সোমবার, অক্টোবর ১৪

দু’বছরের নীচে ৭% শিশু অপুষ্ট, মায়েরা ভুগছে রক্তাল্পতায়, এগিয়ে অন্ধ্র, কেরল, চমকে দিল সমীক্ষা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: অপুষ্ট ভারত। অপুষ্ট শৈশব। কমপ্রিহেনসিভ ন্যাশনাল নিউট্রিশনাল সার্ভের (CNNS) সমীক্ষা চমকে দিল দেশকে।

অন্ধ্রপ্রদেশে দুই শিশু দলা দলা মাটি খেয়ে মরেছিল। অনাহারে মৃত্যুর প্রসঙ্গটা কৌশলে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। বারাণসীতে খিদের জ্বালায় নিজের তিন শিশুকন্যাকে বাবা বিষ খাইয়ে মারার পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। দিনকয়েক আগেই মধ্যপ্রদেশে ফের অনাহারে মৃত্যু হয় আট বছরের শিশুর। সিএনএসএস-এর রিপোর্ট বলছে মিথ্যা নয়। অনাহার, অপুষ্টিজনিত রোগে ভোগা শিশুর সংখ্যায় ভারতের স্থান প্রথম সারিতে। অপুষ্টির ছায়া সবচেয়ে বেশি গ্রাস করেছে অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরলের মতো রাজ্যকে। তুলনায় অবস্থার উন্নতি হয়েছে ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্তীসগড়, অসমের।

অপুষ্ট শৈশব

সিএনএনএস-এর রিপোর্ট বলছে দু’বছর বয়সের কম ৬.৪ শতাংশ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। এগিয়ে রয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশ (৩৫.৯%), কেরল (৩২.৬%)।  পিছিয়ে নেই তামিলনাড়ুও। অপুষ্টির হার সেখানে ৪.২%। মহারাষ্ট্রে ২.২%। তালিকায় রয়েছে গুজরাট, কর্নাটকও (৩.৬%)। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের সমীক্ষা বলছে, পাঁচ বছরের নীচে ৩৫ শতাংশ শিশুর বয়সের তুলনায় প্রয়োজনীয় বৃদ্ধি হয়নি। ১৭ শতাংশ শিশু দিনে একবার আধপেটা খেয়ে থাকে। এদের ওজন কম, উচ্চতাও কম। অপুষ্টি, বয়সের সঙ্গে বৃদ্ধির মতো বিষয় নিয়ে সমীক্ষায় স্পষ্ট, ভারতে ৫ বছরের নীচে প্রতি পাঁচটি শিশুর মধ্যে একটির উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম। প্রতি তিন জনে এক জন বয়সের তুলনায় খর্বকায়।

২০০৫-০৬ সালে দেশের ৫ বছরের কমবয়সী শিশুর ৭০ শতাংশ ছিল অপুষ্টিজনিত রোগের শিকার। ২০১৫-১৬ সালে দেশের ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই হার ৩৮-৭৮ শতাংশের মধ্যে। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষাও বলছে, দেশে পাঁচ বছরের নীচে থাকা প্রায় ৫৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে সাত কোটি শিশু রক্তাল্পতায় ভোগে। বয়সের তুলনায় ওজন কম সাড়ে চার কোটি শিশুর। যার মূল কারণ অপুষ্টি। হিমোগ্লোবিনের অভাবে এই শিশুরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে সহজে। রোগের শিকার হয়। অপুষ্টির কারণে এদের মস্তিষ্কেরও পূর্ণ বিকাশ ঘটে না।

আরও পড়ুন: পেটে খাবার নেই, ধুঁকতে ধুঁকতে মারা গেল আটের শিশু, অন্ধ্রের পর দেশের লজ্জা মধ্যপ্রদেশ

বাড়ছে জনসংখ্যা, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপুষ্টি, রক্তাল্পতা

ইউনিসেফের রিপোর্ট বলছে, ২০১৯ সালের প্রথম দিনে ভারতে ৬৯ হাজার ৯৪৪ জন নবজাতকের জন্ম হয়েছে। শিশু জন্মের হারে ১৩০ কোটির ভারত বছরের প্রথম দিনটিতে চিনকেও টপকে যায়। চিনের ক্ষেত্রে সেই সংখ্যাটা ছিল ৪৪ হাজার ৯৪০। গোটা দুনিয়ার অর্থনৈতিক মানচিত্রে ভারতের অবস্থান কী দাঁড়াবে, সেই বিষয়ে ২০০৮ সালে ‘দ্য ইকনমিস্ট’ একটি তালিকা প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি-র নিরিখে ২০৫০ সালের মধ্যে ভারত আমেরিকার সমান হবে। ২০২৫ সালের পর চিনের জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার খুবই কমে আসবে এবং সেই জায়গাটা পাকাপাকি ভাবে দখল করে নেবে ভারত।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে দারিদ্র্য, অনাহার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর রিপোর্ট বলছে, বিশ্ব জুড়ে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রায় ৬১ কোটি মহিলা রক্তাল্পতায় ভোগেন। আর আমাদের দেশের নিরিখে তা প্রায় ৫১ শতাংশ। ২০১৭ সালের ‘গ্লোবাল নিউট্রিশন রিপোর্ট’ অনুযায়ী, ১৪০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান সবার নীচে। প্রজননক্ষম মহিলাদের মধ্যে রক্তাল্পতায় আক্রান্তদের সংখ্যা অত্যধিক। প্রত্যন্ত এলাকাগুলো শুধু নয়, শহর থেকে শহরতলি–অনেক মহিলাই গর্ভবতী অবস্থায় সঠিক চিকিৎসা এবং পরিচর্যা পাননা। যার প্রভাব পড়ে গর্ভস্থ ভ্রূণ ও নবজাতকের উপর। আমাদের দেশে প্রসূতি মৃত্যুর শতকরা কুড়ি ভাগ ঘটে রক্তাল্পতার কারণে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ‘হু’-র মতে অসচ্ছল আর্থ-সামাজিক কারণ এর জন্য দায়ী। বিশ্ব ব্যাঙ্কের ২০১৬-র তথ্য বলছে, এ দেশের ২৭ কোটি মানুষ এখনও দারিদ্রসীমার নীচে। ফলে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় ওই শিশুরা  এক দিকে যেমন পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তেমনই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বড় হওয়ায় প্রায়ই এরা রোগের শিকার হয়। তা ছাড়া, সচেতনতার অভাব একটা বড় কারণ। পরিসংখ্যান বলছে, মায়েদের মাত্র ৯ শতাংশ অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে এসে স্বাস্থ্যচেতনার পাঠ পান। মা সারা দিন বাড়িতে কতটা সুষম আহার খাচ্ছেন বা শিশুকে দিচ্ছেন, সেটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দামি দামি খাবার খেতে হবে, তা নয়, বরং সস্তার কোন খাবার খেলে কতটা পুষ্টি হতে পারে, তা মায়েদের জানানো খুবই দরকার। শুধু তা-ই নয়, সেই খাবার গ্রহণের ঠিক পদ্ধতি জানানোও একান্ত আবশ্যক।

আরও পড়ুন:

৪২-এর মায়ের ২৪টি সন্তান, তিনি রক্তশূন্য হবেন না তো কে হবেন?

Comments are closed.