বুধবার, নভেম্বর ২০
TheWall
TheWall

ইসরোর বড় ঘোষণা! চাঁদের পরে সূর্যের দেশে, ইতিহাস গড়বে আরও তিন অভিযান  

দ্য ওয়াল ব্যুরো: চন্দ্রযান ২ লক্ষ্যের ইতি নয়। বরং আরও বড় অভিযানের সূচনা। দিল্লি আইআইটির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গিয়ে ঘোষণা করলেন ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর চেয়ারম্যান কে শিবন। চন্দ্রযাত্রার পরবর্তী মিশনগুলো আরও বড় এবং ইতিহাস তৈরি করবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

ভারতের চন্দ্রযাত্রা ব্যর্থ হয়নি, এ কথা আগেই জানিয়েছিল ইসরো। চন্দ্রযানের ল্যান্ডার বিক্রম মুখ থুবড়ে (Hard Landing) পড়ে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর আঁধারে হারিয়ে গেলেও জেগে আছে অরবিটার। চাঁদের কক্ষপথে (Lunar Orbit) পাক খেতে খেতেই একটার পর একটা চমক দিয়ে যাচ্ছে সে। অরবিটারের আটটি পে-লোডের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় লার্জ এরিয়া সফট এক্স-রে স্পেকট্রোমিটার (CLASS), অরবিটার হাই রেজোলিউশন ক্যামেরা (OHRC) এবং ডুয়াল ফ্রিকোয়েন্সি সিন্থেটিক অ্যাপারচার রেডার’ (DF-SAR) কখনও চাঁদের ধুলো রেগোলিথের (Regolith) হাল-হকিকত ব্যাখ্যা করছে, কখনও তার হাই রেজোলিউশন ক্যামেরায় (Orbiter High Resolution Camera -OHRC) ধরা পড়ছে দক্ষিণ মেরুর ‘ বোগুলস্কি ই-ক্রেটার’ (Boguslawsky E-Crater)।  অরবিটারের ‘ডুয়াল ফ্রিকোয়েন্সি সিন্থেটিক অ্যাপারচার রেডার’ (DF-SAR)-এ ধরা পড়েছে চন্দ্রপৃষ্ঠের অনেক অজানা ও রহস্যময় গহ্বরের ছবি। সশরীরে চাঁদে অবতরণ না করেও, চাঁদের মাটির গোপন কথা তুলে আনবে চন্দ্রযানের অরবিটার।

আরও পড়ুন: চাঁদের গহ্বরে চোখ রাখল অরবিটারের রেডার, অবিশ্বাস্য সাফল্য চন্দ্রযানের

সূর্যের দেশে পাড়ি

চন্দ্রযাত্রায় চমক থাকতে থাকতেই পরবর্তী মিশনগুলোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে ইসরো। আগামী বছর থেকে জোরকদমে আরও তিন ঐতিহাসিক লক্ষ্যের পথে পা বাড়াবে ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। শিবন বলেছেন, “হেরে গেলে চলবে না। চাঁদের পরে সূর্যের দেশে ছুটবে ইসরো। গগনযানে চেপে মহাকাশে পাড়ি দেবেন তিন নভশ্চর। পৃথিবীর কক্ষপথে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি স্পেস স্টেশন বানানোর কাজও শুরু হবে। নাসার লুনার স্টেশনের মতো মহাকাশে নিজেদের বাড়ি বানিয়ে নতুন নজির গড়বে ভারত।”

