মায়ের নৃশংস মৃত্যু দেখেছিল সে, ‘মানুষখেকো’ অবনীর সেই দশ মাসের ছানাকে স্নেহে-আদরে বড় করেছে মহারাষ্ট্র বন দফতর

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত বাঘিনীর নিথর শরীরের সামনে দাঁড়িয়ে যখন তার ছানা দুটিকে খুঁজছিলেন বন দফতরের কর্তারা, তারা তখন গা ঢাকা দিয়েছিল গুহার অন্ধকারে। একটি পুরুষ শাবক, অন্যটি স্ত্রী। মহারাষ্ট্রের পান্ধারকাওড়া জঙ্গলে সেই ‘মানুষখেকো’ বাঘিনী (T1-অবনীর সাঙ্কেতিক নাম) অবনীর দুই সন্তান। পুরুষ শাবকটিকে ধরা যায়নি, এক মাস ছন্নছাড়া বনের পথে ঘোরার পরে বনকর্মীদের হাতে ধরা দিয়েছিল শিশু বাঘিনী (T1C2)। তখন তার বয়স ছিল ১০ মাস। বন দফতরের স্নেহে-আদরে সেই শিশু আজ বছর দুয়েকের শক্তসমর্থ বাঘিনী।

    গত বছর ২২ ডিসেম্বর অনাহারে ধুঁকতে থাকা, মৃতপ্রায় শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়েছিল, জানিয়েছেন ন্যাশনাল টাইগার রিজার্ভ অথরিটির (NTCA) এক আধিকারিক। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে দেখা গিয়েছিল, অবনীকে যখন হত্যা করা হয় তার পাকস্থলীতে গ্যাস ছাড়া কিছুই ছিল না। জল টুকুও না। স্বাভাবিক ভাবেই ক্ষুধার্ত ছিল তার দুই শাবকও। চোখের সামনে মায়ের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড দেখে আতঙ্কিতও ছিল। বনকর্মীদের দেখে জঙ্গলের সীমানার বাঁশের বেড়া টপকে পালিয়েছিল পুরুষ শাবকটি। তার কিছু দিন পরেই ধরা পড়ে T1C2।

    মৃত অবনী

    মহারাষ্ট্র বন সংরক্ষণ দফতরের প্রিন্সিপাল চিফ কনজ়ার্ভেটর নিতিন কাকোদকর বলেছেন,যবতমলের পান্ধারকাওড়া জঙ্গলের প্রায় ১৬৪ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে ১১১টি ক্যামেরা লাগানো হয়েছিল। ৫৪টি  ‘পাগ মার্ক’ দেখে, তবে ধরা যায় শিশু বাঘিনীটিকে। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে পেঞ্চ অভয়ারণ্যে ছেড়ে দেন বনকর্মীরা। তবে সতর্ক নজর ছিল সবসময়। সময় মতো খাবার পৌঁছে দেওয়া হত। অরণ্যের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্যই তাকে মানুষের সংস্পর্শে রাখা হয়নি। তবে কোর এলাকা নয়, অপেক্ষাকৃত কম বিপদসঙ্কুল এলাকায় বন দফতরের আদরেই বেড়ে উঠতে থাকে সে।

    দাহ করা হয়েছিল অবনীকে

    হায়দরাবাদ টাইগার কনজারভেশন সোসাইটির বাঘ বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শাবকের পাকাপোক্ত হতে সময় লাগে অন্তত ২০ মাস। এর মধ্যেই তাকে শিকার ধরা থেকে জঙ্গলের নিয়মকানুন শেখায় তার মা। অনাথ শিশুটির প্রতিপালনের জন্য সেই দায়িত্ব নিতে হয়েছিল বনকর্মী ও বাঘ বিশেষজ্ঞদের। এনটিসিএ-র আধিকারিক অনুপ নায়েকের কথায়, “আমাদের অফিসার, বিজ্ঞানী, গবেষকরা পরম মমতায় শিশুটির দেখভাল করেছেন। জঙ্গলের যে এলাকায় তাকে রাখা হয়েছিল, তার আশপাশে অজস্র সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সর্বক্ষণ নজরে রাখা হত ছানাটিকে। গত এক বছরে এক মুহূর্তের জন্যও তার উপর থেকে চোখ সরানো হয়নি। এখন সে শিকার ধরতে সক্ষম, নিজের সুরক্ষার ব্যবস্থা নিজেই করতে পারবে। তাই তাকে জঙ্গলের কোর এলাকায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”

    হঠাৎ করেই নাকি মানুষখেকো হয়ে উঠেছিল মহারাষ্ট্রের পান্ধারকাওড়া জঙ্গলের বছর পাঁচেকের বাঘিনী অবনী।  অভিযোগ ছিল, দু’বছরে তার শিকার পরিণত হয়েছে জনা তেরো গ্রামবাসী। ধীরে ধীরে গোটা এলাকাতেই ত্রাস হয়ে ওঠে অবনী। বাঘিনীকে মেরে ফেলার জন্য গ্রামবাসীরা খবর দেয় বন দফতরকে। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে বাঘ হত্যা কতটা যুক্তিসঙ্গত তা নিয়ে শুরু হয় টানাপড়েন। মামলা গড়ায় দেশের শীর্ষ আদালত পর্যন্ত। গত বছর সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট তার একটি রায়ে অবিলম্বে মেরে ফেলতে বলে অবনীকে। তার পর তিন মাস ধরে বাঘিনীর খোঁজে গোটা এলাকা চষে ফেলে প্রায় ২০০ জন বনকর্মী ও বাঘশিকারী। নামজাদা বাঘশিকারী নবাব শফাত আলির ছেলে আসগর আলির গুলিতে রালেগাঁওয়ের বোরাতি জঙ্গলের ১৪৯ নম্বর কম্পার্টমেন্টে মারা যায় অবনী। ০.৫ সেন্টিমিটার ব্যাসের একটি বুলেট এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে বাঘিনীর হৃৎপিন্ড ও ফুসফুস।

    বাঘিনীর মৃত্যুর পরই তার শিকার পদ্ধতি ও নৃশংসতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে বিভিন্ন পশুপ্রেমী সংগঠন।  পেটা দাবি করে, বাঘিনীকে জীবন্ত ধরার চেষ্টা করা হল না কেন? যদিও বাঘিনী-হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতক শিকারিরা দাবি করে, অজ্ঞান করাই হয়েছিল বাঘিনীকে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে সে জেগে ওঠার কারণেই গুলি চালাতে হয়। এই যুক্তি উড়িয়ে দেয় পেটা ও অন্যান্য পশুপ্রেমী সংগঠন গুলো। প্রশ্ন তোলা হয়, এমন কী ওষুধ দেওয়া হয়েছিল যাতে বাঘিনী কয়েক মিনিটের মধ্যে জেগে ওঠে। তাহলে তাকে অজ্ঞান করার গল্পটা নেহাতই একটা ধাপ্পা? নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কোনও রহস্য? শাবকদের সামনেই রক্তাক্ত করে তার মা’কে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা হল। এটা গোটা বিশ্বের কাছেই অত্যন্ত নিন্দনীয় ঘটনা।

    আরও পড়ুন:

    সুন্দরবনে সাড়ে তিনশ বাঘ কমেছে পনেরো বছরে, লাফিয়ে বেড়েছে মধ্যপ্রদেশ-কর্নাটকে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More