শনিবার, জানুয়ারি ২৫
TheWall
TheWall

শরদ পাওয়ারই বাজিরাও, হারা ম্যাচ জিতিয়ে দিলেন তিনিই

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

শঙ্খদীপ দাস

নব্বইয়ের দশকে সুপারহিট হয়েছিল শাহরুখ খানের একটি ডায়লগ—‘হার কর জিতনে বালো কো বাজিগর ক্যাহেতে হ্যায়!’
গত সাড়ে তিন দিন মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে যা হল তাই বা বলিউডের কোনও ছবির চিত্রনাট্যের থেকে কম কীসে! এবং শেষে দেখা গেল, শাহরুখের সেই ডায়লগই যেন খেটে যাচ্ছে হুবহু। বিজেপির চালে শুরুতে হেরেও শেষে কিস্তিমাত করলেন বিরোধীরাই। এবং আরও একবার বাজিগর বনে গেলেন শরদ পাওয়ার। তিনিই কিংমেকার। ৭৮ বছর বয়সে পৌঁছেও মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে তিনিই এখনও যেন বাজিরাও।

এই লড়াইটার একেবারে প্রথম দিকে আজ আলোকপাত না করলে ভুল হবে। লোকসভা ভোট সবে হয়েছে। একাই তিনশ পেরিয়ে আত্মবিশ্বাসে টগবগ করে ফুটছে বিজেপি। মহরাষ্ট্রেও দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হচ্ছে বিরোধীদের। যা দেখে রাহুল গান্ধী লড়াইটাই প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। রাজ্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেস যেন হারার আগেই হেরে বসে রয়েছে। শরদ পাওয়ার কিন্তু তা করেননি। ঠিক ভোটের আগেই কাকতালীয় ভাবে দুর্নীতি মামলায় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট যখন তাঁকে সমন পাঠিয়েছিল, তখন এক কথায় হাজিরা দিতে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন পাওয়ার। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তড়িঘড়ি ইডি জানিয়ে দিয়েছিল, না এখনই আসার দরকার নেই। শুধু তা নয়, বিধানসভা ভোটের সঙ্গে লোকসভার একটি আসনের উপনির্বাচন হয়েছিল মহারাষ্ট্রের সাতারায়। এনসিপির সাংসদ দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার জন্যই উপনির্বাচন অনিবার্য হয়েছিল সেখানে। প্রচারের শেষ দিনে সেই সাতারার জনসভায় বৃষ্টিতে সপসপে ভেজা জামা গায়ে টানা পৌনে ঘন্টা বক্তৃতা দিয়েছিলেন ৭৮ বছরের তেজি যুবক। সাতারার খেলা সেদিনই ঘুরে গিয়েছিল। আর মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনে ৫৪ টি আসন জিতে নিয়েছিল এনসিপি। মহারাষ্ট্রে গত বিশ বছর ধরে কংগ্রেসের তুলনায় সাংগঠনিক ভাবে পিছিয়ে থেকেও এই ভোটে সনিয়া-রাহুলদেরও টেক্কা দিয়েছেন তিনি। কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৪৪টি আসন।

বস্তুত গত শনিবারও ঘুম থেকে উঠে গোটা দেশ যখন জানতে পারে যে অজিত পাওয়ারের সমর্থন নিয়ে মহারাষ্ট্রে ফের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গিয়েছেন দেবেন্দ্র ফড়নবিশ, তখন অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে খেলা হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে সেনা-এনসিপি-কংগ্রেসের। প্রকাশ্যে গালমন্দ করে ক্ষোভ জানালেও সরকার গঠনের আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন উদ্ধব ঠাকরে। কিন্তু শারদ পাওয়ার তা করেননি। তিনি বুঝতে পারেন, গোটা দেশ ভাবছে এ খেলা তাঁরই। তিনিই বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন সেনার সঙ্গে। তাই আগে সেই বিভ্রান্তি কাটিয়েছেন। তার পর উদ্ধব ঠাকরেকে ফোন করে বলেছেন, “ভয় পেও না, তুমিই মুখ্যমন্ত্রী হবে। এমন খেলা জীবনে অনেক সামলেছি”।

আরও পড়ুন: করিমপুরের হামলা বাংলা ও বাঙালির পেটেই পদাঘাত

সেই শুরু। তার পর একে একে প্রতিটা ঘুঁটি সাজিয়েছেন সাহেবই। মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে এই নামেও পরিচিত পাওয়ার। গোড়ায় ঠিক ছিল, সেনা-এনসিপি-কংগ্রেস বিধায়কদের প্রতিবেশী কংগ্রেস শাসিত রাজ্যে পাঠানো হবে। কিন্তু পাওয়ারই বুদ্ধি দেন, তা কেন! ওঁরা মুম্বইতেই সব থেকে নিরাপদ। এখানেই থাকবেন। আর শিবসৈনিক ও এনসিপি কর্মীরা তাঁদের পাহারা দেবেন।

ওই এক হুঙ্কারেই অনেকের কাছে বার্তা পৌঁছে যায়। মুম্বইতে হেঁটেচলে বেড়াতে হলে সাহেবের সঙ্গে বেইমানি করা চলবে না। অজিত পাওয়ারের সঙ্গে যাঁরা শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন, সেই ১১ জন বিধায়কের মধ্যে ৬ জনই সেদিন ফিরে আসেন। সাহেবের প্রতি আনুগত্য জানান। মাত্র আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে এনসিপিতে ভাইপো অজিত পাওয়ারকে নিঃসঙ্গ করে দেন মারাঠা স্ট্রং ম্যান। তার পর মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে চূড়ান্ত রায় ঘোষণার প্রাক সন্ধ্যায় মুম্বইয়ের হোটেলে ১৬২ জন বিধায়ককে হাজির করিয়ে এমন চাপ তৈরি করেন যে সর্বোচ্চ আদালতের সামনেও উপায়ন্তর ছিল না।

ক্ষমতার রহস্য!

