শুক্রবার, ডিসেম্বর ৬
TheWall
TheWall

দেহব্যবসা করেছেন, ভিক্ষেও! রাতের পথে মহিলাদের নিরাপত্তা দিচ্ছেন এই রূপান্তরকামী ক্যাব চালকরা

চৈতালী চক্রবর্তী

ফোনে কথা বলতে বলতেই লিপস্টিকটা ভাল করে ঠোঁটে বুলিয়ে নিলেন মেঘনা। সংসার সামলে সাত সকালেই ক্যাবের স্টিয়ারিং ধরতে হয়। তাই সময় বিশেষ মেলে না। গাড়িতে চেপেই সামান্য একটু সাজসজ্জা সেরে নিতে হয়। ওই একটু কাজল, হালকা লিপস্টিক আর ছোট্ট একটা টিপ। ভুবনেশ্বরের মেঘনা সাহু। দেশের প্রথম রূপান্তরকামী অ্যাপ ক্যাপ চালক। আড়ষ্টতার খোলস থেকে বেরিয়েছেন অনেকদিনই। সমাজের বাঁকা চাউনিকে প্রতি পদে চ্যালেঞ্জ করে চলার পথ তৈরি করেছেন নিজেই। মেঘনার মতোই আরেক জন আছেন। রানি কিন্নর। দিনে হোক বা রাতে, মহিলাদের নিরাপদে নিজের গাড়িতে চাপিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়েছেন রানি।

আইনি খাতায় স্বীকৃতি তখনও আসেনি, জীবনের প্রতি পর্যায়ে লাঞ্ছিত হচ্ছেন মেঘনা

পরিবার দূরে সরিয়ে দিয়েছিল আগেই। পড়াশোনা করেছেন নিজের চেষ্টায়। স্কুল থেকে কলেজের পথ কতটা জটিল ছিল সেটা আর মনে করতে চান না মেঘনা। এমবিএ করেছেন। দুর্দান্ত নম্বর নিয়েই। এরপর? একজন রূপান্তরকামীকে চাকরি দিতে রাজি নয় কোনও নামী সংস্থাই। সে মেধা যতই থাক বা ডিগ্রি। “আর পাঁচজনের থেকে নিজেকে আলাদ ভাবতে পারতাম না। আমার প্রতিবেশিরাই যখন অশালীন মন্তব্য করতেন কেঁদে ফেলতাম। ছাড়খাড় হয়ে যেত ভেতরটা। বাঁচার ইচ্ছাও চলে গিয়েছিল একটা সময়,” মেঘনার চোখে জল।

মেঘনা সাহু

পেট চালাতে নানারকম পেশা বেছে নিতে হয় মেঘনাকে। তখন বয়স ২৫ বছর হবে। ট্রেনে ভিক্ষা করেছেন। মাথা উঁচু করে বাঁচার ইচ্ছাকে তছনছ করে দিয়েছে তথাকথিত সমাজ। ঘাড় ধাক্কা খেয়েছেন দোরে দোরে। বেছে নিতে হয়েছে দেহব্যবসা। যৌনপল্লীর আঁধারে তাঁরই মতো রূপান্তরকামীদের যন্ত্রণা নতুন করে মুক্তির আলো দেখার সাহস জুগিয়েছে।

ভুবনেশ্বরের রাস্তায় ওলা নিয়ে নামলেন মেঘনা, দাবানলের মতো খবর ছড়াল সোশ্যাল মিডিয়ায়

২০১৬ সাল। সামান্য কিছু জমানো টাকায় একটা গাড়ি কিনেছিলেন মেঘনা। তবে চালানোর লাইসেন্স পাননি। এদিকে জমা পুঁজি প্রায় সবই শেষ। তার উপর ব্যাঙ্ক লোন দেবে না। ওলা ক্যাবের দ্বারস্থ হন মেঘনা। সেখানেও একই বিপত্তি। রূপান্তরকামী মেঘনাকে চাকরি দিতে রাজি নয় অ্যাপ ক্যাব সংস্থা। শেষে তাঁর নম্র ব্যবহারে মন গলে। চাকরিটা জুটেই যায় মেঘনার। ওলা নিয়ে পথে নামেন দেশের প্রথম রূপান্তরকামী চালক। খবর ছড়ায় সোশ্যাল মিডিয়ায়, সংবাদ মাধ্যমে। ধন্য ধন্য করেন নেটিজেনরা।

খবরে এলেও শঙ্কামুক্ত হতে পারেননি মেঘনা। তাঁর মনে হয়েছিল, যাত্রীদের কী প্রতিক্রিয়া হবে? তাঁকে দেখলে গাড়িতে উঠতে রাজি হবেন তো লোকজন? মেঘনার কথায়, “ভয় আর শঙ্কার মেঘটা প্রথম দিনই কেটে যায়। প্রথম কয়েকটা ট্রিপের যাত্রীরা বিশেষ কিছু বলেননি। সন্ধের পরে এক অফিস ফেরত তরুণী আমার গাড়িতে উঠে স্বস্তি বোধ করেন। তিনি জানান, একা ওলা-উবেরে চড়ে ফিরতে ভয় লাগত। আজকাল অ্যাপ ক্যাবেও মহিলারা নিরাপদ নন তো! আপনাকে দেখে সাহস পেলাম। ” এই একটা কথা, হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাসটা দমকা হাওয়ার মতোই ফিরে আসে মেঘনার।

‘দিনে অটো চালিয়েছি, রাতে যৌনকর্মী, এখন মাথা তুলে বাঁচি’

