর গ্রিন মেটস’। সেই সংগঠনেরই সহ-সভাপতি সুমন আদকের মেয়ে, ছোট্ট সানভীর অন্নপ্রাশন ছিল। সেই অন্নপ্রাশন উপলক্ষেই আয়োজিত হয়েছিল অনুষ্ঠানের। সাজানো হয়েছিল প্যান্ডেল, নিমন্ত্রিত ছিলেন আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব– সকলেই।

সংগঠনের সদস্য কল্যাণ জানালেন, আজকাল কোনও অনুষ্ঠান বাড়ি মানেই কোনও না কোনও ভাবে পরিবেশের ক্ষতি। অসংখ্য জলের বোতল, থার্মোকলের থালাবাটি, সাজানোর থার্মোকল– কী না থাকে। কিন্তু সুমনবাবুর মেয়ের অন্নপ্রাশনে এর সব ক’টিই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে খুব সচেতন ভাবে।

কল্যাণ বলেন, “প্যান্ডেল সজ্জায় ব্যবহার হয়নি কোনও প্লাস্টিক ,থার্মোকল, পলিথিন বা বেলুন। প্রবেশ পথ সাজানো হয়েছিল নারকেল গাছের পাতা আর গাঁদা ফুলের মালা দিয়ে। অনুষ্ঠানবাড়ির ভিতরেও যেটুকু সজ্জা ছিল, তার সবটাই থার্মোকল ও প্লাস্টিক বর্জিত। ছোটো বাচ্চাদের অনুষ্ঠানে বেলুন ব্যবহার করার চল হয়েছে আজকাল, আমরা সেটাও করিনি। পরিবেশের কথা ভেবেই।”

শালপাতা, কলাপাতা, মাটির ভাঁড়ে পরিবেশন।

শুধু তাই নয়। অনুষ্ঠানে খাবার পরিবেশন করা হয়নি থার্মোকল বা প্লাস্টিকের পাত্রে। ব্যবহার করা হয়েছে শালপাতার উপর কলাপাতার প্লেট , মাটির গ্লাস। এমনকী আইসক্রিমও ছিল প্লাস্টিকের কাপের বদলে কাগজের প্লেটে। সঙ্গে কাঠের চামচ। সব শেষে পানমশলা মুড়ে দেওয়া হয় কাগজের খামে, সঙ্গে থাকে কাঠের টুথপিক। অনুষ্ঠানবাড়িতে জোরে জোরে বাজেনি কোনও গান, পোড়ানো হয়নি কোনও বাজি।

মেনুকার্ডেও রয়েছে পরিবেশ রক্ষার ডাক।

কল্যাণ জানান, খাওয়াদাওয়ার মেনুকার্ডে, বা পানমশলা মোড়া খামে– সবেতেই লেখা ছিল পরিবেশ বাঁচানোর বার্তা। মানুষকে সচেতন করতে হাজার প্রচারে যতটা না কাজ হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি কাজ হয় উদাহরণ হয়ে উঠতে পারলে। –এমনটাই মনে করেন সানভীর বাবা তথা সংগঠনের সহ-সভাপতি সুমন আদক। এমন একটি ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পেরে খুশি সানভীর মা নন্দিতা মাইতি-ও।

বাদ যায়নি পানের মোড়কও।

কল্যাণ বললেন, “অনুষ্ঠানে পরিবেশ রক্ষার কথা বললেই, অনেকেই অনেক অজুহাত দেন। কেউ বলেন শালপাতা মিলছে না পর্যাপ্ত, কেউ বা বলেন বোতলে করে জল না দিলে যথাযথ অতিথি আপ্যায়ন হবে না। এ সবের বিপরীতেই আমরা গোটা অনুষ্ঠানটা করে দেখালাম। এক কুচি প্লাস্টিক বা এক টুকরো থার্মোকল ছাড়াও সব কিছু করা যায়।”

এখানেই শেষ নয়। অনুষ্ঠানের পরে বেঁচে যাওয়া খাবার এই সবুজ বন্ধুদের মাধ্যমেই শালপাতায় করে বিলি হয়ে যায় স্টেশন অঞ্চলে বসবাসকারী শিশুদের মধ্যে। তাদের মুখে হাসি ফোটানোটাও সুন্দর পরিবেশেরই অঙ্গ বলে মনে করেন তারকেশ্বর গ্রিন মেটসের সদস্যরা।

কল্যাণের সঙ্গে ছোট্টো সানভী।

“আসলে আমরা দেখাতে চেয়েছিলাম, মানুষ চাইলে সব পারে। এর জন্য খুব পরিশ্রম বা টাকার প্রয়োজন নেই, দরকার শুধু সদিচ্ছা। এমন ইচ্ছা যদি আরও কারও থাকে, কেউ যদি এই ধরনের পরিবেশ বান্ধব অনুষ্ঠান বাড়ি করতে চান কিন্তু পুরোপুরি ভাবে তা করে উঠতে না পারেন, তা হলে আমরা নিজে থেকে সাহায্য করব। অজুহাত সরিয়ে রেখে সকলে মিলে উদাহরণ হয়ে উঠতে পারলে, পরিবর্তন আসতে বাধ্য।”– বলেন সানভীর কাকা এবং সংগঠনের সদস্য, কল্যাণ।

Shares

Comments are closed.