মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২১
TheWall
TheWall

ইসরোর মঙ্গলাকে চেনেন? আন্টার্কটিকায় ৪০৩ দিন কাটিয়ে বিশ্বরেকর্ড করেছিলেন এই ভারতীয় মহিলা

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

চৈতালী চক্রবর্তী

“ওই ঠাণ্ডা হাড়-মজ্জা-রক্ত সব জমিয়ে দেয়। দিগন্ত জুড়ে শুধু সাদা বরফের স্তর। ২২ জন অপরিচিত পুরুষের মাঝে আমি একা মহিলা,” আন্টার্কটিকা অভিযানে গিয়ে ইসরোর এই মহিলা বিজ্ঞানীর অভিজ্ঞতা সাড়া ফেলে দিয়েছিল গোটা দেশে। দেশের একমাত্র মহিলা বিজ্ঞানী যিনি টানা ৪০৩ দিন কাটিয়ে এসেছিলেন দক্ষিণ মেরুতে। মঙ্গলা মানি। ৫৬ বছরের মঙ্গলা হায়দরাবাদের ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং সেন্টার থেকে স্যাটেলাইটের তথ্য সংগ্রহ করতে ২৩ জনের দল নিয়ে পৌঁছেছিলেন দক্ষিণ মেরুতে। ২০১৬ সালে। এক বছরেরও বেশি সময়ের তাঁর এই জার্নি ইতিহাস তৈরি করেছে দেশে।

চিন, রাশিয়ার মতো ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র ইসরোরও স্পেস সেন্টার রয়েছে আন্টার্টটিকায়। গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে কাজ করতেই মঙ্গলরা দল পৌঁছেছিল বরফের দেশে। দক্ষিণ মেরুই এমন একটা জায়গা যেখান থেকে একসঙ্গে ১০-১৪ টি কক্ষপথ নিরীক্ষণ করা যায়। ভারতের সে সব কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট দক্ষিণ মেরুতে নজরদারি চালায় তাদের সমস্ত তথ্য বা ডেটা সংগ্রহ করে এই আর্থ স্টেশন। সেই তথ্য সংগ্রহের কাজই করতে গিয়েছিলেন মঙ্গলা মানি। ২০১৬ থেকে এক বছরেরও বেশি সময় তাঁকে কাটাতে হয় আন্টার্কটিকায়। ভারতের মতো চিন, রাশিয়ার মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র থেকেও বিজ্ঞানীরা গিয়েছিলেন একই কাজে। তবে সকলেই ছিলেন পুরুষ। ওই ৪০৩ দিনের অভিযানে বরফের দেশে মঙ্গলাই ছিলেন একমাত্র মহিলা বিজ্ঞানী। কাজে দক্ষ এবং সবচেয়ে বেশি সাহসী।

লক্ষ্যের পথ সহজ ছিল না, অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছিল হাজার বার

দক্ষিণ মেরু অভিযানের পথ খুব একটা সহজ ছিল না, জানিয়েছেন মঙ্গলা। দুর্গম বরফের দেশে দিনের পর দিন কাটানো কষ্টসাধ্যই নয় যথেষ্ট মানসিক জোর দরকার হয়। হায়দরাবাদের রিমোট সেন্সিং সেন্টার থেকে স্যাটেলাইট ডেটা সংগ্রহ করতে দক্ষিণ মেরুতে যে দলকে পাঠানো হয় তার নির্বাচন বিশেষভাবে করেন কর্তৃপক্ষ। যতরকমের শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষা হয়, তার সবকটিই পার হতে হয় বিজ্ঞানীদের দলকে। মহিলা বলে ছাড়া পাননি তিনিও। প্রস্তুতিপর্ব ছিল যথেষ্ট কঠিন। মঙ্গলা বলেছেন, প্রথমে বেশ কয়েক সপ্তাহ শারীরিক ও মানসিক জোরের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। দিল্লির এইমসে ধারাবাহিক ভাবে মেডিক্যাল পরীক্ষাও হয়েছিল তাঁর। সব শেষে দু’সপ্তাহ ধরে উত্তরখণ্ডের আউলিতে ৯০০০ ফুট এবং বদ্রীনাথে ১০ হাজার ফুট ট্রেক করতে হয়েছিল। সেই এক্সপিডিশনেও তিনি ছিলেন একা মহিলা। শারীরিক ক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য পিঠে চাপিয়ে দেওয়া হত ভারী ব্যাকপ্যাক। পুরুষ ও মহিলাতে কোনও তফাৎ করা হত না। সবকটি পরীক্ষাই দক্ষতার সঙ্গে পার করে গিয়েছিলেন তিনি। তাই ২২ জন পুরুষের দলের মধ্যে তাঁকেই সেরা বলে নির্বাচন করেছিলেন কর্তৃপক্ষ।

