যান বাজারে জান কাহিল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সুপর্ণ পাঠক

    খবর বলছে প্রায় ১০ লক্ষ কর্মীর চাকরি বলিতে চড়তে পারে গাড়ির বাজারে। ইতিমধ্যেই অবশ্য নিম্নচাপের সব লক্ষণ ফুটে উঠতে শুরু করেছে। গাড়ি বিক্রির দোকানে ছাঁটাই শুরু হয়ে গিয়েছে। গাড়ির কারখানায় চাহিদার অভাবে গোটা মাস কাজ হচ্ছে না। কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক স্পষ্ট। কাজ খুইয়ে একজন আত্মহত্যাও করেছেন। সব মিলিয়ে একটা দুশ্চিন্তা চেপে বসছে সংশ্লিষ্ট মহলে। এখনও অবশ্য সবার হেঁসেলের আগুন সামলানোর সময় আসেনি। তবে ইঙ্গিত যা তাতে দুর্ভাবনার কারণ আছে বৈকি।

    দুর্ভাবনার কারণ অবশ্যই সেই বাজারের চলতি প্রবচন — গাড়ির বাজার হাঁচলে দেশের বাজারের সর্দি লাগে। যাঁরা দেশের মন্দা বা বৃদ্ধি নিয়ে মাথা ঘামান, তাঁরা বাজারের স্বাস্থ্য বুঝতে এই শিল্পটির নাড়ি আগে টেপেন। কারণ একটাই। এই শিল্প দৌড়লে সবাই দৌড়ই, আর শুয়ে পড়লে বাকিদেরও শয্যাশায়ী হতে দেরি থাকে না। আর গাড়ির বাজারের যা হাল তা দেখে আর যাই হোক স্বস্তিতে থাকার খুব একটা সুযোগ দেখা যাচ্ছে না।

    কেন তা নিয়ে এগোনোর আগে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক গাড়ি তৈরির সংস্থাগুলির উৎপাদনের কী হাল সেই তথ্যের উপর। সিয়াম-এর (সোসাইটি অব ইন্ডিয়ান অটোমোবাইল ম্যানিফাকচ্যারার্স) তথ্য অনুযায়ী গত জুন মাস থেকে এই বছরের জুন মাসের মধ্যে গোটা শিল্পের উৎপাদন কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশের মতো!

    কিন্তু তাতে এত “গেল গেল” রব উঠছে কেন? কারণটা হল লেজ। গাড়ি শিল্পের লেজ বিরাট। বোঝার জন্য একটু পিছনে ফেরা যাক। আমাদের মনে আছে টাটা মোটরস রাজ্যে আসছে বলে আমরা সবাই কেমন একটু আহ্লাদিত হয়েছিলাম। এর মূলে ছিল একটাই চিন্তা। না-শিল্পের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে এবার কিছু কারখানা তৈরি হবে। রাজ্যের ছেলেদের ভিন রাজ্যে চাকরির খোঁজে দৌড়তে হবে না। কেন? একটা গাড়িতে গড়ে তিরিশ হাজার যন্ত্রাংশ লাগে। আর কোনও গাড়ির কারখানার পক্ষেই এত কিছু এক ছাদের তলায় বানানো লাভজনক হয় না। তাহলে উপায়?

    আর এই উপায়ের পথেই ছিল রাজ্যের আহ্লাদের কারণ। এই তিরিশ হাজার যন্ত্রাংশ তৈরি হয় গাড়ি কারখানার অনুসারী শিল্পে। ভাবুন তো? একটা গাড়ি তৈরির কারখানার লেজ কত বড়! আর কত বিনিয়োগ আর কাজের সুযোগ তৈরি হয় একটা কারখানা থেকেই। শুধু এখানেই শেষ নয়। এই অনুসারী শিল্প অন্য গাড়ি কারখানারও যোগান দিয়ে থাকে। একবার এক গুচ্ছ অনুসারী শিল্প কোথাও তৈরি হয়ে গেলে, তার টানে আবার অন্য গাড়ি তৈরির বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি হয়ে যায়। ফ্ল্যাট কেনার সময় যেমন আমরা দেখি অঞ্চলটা কেমন, সব সুযোগ সুবিধা আছে কিনা, বিনিয়োগকারীও একই ভাবে দেখে নেয় তার যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীরা কাছেই আছে কি না। একজন বিনিয়োগ করলে তাই বাকিরাও তার টানে আসতে থাকে। যেমন হয়েছে চেন্নাইতে বা দেশের অন্য রাজ্যে।

