দেপসাং ভ্যালি কব্জা করতে কেন মরিয়া চিন, সীমান্ত রক্ষায় আরও আক্রমণাত্মক ভারতীয় সেনা

দেপসাং ভ্যালি নিয়ে ভারতীয় সেনার আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ ইতিমধ্যেই দেপসাং সংলগ্ন এলাকায় সেনার সংখ্যা বাড়াতে শুরু করেছে চিন। তাদের রাডার পজিশন ধরা পড়েছে, রাইফেল ডিভিশন তৈরি হচ্ছে বলেও অনুমান করা হচ্ছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: গালওয়ান, প্যাঙ্গং হ্রদের পরে দেপসাং সমতলভূমি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেই জুন মাসের মুখোমুখি সংঘাতের পরেই দেপসাং ভ্যালিতে ঢুকে এসেছিল লাল সেনা। ভারতীয় সেনা সূত্র জানাচ্ছে, সামরিক শক্তি দিয়ে দেপসাং এলাকা কব্জা করার মতলব রয়েছে পিপলস লিবারেশন আর্মির। গালওয়ান পেরিয়ে প্যাঙ্গং হ্রদের উত্তরে ফিঙ্গার পয়েন্ট ৩ এর কাছে সামরিক কাঠামো বানাতে শুরু করেছে চিন। এরপরেই দেপসাং ভ্যালিতে সামরিক শক্তি বাড়াতে শুরু করবে। পূর্ব লাদাখে এই দেপসাং ভ্যালির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ভৌগোলিক গুরুত্ব তো বটেই সামরিক দিক থেকেও ওই এলাকা কখনও হাতছাড়া করতে চাইবে না ভারত।

দেপসাং ভ্যালি নিয়ে ভারতীয় সেনার আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ ইতিমধ্যেই দেপসাং সংলগ্ন এলাকায় সেনার সংখ্যা বাড়াতে শুরু করেছে চিন। তাদের রাডার পজিশন ধরা পড়েছে, রাইফেল ডিভিশন তৈরি হচ্ছে বলেও অনুমান করা হচ্ছে। ১৬ হাজার ৪০০ ফুট উচ্চতায় ৯৭২ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে দেপসাং ভ্যালি। উপগ্রহ চিত্র দেখিয়েছে, অগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর মাস অবধি, নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় নতুন করে সেনা মোতায়েন করছে চিন।  সেখানে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা লঙ্ঘন করেছে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা সংলগ্ন এলাকায় সেনা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ট্যাঙ্ক, কামানও মোতায়েন করতে শুরু করেছে। দ্রুত সেনা মোতায়েনের জন্য রাস্তাও তৈরি করছে চিন। ভারতের সেনা সূত্র জানাচ্ছে, দেপসাং ভ্যালিতে আধিপত্য বিস্তার করতে পারলে নীচে ডেমচক অবধি এলাকায় কর্তৃত্ব করতে পারবে লাল সেনা। সেই লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে তারা।


দেপসাং ভ্যালির ভৌগোলিক গুরুত্ব

একদিকে সিয়াচেন গ্লেসিয়ার, অন্যদিকে চিনের নিয়ন্ত্রণে থাকা আকসাই চিন—এই দুইয়ের মাঝে রয়েছে দেপসাং ভ্যালি। ভারতের সাব সেক্টর নর্থ তথা এসএসএনের মধ্যে পড়ে দেপসাং। এই এলাকার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল একদিকে উচ্চতম সিয়াচেনের সীমান্তের নাগাল পাওয়া যাবে, অন্যদিকে আকসাই চিন লাগোয়া দৌলত বেগ ওল্ডি হয়ে ভারতে ঢোকার রাস্তা সহজ। এই দৌলত বেগ ওল্ডি এখন ভারতের সেনার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাই দেপসাং কব্জা করতে পারলে চিনের সেনাকে পেরিয়ে ভারত আর এই এলাকায় টহল দিতে পারবে না। ফলে দেপসাং ভ্যালিকে মাধ্যম করে একদিকে গালওয়ান ও অন্যদিকে প্যাঙ্গং হ্রদের পাহাড়ি এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের রাস্তা সহজ হবে চিনের বাহিনীর কাছে।

