কথা বললেই ‘দেশদ্রোহী’! অতএব গুলি করে মেরে দাও

ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রকাশ্য জনসভায় বললেন গুলি মারতে!

১৭

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

সুখেন্দুশেখর রায়, তৃণমূল সাংসদ, রাজ্যসভা

ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রকাশ্য জনসভায় বললেন গুলি মারতে!

আদতে তিনি অর্থ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী, যাঁর দায়িত্ব ভারতের বেহাল অর্থনীতিকে কী ভাবে পথে ফেরানো যায় সে ব্যাপারে দফতরের পূর্ণমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণকে নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাহায্য করা। সেই মন্ত্রীই ভরা জনসভায় গিয়ে বললেন গুলি মারার কথা! এটাও ঠিক যে তিনি মন্ত্রীর পাশাপাশি এক জন বিজেপি নেতা এবং সেদিন তিনি নির্বাচনী প্রচারে গিয়েছিলেন। সেই প্রচারে গিয়েই তিনি বলেছেন গুলি মারার কথা।

মনে রাখতে হবে, এত গন্ডগোল হল দিল্লিজুড়ে, অথচ শাহিনবাগে কোনও গন্ডগোলই হয়নি। একটা ঢিলও কেউ ছোড়েননি। পুলিশকে কোথাও লাঠিচার্জ করতে হয়নি। সেখানে সম্পূর্ণ শান্তি বিরাজ করছে। অথচ শাহিনবাগে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যাঁরা প্রতিবাদ করছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মন্ত্রী চিৎকার করে হুমকি দিলেন “দেশকি গদ্দারোকো গোলি মারো সালোঁকো।” অর্থাৎ শান্তিপূর্ণ পথে যাঁরা আন্দোলন করছেন, তাঁরা হলেন গদ্দার বা দেশদ্রোহী! তাঁরা দেশের শত্রু। তাই গুলি করে তাঁদের মেরে দাও।

আরও পড়ুন

গোলি মারো নয়, কামান দাগার স্লোগান ওঠা উচিত গদ্দারদের বিরুদ্ধে 

বিভাজন বাড়াতে পরিকল্পিত ভাবেই ‘গোলি মারো’ স্লোগান, রুখে দাঁড়ানো জরুরি

ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ ভাবে সমবেত হওয়া—দেশের সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে এটি স্বীকৃত মৌলিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক অধিকারও বটে। সংবিধান অনুযায়ী যাঁরা সেই মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করছেন, তাঁদের বলা হচ্ছে দেশবিরোধী বা দেশের শত্রু। তাই তাঁদের বেঁচে থাকার কোনও অধিকার নেই বলে মন্ত্রী নিজে মনে করেন। তাই তিনি প্রকাশ্য সভায় তাঁর দলের লোকজনকে উস্কানি দিচ্ছেন যে ওদের গুলি মেরে উড়িয়ে দাও।

দেখা গেল, তার পরে সত্যিসত্যিই গুলি চলতে শুরু করল। এখানে পুলিশ গুলি চালাচ্ছে না, গুন্ডারা গুলি চালাচ্ছে, খুন করছে বেপরোয়া ভাবে। পুলিশ লাঠি হাতে নীরব দর্শক। চার দিন ধরে এই পরিকল্পিত গণহত্যা (যা আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন) চলল খোদ রাজধানীর বুকে। কোনও পুলিশ কমিশনার, কোনও ডেপুটি পুলিশ কমিশনার, দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী, দিল্লির কোনও মন্ত্রী, কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা অন্য কোনও মন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনও অফিসার—এক বারের জন্য কেউ গেলেন না সেখানে!

