বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৩
TheWall
TheWall

এর আগে মাত্র একবারই চারজনের একসঙ্গে ফাঁসি হয়েছে

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

দ্য ওয়াল ব্যুরো:  ২২ জানুয়ারি সকাল ৭টার অপেক্ষা করছে দেশ। নির্ভয়ার ধর্ষক, চার নৃশংস হত্যাকারীকে একই সঙ্গে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে ওইদিন। নতুন ইতিহাস গড়বে তিহাড় জেল। একই সঙ্গে চারজনের ফাঁসি এই প্রথমবার নয়। স্বাধীনতার পরে আরও একবার এমন ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছিল দেশ। সেই দিনটা ছিল ১৯৮৩ সালের ২৫ অক্টোবর। পুণের জেলে একই সঙ্গে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল চার সিরিয়াল কিলার রাজেন্দ্র জাক্কাল, দিলীপ সুতার, শান্তারাম জগতাপ ও মুনাওয়ার শাহকে।

১৯৭৬-১৯৭৭ সাল। যোশী-অভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড সাড়া ফেলে দিয়েছিল গোটা দেশে। এক একটা পরিবার শেষ করে দিয়েছিল হত্যাকারীরা। কী নির্মম মৃত্যু, কী  ভয়ানক খুনের ছক, নিহতদের নগ্ন, ক্ষতবিক্ষত, গলায় ফাঁস পরানো দেহ হতবাক করে দিয়েছিল দুঁদে পুলিশ কর্তাদেরও। খুনের ধরন ও মোটিভ আন্দাজ করে দীর্ঘ তল্লাশিতে ধরা দিয়েছিল চার সিরিয়াল কিলার। চারজনই ছাত্র। কলেজের মেধাবী পড়ুয়া। তাদের নৃশংস ভাবমূর্তি দেখে শিউরে উঠেছিল দেশবাসী। তদন্ত চলেছিল অনেক বছর।

২০১২ সালে নির্ভয়ার গণধর্ষণ ও নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের দোষীরা সাজা পাচ্ছে আর কয়েকদিন পরেই। চার অপরাধী অক্ষয় ঠাকুর (৩১), মুকেশ সিং (৩২), পবন গুপ্ত (২৫) ও বিনয় শর্মার (২৬) রিভিউ পিটিশন খারিজ করে তাদের ফাঁসির সাজাতেই শিলমোহর দেওয়া হয়েছে। অপরাধের ধরন আলাদা হলেও ঘটনার বীভৎসতা ও অপরাধীদের নৃশংতা বারে বারেই ফিরিয়ে দিচ্ছে যোশী-অভয়াঙ্কর হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি।

পুণের অভিনব কালা মহাবিদ্যালয়ের তিন ছাত্র কলা বিভাগের মেধাবী পড়ুয়া। অন্য একজন তাদেরই বন্ধু। পুণেরই অন্য একটি কলেজের বাণিজ্য বিভাগের পড়ুয়া। চার বন্ধু কীভাবে সিরিয়াল কিলার হয়ে উঠেছিল সেই তথ্য এখনও অজানা। তাদের অপরাধগুলোই হাড়হিম অভিজ্ঞতা হয়ে বন্দি পুলিশের ফাইলে।

দশটি খুন—শুরু হয়েছিল ১৯৭৬ সাল থেকে

জানুয়ারি ১৫, ১৯৭৬

রাজেন্দ্র জাক্কাল, দিলীপ সুতার, শান্তারাম জগতাপ ও মুনাওয়ার শাহের প্রথম অপরাধ। বিশ্ব হোটেলের মালিক সুন্দর হেগড়ের ছেলে প্রকাশকে অপহরণ করে চারজন। অপহরণ করে মোটা টাকা মুক্তিপণ আদায়ই অভিপ্রায় ছিল। কিন্তু পরে খুন করা হয় প্রকাশকে। পুলিশ জানায়, টাকা পাঠানোর কথা লিখে বাবাকে চিঠি লিখতে বাধ্য করানো হয় প্রকাশকে। ১৬ জানুয়ারি রাতে গলা প্রকাশের গলায় নাইলনের দড়ি জড়িয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয় তাঁকে। দেহ একটা লোহার ড্রামে ভরে ফেলে দেওয়া হয় লেকের জলে। পরবর্তীকালে তার পচাগলা দেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ।

অগস্ট, ১৯৭৬

কোলাপুরের এক স্থানীয় ব্যবসায়ীর বাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়েছিল চারজন। তবে সেই মিশন সফল হয়নি।