রানি কিন্নর

ভুবনেশ্বরের রানি। মেঘনার মতো তাঁরও জীবনের গল্পটা অনেকটাই এক। পরিবার পাশে দাঁড়ায়নি, সমাজ ঘাড় ধাক্কা দিয়েছে। ভিক্ষে করেছেন পথে পথে। “খিদের জ্বালা বড় জ্বালা। একসময় অন্ধকারের পথে চলে যাচ্ছিলাম। মুখে রঙ মেখে রাস্তায় দাঁড়াতে হত। শরীর ছিঁড়েখুঁড়ে গেলেও মনের ভিত টলেনি। জানতাম একদিন আলোর পথ খুঁজে পাবই।” অটো চালিয়েছেন বহুদিন। বলেছেন, সেখানেও স্থানীয় মাতব্বররা কথা শোনাত, দাদাগিরি করত।

পুরীতে রথযাত্রার সময় অ্যাম্বুলেন্স চালিয়েছেন। বহু মানুষকে সাহায্য করেছেন। এইভাবেই একদিন চাকরি জুটে যায় উবেরে। রানির কথায়, “পাঁচ স্টার রেটিং পেয়েছিলাম উবেরে। আমার গাড়িতে চেপে নিরাপদ বোধ করতেন মহিলারা। অনেকেই বলতেন তাঁদের অভিজ্ঞতা। কীভাবে অ্যাপ ক্যাবের চালকদের হেনস্থার শিকার হতে হয়েছিল। রাতের দিকে আমার গাড়ি পেলে অনেকেই আশ্বস্ত হতেন। তাঁদের অনেকের কাছেই আমার নম্বর দেওয়া থাকত।” এখন নিজের গাড়ি কিনেছেন রানি। মাঝরাতে নির্জন পথে তাঁর গাড়িই ভরসা অধিকাংশের।

‘সংসার করব কখনও ভাবিনি, প্রেমের হাত ধরেই বদলে গেল জীবন’

মেঘনার রূপকথার জগৎ

২০১৭ সালে মেঘনাই ছিলেন ভুবনেশ্বরের প্রথম রূপান্তরকামী যিনি বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন। জানিয়েছেন, জীবনে প্রেম আসে অদ্ভুতভাবেই। মেঘনা তখন একদিকে অ্যাপ ক্যাবের চালক, অন্যদিকে সমাজসেবা করে চলেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর ফলোয়ার অনেক। ফেসবুকে আলাপ হয় বাসুদেব নায়েকের সঙ্গে। পারিবারিক এক সমস্যার জট থেকে বাসুদেবকে উদ্ধার করেছিলেন মেঘনা। মনের মিল হয় সেখান থেকেই। বলেছেন, “বাসুদেবের স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। দশ মাসের একটা ছেলে ছিল তাঁর। আমার হাত ধরে জীবনের পথ চলতে চেয়েছিল। প্রথমে রাজি হইনি সমাজের ভয়ে। শেষে বাসুদেবই সাহস দেয় আমাকে।” তবে একজন রূপান্তরকামীর ক্ষেত্রে বিয়ের পিঁড়িতে বসাটা খুব একটা সহজ কাজ ছিল না সেই সময়ে। বাধ সেধেছিল বাসুদেবের পরিবারই। তা ছাড়া পাড়া-প্রতিবেশীদের উত্তপ্ত কথা চালাচালি তো ছিলই। সবকিছু অগ্রাহ্য করেই মেঘনাকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে বেছে নেন বাসুদেব। শুরু হয় এক অন্য পথ চলা।

আঁধার থেকে আলোর পথে উত্তরণের দিশা দেখান মেঘনা-রানি

মেঘনার নিজস্ব ট্রাস্ট আছে। যৌনকর্মী থেকে সমাজের পিছিয়ে পড়া মহিলাদের মাঝে শিক্ষার আলো জ্বালেন মেঘনা। প্রাথমিক শিক্ষা শুধু নয়, উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থাও করেন তিনি। তাঁর মতো রূপান্তরকামীদের স্বনির্ভর হওয়ার পাঠ দেন। ড্রাইভিং শেখান। একই কাজ করেন রানিও। মেঘনার কথায়, “আমাকে দেখে আরও দশজন ক্যাব চালানোর সাহস পেয়েছেন। তাঁরা যৌনকর্মীর পেশা বেছে নিয়েছিলেন। এখন গা়ড়ি চালিয়ে সংসার টানেন।”

নারী ও পুরুষ এই দুই লিঙ্গের খোপে পৃথিবীর যাবতীয় মানুষকে যে ধরে-বেঁধে রাখা যায় না তার সত্যতা ঘোষণা করেছে সুপ্রিম কোর্ট। রায়ের ভাষা ছিল, ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের অধিকার মানবাধিকার। রাষ্ট্র আইনি সুরক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে এঁদের অধিকার বলবৎ করবে। শিক্ষায় ও চাকরিতে সংরক্ষণও এঁদের প্রাপ্য হবে। এ তো গেল আইনি খাতায় স্বীকৃতি। কিন্তু, সমাজে ও সংসারের বাঁধনে এই মানুষগুলো আজও সমানাধিকারের স্বীকৃতি পেয়েছেন কি না সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন। পরিবার-পরিজন দ্বারা নির্বাসিত বৃহন্নলাদের বেছে নিতে হয় যৌনকর্মীর পেশা বা ভিক্ষুকের জীবন। মেঘনা ও রানি দু’জনেই বলেছেন, “লিঙ্গ নিয়ে ভিত্তিহীন বিশ্বাসকে ভাঙতে হলে উদ্যোগ শুধু আইনের বা রাষ্ট্রের নয়, মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনও সেখানে একান্ত কাম্য। এর একজন রূপান্তরকামীকেও আমরা রাস্তায় ভিক্ষে করতে দেব না। চড়া মেকআপ নিয়ে বেআব্রু হতে দেব না। আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এটাই।”

Comments are closed.