মহারাষ্ট্র রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আদতে পাওয়ারের জেদটাই রয়েছে, সেইসঙ্গে তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বুদ্ধি। কিন্তু রাজ্য রাজনীতিতে কর্তৃত্ব প্রকৃতপক্ষেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বাস্তব হল, তাঁকে ফের শক্তিমান হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহই। মহারাষ্ট্রে নিতিন গড়কড়ির মতো নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী পদে না বসিয়ে মোদী-শাহ বেছে নিয়েছিলেন দেবেন্দ্র ফড়নবিশকে। যাঁর রাজনৈতিক ওজন কস্মিনকালে ছিল না। স্থানীয় টেক্সটাইল ব্র্যান্ডের মডেল ছিলেন তিনি। এমন নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী করলে একটা লাভ দিল্লির থাকে। তা হল, যেমন বলা হবে তেমনই কাজ করবেন। নিজের বুদ্ধি লাগাবে না। সেটাই হয়তো চেয়েছিলেন অমিত শাহরা। কিন্তু এর উল্টো ফলও এবার তাঁরা দেখলেন। রাজ্য রাজনীতিতে এমন কর্তৃত্বহীন মুখ্যমন্ত্রীকে পেয়ে শিবসেনা সহজেই দর হাঁকানোর সুযোগ পেয়ে যায়। পাওয়ারের খেলাও তাই সহজ হয়ে গিয়েছিল অনেকটাই।

নইলে অতীতে বিলাসরাও দেশমুখ, সুশীল শিণ্ডের মতো মজবুত কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে কিন্তু শরদ পাওয়ার পেরে ওঠেননি। মহারাষ্ট্রে ছোট শরিকদল হিসাবেই থেকে গিয়েছিল এনসিপি। পর্যবেক্ষকদের অনেকে বলেন, এখন যেমন অমিত শাহরা দেবেন্দ্রর উপর ভরসা করেছিলেন, তেমনই অতীতে কংগ্রেসেরও কালিদাস হওয়ার ইচ্ছা হয়েছিল। তাই পৃথ্বীরাজ চৌহানের মতো একজন নরম স্বভাবের নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী করেছিলেন সনিয়া গান্ধী। আর বিলাসরাওকে দিল্লিতে এনে গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকে বসিয়েছিলেন। মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে কংগ্রেসের কর্তৃত্ব দুর্বল হওয়ার সেই ছিল শুরু।

তবে সেই ইতিহাস থাক, মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে যে উপর্যুপরি নাটক হল তাতে এখন বলেই দেওয়া যায় যে ফের শক্তিশালী হয়ে উঠলেন শরদ পাওয়ার। উদ্ধব ঠাকরে মুখ্যমন্ত্রী হবেন ঠিকই কিন্তু আদতে সেই সরকার চালাবেন যশবন্ত রাও চৌহানের ভাবশিষ্যই। রাজ্যে কংগ্রেসও অনেকটাই তাঁর মুখাপেক্ষী হয়ে চলবে।

সার্বিক এই অবস্থায় দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে নতুন আর এক সম্ভাবনার কথা বাতাসে ভাসতে শুরু করেছে। তা হল, শরদ পাওয়ারের ঘরে ফেরা। ১৯৯৯ সালে বিদেশিনী প্রশ্নে সনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে কংগ্রেস ছেড়েছিলেন শরদ পাওয়ার। পিএ সাংমা, তারিক আনোয়ারদের সঙ্গে নিয়ে জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস দল গঠন করেছিলেন। কিন্তু বিজেপিকে রুখে দিতে সেই সনিয়া গান্ধীই যখন তাঁর সাহায্য নিয়ে চলছেন তখন পৃথক দল টিকিয়ে রাখার আর যৌক্তিকতা কোথায়? বড় কথা হল, শরদ পাওয়ার এও বুঝে গিয়েছেন, অজিত পাওয়ারদের জমানায় এনসিপিতে তাঁর মেয়ে সুপ্রিয়া সুলের রাজনৈতিক ভবিষ্যতও সুরক্ষিত নয়। তুলনায় জাতীয় দলে থাকলে সম্মান ও প্রভাব দুইই টিকে থাকতে পারে। তা ছাড়া শরদ পাওয়ারের মতো একজন স্ট্রং ম্যান এখন কংগ্রেসেরও খুব দরকার। খুউব।
দেখা যাক।

গ্রাফিক্স: বৃষ্টিকণা সিরাজ

Share.

Comments are closed.