চার দিন পরে যখন সারা পৃথিবী জুড়ে জনমত তৈরি হয়েছে জঘন্য গণহত্যার বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশনে পর্যন্ত বিবৃতি দিতে হয়েছে, তখন বিদেশ মন্ত্রককে দিয়ে বিবৃতি দেওয়াতে হচ্ছে যে ‘সেরকম কিছু ঘটেনি’। অর্থাৎ এত যে মানুষের প্রাণ গেল, তা সেরকম কিছু নয়। মন্ত্রী উস্কানি দিলেন ‘গোলি মারো’ বলে, সেটা সেরকম কিছু নয়, এটা নাকি গণতান্ত্রিক দেশে ঘটেই থাকে। এর অর্থ দাঁড়ায় এই যে, ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে এটাই রীতি, যে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী “গোলি মারো সালোঁকো” বলবেন, তাতে গুলি চলবে, মানুষ মরবে এবং প্রশাসনের দায়িত্বে যাঁরা আছেন তাঁরা নিশ্চুপ থাকবেন, নীরব থাকবেন, অন্ধ থাকবেন, চোখে দেখবেন না।

সরকারি হিসেবে পঞ্চাশ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে (যদিও বেসরকারি হিসেবে তা শতাধিক, সিপিএমের নন্দীগ্রাম-ছোট আঙারিয়ার মতো)।

চার দিন বাদে এনিয়ে হইচই হল পৃথিবীর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে (এর মধ্যে রয়েছে বিবিসি, ভয়েজ অফ আমেরিকা, ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমস, খলিল টাইমস, আল-জাজিরা, সিএনএন প্রভৃতি) তখন হঠাৎ অবতীর্ণ হলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। যে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে কাশ্মীরে দেখা যায় পুলওয়ামা কাণ্ড ঘটার পরে অথবা ৩৭০ ধারা রদ করার পরে, সেই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা যাচ্ছেন দিল্লির দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শন করতে। এই প্রথম একজন সরকারি আধিকারিককে দেখা গেল, তার আগে এখানে কাউকে দেখা যায়নি।

কিন্তু উনি গিয়ে কী বললেন? যা বললেন সেই বক্তব্য ঐতিহাসিক। সংবাদমাধ্যমে যা বেরিয়েছে তা হল, “যো হুয়া সো হুয়া, ইনশাল্লাহ আগে ঔর নেহি হোনা।” তার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়াচ্ছে, যা হয়েছে তা হয়েছে যদি ঈশ্বর চান তাহলে পরে আর এরকম কিছু ঘটবে না।

সোজা কথায় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে পাঠানোর অর্থ হয়, জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত। সেই কারণেই তিনি গেছেন। (রাজধানী দিল্লির বুকে যে পরিকল্পিত গণহত্যা ঘটেছে তাকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য গিয়েছিলেন কিনা জানি না।) সেখানে গিয়ে তিনি যে বিবৃতি দিয়েছেন তা গণহত্যাকারীদের উৎসাহিত করবে। আমার ছোট্ট প্রশ্ন, যদি অজিত ডোভালের বাড়ির কেউ বা নিকটাত্মীয় ওই ভাবে খুন হতেন, তাহলে তিনি এই কথাটা বলতে পারতেন তো?

অর্থ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর প্রকাশ্য জনসভায় যেদিন গুলি মারার কথা বলেছিলেন তার কিছুদিন পরেই উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের গলাতেও তার প্রতিধ্বনি শোনা গেল। কর্নাটকের এক মন্ত্রী এই নিয়ে দ্বিতীয়বার বললেন গুলি চালানোর কথা। তখনও বলেছিলেন, যারা গদ্দার তাদের গুলি করে মারাই উচিত। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন যে, “আমরা মনে করি যে যারা দেশবিরোধী তাদের গুলি করে মারার জন্য একটা অধ্যাদেশ জারি করা হোক।” অর্থাৎ কোন আইন প্রণয়ণ করতে হবে সেটা দেশের সংসদ ঠিক করবে না, কোনও রাজ্যের বিধানসভাও ঠিক করবে না। ঠিক করবেন বিজেপির একজন মন্ত্রী। যদিও তিনি আজ মন্ত্রী আছেন, কাল তা নাও থাকতে পারেন।

ভারতের দু’টি প্রতিষ্ঠানকে আইন প্রণয়ণ করার ক্ষমতা দিয়েছে সংবিধান। রাজ্যের ক্ষেত্রে বিধানসভা ও জাতীয় স্তরে সংসদ। ব্যক্তি দূরের কথা, অন্য কোনও প্রতিষ্ঠান এমনকি হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট—কারওই আইন প্রণয়ণ করার কোনও ক্ষমতা নেই।

