মঙ্গলবার, মার্চ ১৯

‘ফ্লাইট থেকে নেমেই ফোন করবো’ ইথিওপিয়ায় বিমান দুর্ঘটনায় মৃত শিখা গর্গের শেষ মেসেজ আঁকড়ে তাঁর স্বামী সৌম্য

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সকাল ১০টা। ফোনের মেসেজ লিস্ট ঘাঁটতে গিয়ে মুখে হাসি ফুটেছিল সৌম্যের। স্ত্রী লিখেছিলেন,‘‘ফ্লাইটে উঠে গেছি। ল্যান্ড করার পরেই তোমাকে জানাচ্ছি।’’

এর পরের অপেক্ষা মাত্র ১৫ মিনিটের। তার মধ্যেই ওলট পালট হয়ে গিয়েছিল সবকিছু। স্ত্রীর পাঠানো মেসেজের উত্তর টাইপ করছিলেন সৌম্য। লেখার মাঝেই বেজে উঠেছিল ফোন। ও পারের কণ্ঠস্বর বলেছিল, ‘‘আপনার স্ত্রী যে বিমানে উঠেছিলেন, সেটা ভেঙে পড়েছে। সম্ভবত তিনি বেঁচে নেই।’’

ফোনের ও পার থেকে যেন কথা নয়, তপ্ত বুলেট ছুটে এসে ছিঁড়েখুঁড়ে দিয়েছিল সৌম্যের গোটা শরীর। চোখের সামনে এক আকাশ অন্ধকার। পরিবারকে খবরটা জানানোর মতোও শক্তিও ছিল না সৌম্য ভট্টাচার্যের। ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রকের উপদেষ্টা শিখা গর্গের স্বামী সৌম্য সেই মুহূর্তের বিবরণ দিতে গিয়ে বার বার কেঁপে উঠছিলেন। নাইরোবিগামী ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের ওই বিমানেই যে ছিলেন তাঁর স্ত্রী শিখা।

সোমবার সকাল ৮টা ৩৮ মিনিটে আদ্দিস আবাবার বোল আন্তর্জাতিক বিমান থেকে উড়েছিল উড়ান ইটি-৩০২। বোয়িং ৭৩৭- ৮ ম্যাক্স মডেলের এই বিমানটিতে ১৪৯ জন যাত্রী ছিলেন। বিমানকর্মীর সংখ্যা ছিল ৮। রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি সম্মেলনে যোগ দিতে সেই বিমানে চেপেছিলেন শিখাও। আদ্দিস আবাবার মাটি ছাড়ার মিনিট খানেকের মধ্যেই বিমানের সঙ্গে এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিছু ক্ষণের মধ্যেই জানা যায়, রাজধানী থেকে প্রায় ৬২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বিশোফটু শহরের কাছে ভেঙে পড়েছে বিমানটি। প্রথমে জীবিত যাত্রীদের খোঁজে উদ্ধারকাজ শুরু হলেও কয়েক ঘণ্টা পরে সরকারি সম্প্রচার বিভাগ জানিয়ে দেয়, কোনও যাত্রীরই বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই।

শিখার সঙ্গে পরিচয় হয় বছর তিনেক আগে, জানিয়েছেন সৌম্য। তিনি তখন ইউনাইটেড ন্যাশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে (UNDP)কর্মরত ছিলেন। পরে যোগ দেন ইউনাইটেড ন্যাশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামে (UNEP)। চলতি বছরই বিয়ে করেন শিখাকে। তিন মাসও হয়নি বিয়ের। ‘‘নাইরোবিতে শিখার সঙ্গে যাবো ভেবেছিলাম। কিন্তু একটা মিটিং চলে আসায় পারিনি। তাই নাইরোবি থেকে শিখা ফিরলে এপ্রিলে একটা ছোটো ট্যুর প্ল্যান করেছিলাম। বিয়ের তিন মাস সেলিব্রেট করতাম। টিকিট কাটাও হয়ে গিয়েছিল। তার আগেই সব শেষ হয়ে গেল,’’ সৌম্যের চোখে শূন্য দৃষ্টি, বুকে চাপা কান্না।

দিল্লির পশ্চিম বিহারের বাড়িটিতে লোকে লোকারণ্য। আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-বান্ধবেরা সকলেই সমবেদনা জানাতে আসছেন। দিন কয়েকের মধ্যেই শিখার দেহাংশ পৌঁছে যাবে এই বাড়ির চৌকাঠে। সে দিন কী ভাবে নিজেকে সামলাবেন ভাবতেও পারছেন না সৌম্য। তাঁর চোখে এখন শিখার সঙ্গে কাটানো প্রতিটা মুহূর্তের ছবি। সাজানো গোছানো ভবিষ্যতের স্বপ্নেরা স্মৃতির পাতা থেকে যেন ফিরে ফিরে আসছে।

‘‘শিখা খুব ভালো মেয়েই নয়, একজন দায়িত্বশীল স্ত্রীও ছিলেন’’, বললেন সৌম্যের বোন সোনম। তাঁর কথায়, খুব সুন্দরভাবে পরিবারের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন। শ্বশুর-শাশুড়ির খেয়াল রাখতেন। তাঁদের নিয়ে মাঝে মাঝেই বাইরে ঘুরতে যেতেন শিখা।

ইথিয়োপিয়ায় ভারতীয় দূতাবাস সূত্রে জানানো হয়েছে, ইটি-৩০২ উড়ানে ১৫৭ আরোহীর মধ্যে মোট চার জন ভারতীয় ছিলেন। শিখা ছাড়াও দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে বৈদ্য পন্নাগেশ ভাস্কর, বৈদ্য হনসিন অন্নাগেশ, নুকাবরাপু মনীষার। নিজের দফতরের কর্মী শিখার মৃত্যুর বিষয়টি কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী হর্ষ বর্ধনই জানিয়েছিলেন বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে। টুইটারে এ নিয়ে শোক প্রকাশও করেছেন হর্ষ বর্ধন। তার পরে নিজের উদ্যোগেই শিখার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন সুষমা। তাঁর পরিবারকে সব রকম সাহায্যের আশ্বাস দেন তিনি।

সৌম্যের ফোনে এখন মেসেজের বন্যা। কেউ নিচ্ছেন কুশল সংবাদ, কেউ বা দিচ্ছেন সান্তনা। সৌম্য আঁকড়ে রয়েছেন শিখার সেই পুরনো মেসেজকে। হয়তো ভাবছেন ঠিক সময়ে যদি উত্তরটা দিতে পারতেন, আরও একবার হয়তো কথা হত ভালোবাসার মানুষটার সঙ্গে।

Shares

Comments are closed.