ইসরোর ‘সোলার মিশন’ (Solar Mission) নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। কারণ নাসা আর ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ইএসএ বা ‘এসা’) পর ভারতই প্রথম পাড়ি দিচ্ছে সৌর-মুলুকে। এই অভিযান সফল হলে, মহাকাশবিজ্ঞানের ইতিহাসে পাকাপাকি ভাবে সেরার শিরোপাটা ছিনিয়ে নেবে ভারত। ইসরোর চেয়ারম্যান কে শিবন বলেছেন, ‘‘পৃথিবী থেকে ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরে সূর্য ও পৃথিবীর মাঝের এক কক্ষপথ ‘ল্যাগরাঞ্জিয়ান পয়েন্ট’ বা ‘ল্যাগরেঞ্জ পয়েন্ট’-এ ল্যান্ড করবে স্যাটেলাইট আদিত্য এল-১। সূর্যের বাইরের সবচেয়ে উত্তপ্ত স্তর করোনার যাবতীয় তথ্য সে তুলে দেবে আমাদের হাতে। এই সোলার-মিশন তাই সবদিক দিয়েই খুব গুরুত্বপূর্ণ।’’ ২০২০ সালের প্রথম দিকেই সূর্যের দিকে পাড়ি জমাবে আদিত্য এল-১।

জ্বালানি-সহ প্রায় ১৫০০ কিলোগ্রাম ওজনের এই উপগ্রহ সাতটা সায়েন্স পে-লোড নিয়ে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষ ৮০০ কিলোমিটার থেকে হলো অরবিট ল্যাগরেঞ্জ পয়েন্টের দিকে যাত্রা করবে। পৃথিবী ও সূর্যের মাঝের একটি অরবিট বা কক্ষপথ হলো এই ল্যাগরেঞ্জ পয়েন্ট। পৃথিবী থেকে যার দূরত্ব ১৫ লক্ষ কিলোমিটার। এই পথটাই পাড়ি দেবে ইসরোর সর্বাধুনিক উপগ্রহ আদিত্য এল-১। আদিত্য এল-১ কে তাই সে ভাবেই বানানো হচ্ছে যাতে কক্ষপথের বিপুল চাপ সহ্য করে অন্তত এক বছর ধরে ছবি ও যাবতীয় তথ্য সে অবিরাম পাঠিয়ে যেতে পারে।

আরও পড়ুন: মঙ্গলে ঋতু বদলায়, তুষার ঝড়ে ঢাকে গিরিখাত, ফুঁসে ওঠে আগ্নেয়গিরি, আর কী কী দেখেছে মঙ্গলযান

ভারতের মঙ্গলযাত্রা

উঁচু-নিচু গিরিখাত, প্রলয়ঙ্কর আগ্নেয়গিরি, মেঘে ঢাকা পাহাড়, তারই উপত্যকায় সুবিশাল হ্রদ— রহস্যময় লাল গ্রহের পর্দা একে একে খুলেছে ইসরোর মঙ্গলযান। রাশিয়ার ROSCOSMOS, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাসা (NASA) এবং ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সির (ESA) মতো মঙ্গলযাত্রার ইতিহাসে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে ইসরোর Mars Orbiter Mission (MOM)। ২০১৩ সালের সেই ঐতিহাসিক যাত্রার পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। পরবর্তী মঙ্গল-অভিযানের জন্য তৈরি হচ্ছে ভারত। দ্বিতীয় মঙ্গলযাত্রা হবে ২০২২-২৩ সালেই। লাল গ্রহের রহস্যের খোঁজে ফের ছুটে যাবে ইসরোর Mars Orbiter Mission 2 বা MOM 2

মঙ্গলের মাটির গঠন, চরিত্র, আবহাওয়ার প্রকৃতি, বাতাসে মিথেন গ্যাসের অস্তিত্ব, বাযুমণ্ডলে অ-তরিদাহত কণার গবেষণা চালাবে মঙ্গলযান। ‘মম’ দেখাবে, মঙ্গলে দিন-রাত আছে, ঋতু পরিবর্তন আছে, আছে উত্তর ও দক্ষিণ মেরু, খুব উঁচু পাহাড় আছে, বিরাট আগ্নেয়গিরি আছে, বিশাল নদীখাতও আছে, যা একদা সেখানে জল থাকার প্রমাণ দেয়।

আরও পড়ুন:  চাঁদের পাড়ায় উঁকি, মঙ্গলে চোখ, ‘স্পেস স্টেশন’ বানাতে চলেছে ইসরো, চন্দ্রযানের পর বড় মিশন ভারতের