মন্ত্রীরা যে এসব কথা বলছেন, এজন্য তো দল হিসেবে বিজেপির পক্ষ থেকে কেউ তাঁদের কাছে ব্যাখ্যা চাননি, জানতে চাননি যে কিসের ভিত্তিতে ও কোন অধিকারবলে তাঁরা একথা বলছেন। প্রকাশ্য জনসভায় মন্তব্য করা নিয়ে অনুরাগ ঠাকুরকেও আজ পর্যন্ত কেউ কোনও প্রশ্ন করেননি। না দলের পক্ষ থেকে, না সরকারের পক্ষ থেকে। মন্ত্রী হওয়ার সময় তিনি শপথ নিয়েছেন যে “আমি সংবিধান ও আইন মেনে চলব ও রক্ষা করব।”

প্রকাশ্য জনসভায় যিনি হিংসাত্মক উক্তি করছেন এবং সেটি ব্যাপক ভাবে সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমাপ্রার্থনা করেননি। তার মানে এই কথা বলার জন্য তিনি বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নন বরং গর্বিত। সেই ব্যক্তিতে এখনও মন্ত্রিসভায় রাখা হয়েছে কেন? সংবিধান মেনে যে শপথ তিনি নিয়েছেন তা ভঙ্গ করার অপরাধেই তো তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে বরখাস্ত করা উচিত ছিল।

একই কথা যোগী আদিত্যনাথের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তিনি একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং তিনিও শপথ নিয়েছেন। তিনিও প্রকাশ্য জনসভায় বলছেন গুলি করে মারার কথা এবং তিনি মেরেওছেন। এনকাউন্টারের নাম করে ওঁর রাজ্য উত্তরপ্রদেশে উনি একশো থেকে দেড়শো জনকে গুলি করে মেরেছেন।

আমাদের মতো দেশে যে কোনও অপরাধীকে বিচার করার দায়িত্ব বিচারালয়ের। পুলিশের কাজ অপরাধীকে গ্রেফতার করে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে কী কী প্রমাণ পাওয়া গেছে সেসমস্ত বিচারালয়ের হাতে দেওয়া। বিচারালয় স্থির করবে কী শাস্তি দেওয়া হবে। এখানে সেই ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিতে চাইছেন না ওই নেতা-মন্ত্রীরা।

গণহত্যা শব্দের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পরিকল্পিত’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। পরিকল্পনাটি কী? “দাঁতের বদলে দাঁত, চোখের বদলে চোখ”—এটি মধ্যযুগে ঘটত। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা উন্মেষের পরে যে দেশ সেই ব্যবস্থাকে গ্রহণ করেছে সেখানে “দাঁতের বদলে দাঁত, চোখের বদলে চোখ” হয় না। সেখানে বিচারব্যবস্থা থাকে। সকলকে সেই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ওরা সেই সমস্ত ব্যবস্থা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে সরাসরি একটি ব্যবস্থা চালু করতে চাইছে। তা হল ওঁদের যাঁরা বিরোধী তাঁরাই দেশবিরোধী। তাঁদের কোনও বিচারের দরকার নেই, গুলি করে মেরে দিতে হবে এবং তাঁরা সেটি করে দেখাচ্ছেনও।

দিল্লি হল দু’নম্বর গুজরাত। এর পিছনে যে মূল খলনায়ক রয়েছেন তিনি যখন কলকাতায় আসছেন তখন আমদানি করা ভাড়াটে গুণ্ডারা ওই একই স্লোগান দিচ্ছেন। তাঁর আগের বারের পশ্চিমবঙ্গ সফরের সময় তাঁরা বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙেছিলেন। এবার সেই গুন্ডারা আর মূর্তি ভাঙার ব্যাপারে উৎসাহিত নন। এখন তাঁরা গুলি মারতে উৎসাহিত। তাই কলকাতাতেও এই স্লোগান উঠেছে।