দেপসাং ভ্যালিতে অধিকার ফলাতে পারলে আরও সুবিধা হবে চিনের। যেমন, দারবুক থেকে শিয়ক হয়ে দৌলত বেগ বিমানঘাঁটি অবধি যে রাস্তা তৈরি করছে ভারত সেটাই চিনের বাহিনীর মাথাব্যথার কারণ। তাই পেট্রোলিং পয়েন্ট ১৪ নম্বরের কাছে অশান্তি বাঁধিয়ে পাহাড়ের উপরে ঘাঁটি তৈরির চেষ্টা করছে চিন। দুই দেশের সেনা কম্যান্ডার পর্যায়ের বৈঠকের পরেও ওই এলাকা থেকে সেনা সরায়নি তারা। বস্তুত, পেট্রলিং পয়েন্ট ১১, ১২,১২-এ ও পেট্রলিং পয়েন্ট ১৩ র কাছেও রাস্তা বন্ধ করে বসে পড়েছ চিনের সেনা। উত্তরে রাকি নালা থেকে পেট্রলিং পয়েন্ট ১০ ও দক্ষিণপূর্বে জীবন নালা অর্থাৎ পেট্রলিং পয়েন্ট ১৩ অবধি রাস্তাতে নজরদারি চালাতে চায় চিনের বাহিনী। কারণ এই এলাকা নিয়ন্ত্রণে থাকলে দৌলত বেগ ওল্ডির দিকে যাওয়া রাস্তায় নজরদারি করতে পারবে তারা। ফলে সামরিক দিক থেকে ভারতের দৌলত বেগ ওল্ডি দুর্বল হয়ে পড়বে।

দেপসাং ভ্যালির উত্তরে প্রায় ১৮ হাজার ফুট কারাকোরাম পাস বিস্তৃত। এই কারাকোরাম পাস আকসাই চিন গেঁষে গেছে। এর জি২১৯ গেটওয়ে দিয়ে তিব্বত ও জিনঝিয়াং প্রদেশে যাওয়া যায়। তিব্বতে আবার হেলিপোর্ট তৈরি করছে চিনের সেনা। উদ্দেশ্য সেই একই। তিব্বতের এয়ারবেস থেকে যখন তখন দেপসাংয়ের উপর এয়ার পেট্রলিং চালানো। কাজেই সবদিক থেকে আঁটঘাট বেঁধেই এগনোর চেষ্টা করছে তারা।

২০১৩ সালে এই দেপসাং ভ্যালিতেই প্রায় সপ্তাহ তিনেক ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল লাল ফৌজ। চিনকে আটকাতে দৌলত বেগ ওল্ডিতে বিমানঘাঁটি চালু করে দেয় ভারত।  সেনা সূত্র জানাচ্ছে, গত ১৫ বছর ধরে এই দেপসাং ভ্যালিতে আধিপত্য বিস্তার করতে মরিয়া চিন। কিন্তু এখনও এক ইঞ্চি জমিও তারা জবরদখল করতে পারেনি। এখনও চিন কোনওভাবেই ওই এলাকায় পা বাড়াতে পারবে না। কারণ, দৌলত বেগের বিমানঘাঁটিতে ভারতীয় বাহিনী তাদের শক্তিশালী ফাইটার জেট মোতায়েন রেখেছে। দৌলত বেগ ওল্ডিতে মোতায়েন করা হয়েছে টি-৯০ ভীষ্ম, টি-৭২ ট্যাঙ্ক। রাতের বেলা দৌলত বেগের পাহাড়ি এলাকার প্রায় ১৬ হাজার ফুট উপর দিয়ে চক্কর কাটছে চিনুক অ্যাটাক কপ্টার। ভারতীয় সেনা সূত্র জানাচ্ছে, প্রতি মুহূর্তে চিনা বাহিনীর উপর সতর্ক নজর রাখা হচ্ছে। পূর্ব লাদাখের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর কমব্যাট এয়ার পেট্রলিং-এর জন্য নামানো হয়েছে চিনুক কার্গো হেলিকপ্টার, আ্যাপাচে অ্যাটাক হেলিকপ্টার, মিরাজ-২০০০ ফাইটার এয়ারক্রাফ্ট, মিগ-২৯ ফাইটার জেটের নয়া ভার্সন এবং নৌসেনার নজরদারি বিমান পি-৮১ এয়ারক্রাফ্ট। চিনা বাহিনীর উপর নজর রাখছে ইজরায়েলের তৈরি সশস্ত্র ড্রোন হেরন-টিপি। আকাশযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলে তার জন্যও প্রস্তুত আছে ভারতীয় বায়ুসেনা। চিনা ফৌজ যাতে ওয়েস্টার্ন, মিডল বা ইস্টার্ন সেক্টরে ঢুকতে না পারে সে জন্য ৩৪৮৮ কিলোমিটার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর গেরিলা যুদ্ধে দক্ষ বাহিনী পাঠানো হয়েছে। শীতের আগেই আরও ৩০ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছে পূর্ব লাদাখে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More