মহাকাশে চষে বেড়াবে গগনযান

বায়ুসেনার অফিসার রাকেশ শর্মা মহাকাশে পাড়ি দিয়েছিলেন রুশ মহাকাশয়ান ‘সয়ুজ টি-১১’-এ চেপে। গগযান হল প্রথম দেশি মহাকাশযান, যা মানুষ পিঠে নিয়ে মহাশূন্যে ঘুরে বেড়াবে। ভারতের এই ‘Manned Space Mission’-এর দিনকাল এখনও সঠিক ভাবে ঘোষণা করা হয়নি। প্রযুক্তিগত সব দিক ঠিক থাকলে ২০২১-২০২২ সালের মধ্যে তিন নভশ্চরকে নিয়ে মহাকাশে উড়ে যাবে গগনযান। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার এত বড় মিশন তো আর শুধু নাম কেনার জন্য নয়। তাহলে গগনযানের উদ্দেশ্য কী ?

ইসরো চেয়ারম্যান শিবন জানিয়েছেন, মহাকাশে গগনযানের ভিতর মোটামুটি সাত দিন থাকবেন নভশ্চররা। এই সময়ের মধ্যে তাঁদের কাজ হবে মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা মাধ্যাকর্ষণ-শূন্য দশা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো। গগনযানের বিশেষ ক্যামেরায় ধরা পড়বে পৃথিবীর কক্ষপথের হাল-হকিকত। গগনযানের ভিতরেও ওজন-শূন্য অবস্থায় থাকবেন মহাকাশচারীরা। সেই সময় তাঁদের অভিজ্ঞতা কেমন, বেঁচে থাকার জন্য তাঁদের কেমন রসদই বা দরকার তার খুঁটিনাটি জানতে পারবে ইসরো।

ইন্ডিয়ান স্পেস স্টেশন

আগামী বছর ডিসেম্বরে থেকেই স্পেস স্টেশন বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। পৃথিবীর সর্বনিম্ন কক্ষপথে একটা আস্ত বাড়ি বানানো তো মুখের কথা নয়! পৃথিবী থেকে পাড়ি দেওয়া মহাকাশচারীদের থাকার ঘর করতে হবে। আলট্রাভায়োলেট রশ্মি বা যে কোনও মহাজাগতিক রশ্মির বিকিরণ থেকে স্পেস স্টেশনকে রক্ষা করার মতো পরিকাঠামো থাকতে হবে। স্টেশনের ভেতরে ও বাইরে তাপমাত্রার একটা ভারসাম্য থাকবে। সব মিলিয়ে কাজটা খুবই কঠিন। ইসরোর চেয়ারম্যান কে শিবন জানিয়েছেন, প্রাথমিক ভাবে মালমশলা নিয়ে পৃথিবীর কক্ষপথে জড়ো করার চেষ্টা হবে। মহাকাশবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে  Space Docking Experiment (Spadex)। এই স্প্যাডেক্সের কাজ করবে দুটি স্যাটেলাইট।

পিএসএলভি রকেটে চাপিয়ে দুটি উপগ্রহকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের বাইরে। পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতেই স্পেস স্টেশন বানানোর জায়গা বের করে ফেলবে তারা। এর পর শুরু হবে বাড়ি বানানোর প্রক্রিয়া Docking Technology। শিবন জানিয়েছেন, এর জন্য দুটি স্যাটেলাইটের গতি নির্দিষ্ট মাত্রায় রাখতে হবে। না হলে তারা নিজেদের মধ্যেই ধাক্কাধাক্কি করবে। মহাশূন্যে সবকিছুই ভর-শূন্য দশায় থাকে। অর্থাৎ মাইক্রোগ্র্যাভিটি (মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব যেখানে নেই) কাজ করে। কাজেই সব দিক ভেবেচিন্তে, বিচারবিবেচনা করেই নকশা বানাতে হবে স্যাটেলাইট দুটিকে।

 

আরও পড়ুন:

চাঁদে পাড়ির পাশাপাশি সৌর সন্ধান, সূর্যের দেশে যাবে ইসরোর ‘আদিত্য এল-১’

Comments are closed.