এখন বুঝতে হবে যে এই ব্যবস্থা পুরো দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, এজন্যই আমাদের নেত্রী ‘পরিকল্পিত’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। সারা দেশে যেখানে বিজেপির বিরোধীরা ক্ষমতায় রয়েছেন (সেটি ওড়িশা নয় কারণ তারা বিজেপির জোটে না থাকলেও বিরোধী নয়) তারাই লক্ষ্য। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গও রয়েছে। সামনেই শতাধিক আসনে পুর নির্বাচন, এটি সেমিফাইনাল। তারপরে আগামী বছরের গোড়ায় বিধানসভা ভোটের ফাইনাল। তাই তাঁরা চাইছেন গুজরাট ১, গুজরাট ২ যাতে বাংলায় আমদানি করা যায়।

এখানে অবশ্য তা হবে না দু’টি কারণে। আমরা খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি যে ওঁরা তা করতে পারবেন না। তার প্রথম কারণ হল এখানে মুখ্যমন্ত্রীর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তেমন কিছু করার চেষ্টা করা হলে এখানে প্রশাসন কড়া হাতে তা দমন করবে। তার প্রমাণ পাওয়া গেছে যে পরশু যারা স্লোগান দিয়েছিল তাদের চিহ্নিত করে তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একজন জামিন পেয়েছে আর দু’জনের পুলিশ হেফাজত হয়েছে। আরও তদন্ত হচ্ছে। যখন যেখানে এই ধরনের অসামাজিক জীবেরা প্ররোচনামূলক মন্তব্য করছে বা বাতাবরণ তৈরি করার চেষ্টা করবে সেখানে প্রশাসন কড়া হাতে দমন করবে।

তার চেয়েও বড় কথা হল বাংলার পরম্পরা। বাংলা যেভাবে দেশভাগের শিকার হয়েছে অন্য কেউ হয়নি। আজ অনেকেই উদ্বাস্তু নিয়ে কুমিরের কান্না কাঁদছেন কিন্তু ভারতবর্ষের মধ্যে কেউ যদি সবচেয়ে বেশি উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিয়ে থাকে তাহলে বাংলা দিয়েছে। বাংলা সেই আশ্রয় দিয়েছে নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহের বদান্যতায় নয়। এখানে লক্ষ লক্ষ মানুষকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এজন্য কোনও নাগরিক আইন দরকার হয়নি, কোনও এনআরসি-এনআরপি দরকার হয়নি।

দ্বিতীয় কারণ হল, বাংলার সচেতন মানুষ ঐক্যবদ্ধ ভাবে এই ধরনের অপশক্তিকে রুখে দেবেন যেমন তাঁরা অতীতে রুখে দিয়েছেন।

কলকাতার বুকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় এক দিনে দশ হাজার মানুষকে খুন করা হয়েছিল। এবার অবশ্য কোনও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি, এবার হয়েছে পরিকল্পিত গণহত্যা। অর্থাৎ বিরোধী কণ্ঠকে একটা তকমা লাগিয়ে দাও।

টুকরে টুকরে গ্যাং কারা? বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, আরএসএস—আসলে এরাই হল সেই টুকরে টুকরে গ্যাং। এরাই সারা ভারত থেকে বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করতে চাইছে। যাঁরা কোনও রাজনৈতিক দল করেন না তাঁদেরও নিশ্চিহ্ন করতে চাইছে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা কোন রাজনৈতিক দল করেন? শাহিনবাগে যে দাদিরা রয়েছেন সেই দাদিরা কোন রাজনৈতিক দল করেন? তাঁরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন। সেই নিরাপত্তার অভাব বোধ থেকে তাঁরা গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবাদ করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের এক প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি পর্যন্ত বলছেন যে গণতান্ত্রিক পথে প্রতিবাদ করা রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয়। অথচ গণতান্ত্রিক পথে যাঁরা প্রতিবাদ করছেন তাঁদের রাষ্ট্রদ্রোহী তকমা দিয়ে গুলি করে মারতে বলা হচ্ছে।