    একই ভাবে যে সংস্থা গাড়ি বেচে, তাকেও তৈরি করতে হয় ওয়ার্কশপ। আমরা বলি গ্যারাজ। গাড়ির সারাই, সার্ভিস সব যেখানে হয়। সেখানেও কাজ করেন অনেকে। তাই গাড়ি শিল্পের শুধু বিরাট ল্যাজ নয়, থাকে বিরাট একটা নাকও।  তাই গাড়ির ব্যবসায় যদি গতি কমে, অর্থনীতিও ধাক্কা খায়। আছড়ে পড়ে কাজের বাজারও।

    আর দেশের বাজারে যদি তেজি না থাকে গাড়ির চাহিদায় তার প্রতিফলন হয় আগেই। যাঁরা প্রতি পাঁচ বছরে গাড়ি বদলাতেন, তাঁরা তা করার আগে দু’বার ভাববেন। নতুন গাড়ি কেনার কথা যাঁরা ভাবছিলেন, তাঁরাও ভাববেন দেখে নিই কয়েকটা দিন। আর ছোট মালবাহী গাড়ির চাহিদা বোধহয় সব থেকে আগে জানান দেবে যে ঝড় আসছে।  কারণ, বাজারে চাহিদা কমার চাপ সবথেকে আগে এস পড়ে ছোট ব্যবসায়ীদের ঘাড়েই।

    তথ্যও কিন্তু সেই কথাই বলছে। যাত্রীবাহী গাড়ির উৎপাদন কমেছে ১৬.২৮%, পাশাপাশি ছোট পণ্যবাহী গাড়ির উৎপাদন কমেছে ২৭.১৮%!  তার মানে বাজারে মাল পরিবহণের চাহিদা কমছে। আর এটা কমা মানেই হল লোকের রেস্ত কমছে তাই বাজারে জিনিস আর আগের মতো মানুষ কিনছেন না। বা বাজারে ক্রেতা কমছে। আর রেস্ত কমছে বলেই ছোট গাড়ির চাহিদাও লেজ গোটাচ্ছে।

    এবার চাহিদা কমার অঙ্কটা আর তার প্রভাবটা ভাবুন। এই ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের সাত শতাংশ আসে এই শিল্প থেকে। সেই শিল্পে কর্মসংস্খান কমেছে তিন শতাংশের মতো। অর্থাৎ যে দেশের কাজের বাজারের দুরাবস্থা রাজনৈতিক বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই দেশে এত বড় শিল্পের চাহিদার এই উল্টোরথ আরও দুশ্চিন্তার কারণ বৈকি।

    যে কোনও ব্যবসায়ে খারাপ বাজার মানেই খরচ কমিয়ে লাভ ঠিক রাখার প্রথম রাস্তা ছাঁটাই। শোরুম থেকে নতুন গাড়ি বিক্রি কমা মানেই, গ্যারেজে সারাইয়ের চাহিদা কমার সম্ভাবনা। প্রথমে নতুন নিয়োগ বন্ধ। তারপর পুরনো লোক কমাও। গাড়ি কারখানা যখন দেখবে নতুন গাড়ি তৈরি হচ্ছে, মাঠ ভরে যাচ্ছে কিন্তু তা দোকানে পৌঁছনোর টান নেই তখন প্রথমে উৎপাদন কমাবে, তারপর ছাঁটাই। এখন তো প্রচুর কারখানায় সারামাস চলার মতো কাজই নেই।

    আর এর পরের পর্বটা আরও মারাত্মক। ভাবুন যে শিল্পে একটা গাড়ি তৈরি করতে ৩০ হাজার যন্ত্রাংশ লাগে, তার জন্য কটা ছোট বা মাঝারি কারখানা চলে! কত লোক সেখানে কাজ করে! প্রতিটি গাড়ি উৎপাদনের অঙ্ক থেকে কমে যাওয়া মানে ৩০ হাজার যন্ত্রাংশের ব্রাত্য হয়ে যাওয়া। এবার সেটাকে বেশ কয়েক হাজারে বা লক্ষে নিয়ে গেলে কাজের বাজারে কী হাল হতে পারে তার জন্য খুব বড় অঙ্কবিদ হওয়ার বোধহয় প্রয়োজন হয় না।

    গাড়ির বাজারের এই হাল কিন্তু দেশের এই মুহূর্তের হালের যে গল্প বলছে তা খুব আশাব্যঞ্জক নয়। তবে পর পর তিনটে ত্রৈমাসিক খারাপ না গেলে মন্দা শব্দটা উচ্চারণ করা হয় না। তাই দুশ্চিন্তার মেঘ জমছে, দুর্যোগের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সব নিম্নচাপেই তো বিধ্বংসী ঝড় হয় না। তাই দেখা যাক।

    আরও পড়ুন

    গাড়ি বিক্রি কমায় বাড়ছে দুশ্চিন্তা, জানুন ৬ তথ্য

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More