তাপমাত্রা মাইনাস ৯০, হাড়হিম ঠাণ্ডা যেন গিলে খেত

২০১৬ সালের নভেম্বরে ২৩জনের দল নিয়ে দক্ষিণ মেরুর ভারতীয় গবেষণা কেন্দ্র ‘ভারতী’তে যখন পৌঁছেছিলেন মঙ্গলা তখন তিনিই একা মহিলা ছিলেন সে বরফের দেশে। চিন, রাশিয়া থেকেও বিজ্ঞানীদের দল গিয়েছিলেন, প্রায় জনা ৪০। মঙ্গলা বলেছেন, সকলেই তাঁকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। একেই দুর্গম এলাকা, সেখানে এক বছরের বেশি থেকে গবেষণা করবেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক মহিলা। তাঁদের বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই নাকি অনেক সময় লেগেছিল।

গবেষণা শুরুর প্রথম কয়েক দিন বেশ উত্তেজনা ছিল, জানিয়েছেন মঙ্গলা। কিন্তু মানসিক স্থিতি টলতে শুরু করে কিছুদিন পর থেকেই। মঙ্গলার কথায়, “তাপমাত্রা সবসময়েই হিমাঙ্কের ৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াস নীচে থাকত। বাইরে ২-৩ ঘণ্টার বেশি কাটানোই ছিল দুঃসাধ্য। মনে হত ঠাণ্ডা বুঝি রক্ত জমাট করে দেবে।” আরও একটা সমস্যা হত এত দিগন্ত বিস্তৃত বরফের স্তর দেখে। মঙ্গলা বলেছেন একটা সময় যেন অবসাদ গ্রাস করত। চারদিকে শুধু বরফ আর বরফ। নিঃস্তব্ধ, নির্জন এক প্রান্তর ঢেকে রয়েছে সাদা চাদরে। তার উপর হাড়হিম ঠাণ্ডা। প্রতি মুহূর্তে শরীরের দিকে নজর রাখতে হত, না হলেই ঘোর বিপদ।

“খাবার নষ্ট করা যেত না একেবারেই। এক বছরের মতো খাবার ও রান্নার জ্বালানি আমাদের দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেইসবই পরিমাপ মতো খরচ করতে হত,” বলেছেন মঙ্গলা মানি। দক্ষিণ মেরুকেও গ্রাস করেছে মানুষের তৈরি দূষণ, জানিয়েছেন মঙ্গলা। যাঁরাই এখানে অভিযানে আসেন নানারকম ভাবে বর্জ্য ছড়িয়ে রেখে চলে যান। খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিক ছড়িয়ে থাকে যত্রতত্র। দক্ষিণ মেরু থেকে ফেরার সময় এমনই অনেক বর্জ্য সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন মঙ্গলা ও তার দল।

আন্টার্কটিকায় ইসরোর গ্রাউন্ড স্টেশন


ছোট থেকেই গবেষণার স্বপ্ন দেখতেন, পছন্দের বিষয় ছিল ভূগোল, পদার্থবিদ্যা

সৈফাবাদের হোলি মেরি গার্লস হাইস্কুলের মেধাবী মেয়েটা একদিন বিশ্বে দৃষ্টান্ত তৈরি করবেন এ কথা ভাবেননি মঙ্গলার মা, বাবা। ভূগোল পড়তে ভালবাসতেন মঙ্গলা। জানিয়েছেন, পছন্দের বিষয় ছিল পদার্থবিদ্যা, রসায়ন। নাসার মঙ্গল-অভিযানের খবর পড়ে উত্তেজিত হয়ে উঠতেন তিনি। খবরের কাগজে, ম্যাগাজিনে মহাকাশ গবেষণা বিষয়ে সবরকমের তথ্য ছিল তাঁর কণ্ঠস্থ।
মডেল ডিপ্লোমা ফর টেকনিশিয়ানস-রেডিও অ্যাপারেটাস (MDT-RA) কোর্সে যখন ভর্তি হয়েছিলেন সেখানে ৮০ জনে ছেলের ব্যাচেও তিনি ছিলেন একা মহিলা। চার বছরের ডিপ্লোমা কোর্সে তাঁর ফল ছিল দুরন্ত। হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেডে প্রশিক্ষণ শুরু হয় তাঁর। প্রজেক্টের জন্য ডাক পড়ে ইসরোতে। সেই শুরু। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মঙ্গলাকে।

বর্তমানে হায়দরাবাদের রিমোট সেন্সিং সেন্টারেই কর্মরত মঙ্গলা। গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে স্যাটেলাইট ডেটা সংগ্রহ করাই তাঁদের কাজ। মঙ্গলা বলেছেন, ফের একবার আন্টার্কটিকা অভিযানের ডাক পড়লে তিনি একবাক্যে রাজি। বলেছেন, “লিঙ্গভেদ আমি মানি না। লক্ষ্যের পথে পুরুষ-নারীর ভেদাভেদ হয় না। যত দুর্গমই চলার পথ হোক না কেন, আমি চাই মহিলারাও তাঁদের স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে আসুক। সমাজ ও পারিপার্শ্বিকের সব বাধা তুচ্ছ করে।”

Share.

Comments are closed.