বাঘে খেয়েছিল বাবা-দাদাকে, কেরল মন্দির উৎসবে প্রথম মুসলিম মহিলা মাহুত শাবানা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: মনিশেরি রাজেন্দ্রন। খুব তেজ। কারও কথা শোনে না। রাজকীয় মেজাজ। কেরল মন্দির উৎসবে হাতিদের দলে রাজেন্দ্রনই নেতা। এমন বিশাল দাঁতালকে বাগে আনতে পারেননি কোনও পুরুষ মাহুতই। রাজেন্দ্রন শুধু একজনের কথাই শোনে। তার সঙ্গেই সখ্য। দু’জনে মুখোমুখি হলে যেন মনের ভাব বিনিময় হয়। জাঁদরেল স্বভাবের রাজেন্দ্রনও একেবারে শান্ত, নিস্তেজ যেন পোষা হাতিটি হয়ে ওঠে। শুধু রাজেন্দ্রন নয়, দাঁতাল ও কুনকিদের সংসারের আত্মীয় হয়ে উঠেছেন ইনি। শাবানা সুলেইমান। ডাক্তারি ছেড়ে শাবানা এখন মাহুত। কেরলের বাসিন্দাদের কাছে শাবানা এক বিস্ময়। হাতির ভাষা নাকি বুঝতে পারেন এই যুবতী।

    চোখের সামনে বাবা-দাদাকে কামড়ে-ছিঁড়ে খেয়েছিল বাঘ। শাবানা তখন কিশোরী। তাঁর দাদু ছিলেন গ্রেট মালাবার সার্কাসের মালিক। পশুদের কীভাবে ট্রেনিং দিতে হয় তিনি ছিলেন তার বিশেষজ্ঞ। শাবানার বাবা ও দাদাও ছিলেন ট্রেনার। বাঘ-সিংহকে ট্রেনিং দিয়ে বশে আনার কৌশল ছিল তাঁদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু বিপদ আসে। দুর্ঘটনা ঘটে যায় একদিন আচমকাই। বিশাল রয়্যাল বেঙ্গলকে ট্রেনিং দেওয়ার সময় আচমকাই হিংস্র হয়ে ওঠে বাঘ। ঝাঁপিয়ে পড়ে দু’জনের উপর। নিমেষে কামড়ে-ছিঁড়ে হত্যা করে দু’জনকেই। সেই দৃশ্য চোখের সামনে দেখেছিলেন শাবানা। তারপর থেকেই পশুদের সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সংকল্প করেন মনে মনে।

    শাবানার কথায়, ‘‘কিশোরীবেলার সেই মর্মান্তিক পরিণতি আমাকে ট্রমার মধ্যে নিয়ে গিয়েছিল। বুঝেছিলাম বন্যপ্রাণকে বুঝতে হলে ওদের সঙ্গে সঠিকভাবে মিশতে হবে। যে বাঘকে বশে এনেছিলেন আমার বাবা-দাদা, সে কীভাবে এমন আক্রমণাত্মক হয়ে উঠল সেটাই বোঝার চেষ্টা করেছিলাম দিনের পর দিন।’’ ওই দুর্ঘটনার পরে অবশ্য সার্কাস কোম্পানি বেচে দিয়েছিলেন শাবানার দাদু, তবে পশুদের প্রতি শাবানার ভালবাসা আর কৌতুহল কমেনি। যেখানেই গিয়েছেন পশুদের ভাব ও ভাষা বোঝার চেষ্টা করেছেন, পড়াশোনা করেছেন বিস্তর।

    উচ্চতা ৫ ফুট। ছোট্টখাট্টো চেহারার মেয়েটি কেরলের কট্টর হিন্দু পুরোহিতদেরও মন জয় করে নিয়েছেন। মন্দির উ ৎসবে হাতিদের সাজিয়ে গুছিয়ে তৈরি করা থেকে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া— সব দায়িত্বই এখন শাবানার কাঁধে। বলেছেন, ‘‘জাতপাত-ধর্ম নিয়ে ভাবিনা। মন্দির কর্তৃপক্ষ এবং পুরোহিতরাই আমাকে সম্মান দিয়েছেন, কাজের দায়িত্বও দিয়েছেন। যত বাঁকা চাউনিই থাক না কেন, আমার কর্তব্যে কোনও ফাঁক থাকবে না।’’

    সাতাশ বছরের শাবানার পেশায় ডাক্তার। প্রথমে দুবাইতে ছিলেন। পরে কোঝিকোড়ের কাদালুন্দিতে প্র্যাকটিস করতেন। ডাক্তারি ছেড়ে হঠাৎ মাহুত কেন? শাবানার কথায়, ‘‘পশুদের সঙ্গে এক অদ্ভুত সখ্য তৈরি সেই ছেলেবেলা থেকেই। পশুপাখিদের আমি ভালবাসি। তাদের ভাষা বোঝার চেষ্টা করি। হাতিদের মনের ভাব আমি বুঝতে পারি।’’ ডাক্তারি ছেড়ে মাহুত হওয়ার সিদ্ধান্তটা অবশ্য শাবানার নিজের। পাশে পেয়েছেন পরিবারকে। একমাসের ট্রেনিংও নিয়েছেন এর জন্য।

    শাবানা বলেছেন, প্রথমে মন্দির কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেননি। কারণ ধর্মের ভেদ তো ছিলই, একজন মহিলা মাহুত হবেন এই কথা শুনে চোখ কপালে উঠেছিল অনেকেরই। হাসি-কৌতুকও করেছিলেন অনেকে। ছোট্টখাট্টো চেহারার শাবানা যে বিরাট বপুর দাঁতালকে বাগে আনতে পারবেন, সে ধারণা তখন কারও হয়নি। তবে চমক জাগে এর পরেই। শাবানা যখন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রতিটি হাতিকে নিজের বশে করে ফেলেন। এখন নাকি নেতা-হাতি রাজেন্দ্রন শাবানার কথাতেই ওঠাবসা করে।

    ‘‘ওদের সঙ্গে আমি এক বাঁধনে জড়িয়েছি। হাতিদের গলায় বা হাতে-পায়ে শিকল পরাই না। ওরা ছাড়াই থাকে। শিকল নয় মনের টানেই ওদের সঙ্গে আত্মার বাঁধন তৈরি হয়েছে। ওরা কী বলতে চায় আমি বুঝতে পারি, তাই হয়তো আমার কথা শোনে,’’ বলেছেন শাবানা। হাতি নিয়ে এখন গবেষণা করছেন তিনি। ওট্টাপ্পালামের হাতি বিশেষজ্ঞ মনিশেরি হরিদাসের কাছে হাতি নিয়ে পড়াশোনা করছেন। মনিশেরি বলেছেন, শাবানার হাতেকলমে কাজ শেখার কোনও দরকারই নেই। তিনি এক বিস্ময়-কন্যা। খুব সহজেই পশুদের সঙ্গে সখ্য পাতাতে পারেন।

    পালাক্কাড়ের মন্দির উৎসবে দাঁতাল রাজেন্দ্রনের সঙ্গেই দেখা যাবে শাবানাকে। এই প্রথমবার কোনও কট্টর, সংস্কারবদ্ধ হিন্দু-উৎসবের পুরোভাগে থাকবেন এক মুসলিম মহিলা মাহুত।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More