এর মূল অনেক গভীরে। নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহরা প্রথমে স্লোগান তুলেছিলেন কংগ্রেসমুক্ত ভারত। এখন তাঁরা চাইছেন বিরোধীমুক্ত ভারত। বিরোধী বলতে শুধুমাত্র বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি নয়, কোনও ব্যক্তি যদি একক ভাবে কোনও বিষয়ের বিরোধিতা করেন কোনও ব্যাপারে, কারও বক্তব্যের তাহলে তিনিও রাষ্ট্রদ্রোহী। ব্যাপারটাকে এই জায়গায় নিয়ে যেতে চাওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ওঁদের দল ও ওঁদের টুকরে টুকরে গ্যাং ছাড়া ভারতে কেউ কোনও কিছু করতে ও বলতে পারবে না।

বিজেপি এই স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে গেছে, প্রকাশ্যে চলে এসেছে। গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের কাছে আমরা আবেদন করব যে এর পরে বিজেপি যে দেশের পক্ষে কতটা ভয়ঙ্কর তা নিয়ে আর যেন কোনও মানুষের মনে কোনও রকম দ্বিধা না থাকে। যদি শান্তি না থাকে তাহলে কোনও প্রগতি হবে না। ব্যক্তিগত জীবনে হবে না, সমাজ জীবনেও হবে না, রাষ্ট্র জীবনেও হবে না। যে কোনও ধরনের প্রগতির প্রাথমিক শর্তই হল শান্তি, তা সে ব্যক্তিগত পরিসরে হোক, পারিবারিক পরিসরে হোক, সামাজিক পরিসরে হোক কিংবা রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় পরিসরে।

ওঁরা এখন দেশে অরাজক অবস্থা তৈরি করতে চাইছেন তাই আজ অন্য কোনও সমস্যা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। ভারতীয় জীবনবিমা নিগম যে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে কেউ আলোচনা করছেন না, দু’শোটি রেলস্টেশন বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে কেউ আলোচনা করছেন না, রেলগাড়িই বিক্রি করে দিচ্ছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে—আলোচনা হচ্ছে না। বিমানবন্দর বিক্রি করে দিচ্ছে—আলোচনা হচ্ছে না।

আগে শুধু আমাদের দেশের লোকের কাছে জাতীয় সম্পত্তি বিক্রি করা হত। মুম্বই বিমানবন্দর, দিল্লি বিমানবন্দর, হায়দরাবাদ বিমানবন্দর—এই তিনটি বিমানবন্দরের দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে অনেক আগেই দেওয়া হয়েছে। এক থেকে দুই দশক তারা চালানোর পরে তার বড় অংশ বিদেশি সংস্থার কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে। তার মানে পিছনের দরজা দিয়ে এবার বিদেশি কোম্পানি এসে এক এক করে মালিক হয়ে যাবে এই তিনটি বিমান বন্দরের।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এসেছিল, গায়ের জোরে তারা পলাশির যুদ্ধ জিতে নিয়েছিল। তারপরে শুরু করেছিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণ। আর এখন পুরো গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ‘এক ভারত’, ‘শ্রেষ্ঠ ভারত’—কত কী স্লোগান দিয়ে দেশকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এদেশে এলেন তাঁর দেশের পণ্য (সামরিক হেলিকপ্টার ও অন্য সরঞ্জাম) বিক্রি করতে, ডিআরডিও-তে তৈরি কোনও কিছু কিনতে নয়। সেই বিক্রেতাকে আমরা বিপুল ভাবে সংবর্ধনা জানাব কেন? তিনি কিছু কিনলে আমরা নিশ্চয়ই তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতাম। সে সব নিয়ে আলোচনা হবে না কারণ প্রত্যেকেই এখন প্রাণ বাঁচাতে ব্যর্থ।

জনজীবনের যে সব সমস্যা রয়েছে , আমার ছেলে চাকরি পাবে কিনা, মেয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে কিনা স্বাধীন নাগরিক হিসাবে, সেসব নিয়ে কোনও আলোচনার পরিবেশ এখন আর কোথাও নেই। সেসব নিয়ে যাতে কেউ কোনও আলোচনা করতে না পারেন, সে জন্য এখন দেশে ভীতি ও সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। কথা বললেই তুমি রাষ্ট্রদ্রোহী, তা তুমি যেই হও না কেন।

লেখক রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ।
মতামত লেখকের নিজস্ব। 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More