অক্টোবর ৩১, ১৯৭৬

চার সিরিয়াল কিলারের অন্যতম ঘৃণ্য অপরাধ ছিল যোশী পরিবারের সদস্যদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ৩১ অক্টোবর রাতে বিজয় কলোনিতে যোশীদের বাংলোয় হামলা চালায় চারজন। প্রথম নিশানা বাড়ির কর্তা অচ্যুত যোশী। ছুরির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করা হয় তাঁর শরীর। পরে তাঁকে ও তাঁর স্ত্রী ঊষাকে গলায় ফাঁস জড়িয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়। এরপর অচ্যুত যোশীর ছেলে আনন্দকে নগ্ন করে গলায় নাইলনের দড়ি জড়িয়ে খুন করে চারজন। রাতভর চলে এই হত্যালীলা। ভোররাতে বাংলো থেকে নগদ টাকা, সোনাগয়না নিয়ে চম্পট দেয় তারা।

২২ নভেম্বর, ১৯৭৬

আরও একটা ব্যর্থ মিশন। শঙ্করশেঠ রোডে যশোমতী বাফানার বাংলোতে হানা দেয় ২২ নভেম্বর সন্ধ্যায়। বাফানা ও তাঁর দুই পরিচারকের উপস্থিত বুদ্ধিতে শেষে রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হয় চার বন্ধু।

১ ডিসেম্বর, ১৯৭৬

অভয়াঙ্কর হত্যাকাণ্ড নাড়িয়ে দিয়েছিল দেশকে। ১ ডিসেম্বর, সন্ধ্যা ৮টা। ভাণ্ডারকর রোডের স্মৃতি বাংলোতে হানা দেয় চার সিরিয়াল কিলার। হাত-পা বেঁধে, মুখে কাপড় গুঁজে, গলায় ফাঁস জড়িয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয় বাড়ির পাঁচ সদস্যকে। প্রথম নিশানা ছিলেন ৮৮ বছরের প্রবীণ, সংস্কৃতে পণ্ডিত কাশীনাথ শাস্ত্রী অভয়াঙ্কর। এরপরে একে একে খুন করা হয় তাঁর স্ত্রী ইন্দিরাবাই (৭৬), পরিচারিকা সুকুবাই (৬০), কাশীনাথের নাতি ধনঞ্জয় (১৯), নাতনি জুইকে (২০)। পুলিশ জানিয়েছিল, জুইয়ের নগ্ন, ক্ষতবিক্ষত দেহ পড়েছিল একটি ঘরের ভিতরে।

২৩ মার্চ, ১৯৭৭

কলেজেরই সহপাঠী জয়ন্ত গোখলের ভাই অনীল গোখলেকে খুন করা হয় ২৩ মার্চ সন্ধ্যায়। অনীলের বাবা একটি সিনেমা হলের মালিক ছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, আরও দু’বার গোখলেরে বাড়িতে ঢোকার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল চারজন। তৃতীয়বারের চেষ্টায় সফল হয় তারা। বাড়িতে একা পেয়ে অনীলকে গলায় ফাঁস দিয়ে খুন করে দেহ ফেলে দেওয়া হয় মুলা-মুথা নদীতে।

পুণের ইয়েরওয়াড়া জেল

তদন্ত চলে পাঁচ বছর, ফাঁসির সাজা ১৯৮৩ সালে

এসিপি মধুসূদন হুলিয়াকর ঘটনার তদন্ত শুরু করেন। তৈরি করা হয় বিশেষ তদন্তকারী দল। ১৯৭৭ সালের মে মাসে চারজনকে গ্রেফতার করে পুণের ইয়েরওয়াড়া জেলে রাখা হয়। পুণের নগর ও দায়রা আদালতে মামলা শুরু হয় ১৫ মে, ১৯৭৮। চারজনকে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসির সাজা দেন বিচারক ওয়ামান নারায়ণ বাপাত। ১৯৭৯ সালে বম্বে হাইকোর্টও ফাঁসির সাজা বহাল রাখে। চার অপরাধী পরে রিভিউ পিটিশন দাখিল করে সুপ্রিম কোর্টে। ১৯৮০ সালের ১৭ নভেম্বর চারজনের সাজা মুক্তির আবেদন খারিজ করে দেয় দেশের শীর্ষ আদালত। এরপরে রাষ্ট্রপতির কাছেও ফাঁসি রদের আবেদন জানিয়েছিল দোষীরা। সেই আবেদনও খারিজ হয়ে গিয়েছিল। ১৯৮৩ সালের ২৫ অক্টোবর ফাঁসি হয় চারজনের।

Share.

Comments are closed.