মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৭

তিহাড় জেলে কয়েদিদের বিউটি পার্লার, প্রতি শনিবারের ‘মোলাকাত’-এর আগে ঠেলাঠেলি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পরিবারের লোকজন দেখা করতে আসেন শনিবার। তার আগেই ফেসিয়াল সেরে নেয় বছর পঁয়ত্রিশের সুনিতা সিং। দীর্ঘ একমাস পরে স্বামীর সঙ্গে দেখা হবে, তার আগে নিজেকে একটু সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে হবে তো! সুনিতা খুনের আসামি। দিল্লির তিহাড় জেলই তার ঠিকানা। যে পার্লারে সে প্রতি মাসে ঢুঁ মারে সেটাও জেলের ভিতরেই। ফেসিয়াল, স্পা, হেয়ার ড্রেসিং, নেল পেন্ট যাই করাও, এক্কেবারে সস্তা। হালফিলের পার্লারের সঙ্গে খরচের বিস্তর ফারাক। আর বিউটিশিয়ানদের হাতের জাদুও বলার নয়। বলে বলে গোল দিতে পারে শহরের যে কোনও নামী পার্লারকে। আর বিউটিশিয়ানরা? তারাও অপরাধী। বিচারাধীন বন্দি। অন্ধকার থেকে আলোর পথে উত্তরণের চেষ্টা চালাচ্ছেন নিজেদের পছন্দের পেশার হাত ধরে।

দিল্লির তিহাড় জেলের ৬ নম্বর সেল। এখানে মহিলাদেরই ঠিকানা। চলতি বছরে বিচারক মুক্তা গুপ্ত ও বিচারক এম সিং জেল কর্তৃপক্ষকে মহিলাদের জন্য সেমি-ওপেন জেল তৈরির নির্দেশ দেন। উদ্দেশ্য মহিলাদের নিজেদের মতো করে বাঁচার রাস্তা তৈরি করে দেওয়া। তিহাড়ের ৬ নম্বর সেল এখন বদলে গেছে সেমি-এপেন কমপ্লেক্সে। এখানে বিউটি পার্লার আছে, ফ্যাশন ল্যাবও আছে। মহিলাদের বিউটিশিয়া কোর্সে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কাজ শিখে নিলেই বিউটি পার্লারে কাজ।

তিহাড়ের সেমি-ওপেন জেল

সুনিতা এই পার্লারের খদ্দের। তাঁরই মতো জেলের অন্যান্য মহিলা অপরাধীরাও নিজেদের ফিটফাট করে তুলতে এই পার্লারে ভিড় জমান। বাইরে থেকে মহিলাদের আসারও অনুমতি রয়েছে। তবে সেটা ঠিক করেন জেলের ওয়ার্ডেন। পার্লারের দেখাশোনা দায়িত্বে থাকা ওয়ার্ডেন জানালেন, শুক্রবার পার্লারের ভিড় একটু বেশি হয়। কারণ প্রতি সপ্তাহে শনিবার জেলবন্দিদের দেখতে পরিবারের লোকজন আসেন। তার আগে অনেক মহিলাই নিজেদের সুন্দর করে সাজিয়ে তুলতে পার্লারে আসেন।

শুক্রবার বেলা ৩টে বাজলেই, জেলের অন্যান্য অংশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। খোলা থাকে মহিলা সেলের এই পার্লারের দরজা। রক্ষীও থাকে। তবে ভয় নেই। কারণ এই মহিলারা নিজেদের পেশাকে ভালোবেসে ফেলেছেন। চার দেওয়ালের আঁধারে অপরাধীর তকমা নিয়ে বাঁচতে চাননা কেউই। এদের কেউ এখন হেয়ার ড্রেসার, কেউ মেকআপ এক্সপার্ট আবার কারোর হাতে ম্যাসাজ নাকি দুরন্ত। শরীরের ক্লান্তির সঙ্গে মনের ক্লান্তিও ধুয়ে মুছে যায়।

বিউটিশিয়ানদের অধিকাংশ মণিপুরী। অন্য রাজ্যের বাসিন্দাও রয়েছেন। ৩০ বছরের ওয়ার্ডেন জানালেন,  প্রতিদিন সকাল ঠিক ৯টা বাজলেই পার্লারের দরজা খুলে যায়। ভিড় তেমন বেশি না হলে পার্লার চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। তবে সপ্তাহান্তের ভিড়ে সময় মাঝেমধ্যেই পিছিয়ে যায় কিছুটা। মেকআপে তুখোড় দুই তরুণী। ড্রাগ পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন বছর দুই আগে। চুলের নানা কাটিং-এ তুখোড় একজন মাঝবয়সী মহিলা। খুনের আসামি। আরও কিছু মামলা ঝুলে আছে তাঁর মাথায়। সে সব বিশেষ পাত্তা দেননা তিনি। চুলের খোঁপায় ফুল গুঁজে দিতেই বেশি ভালো লাগে তাঁর। ফুলের গন্ধে অতীতের অন্ধকার ভুলে যেতে চান এই প্রবীণ বিউটিশিয়ান।

‘‘বিন্দি, মেহেন্দি আর কাঁচের চুড়ির খুব চাহিদা পার্লারে। প্রতি মাসে স্টক ফুরিয়ে যায়। বাইরে থেকে গুছিয়ে এনে সাজিয়ে রাখতে হয়। চুড়ি পরতে খুবই ভালোবাসেন মহিলা বন্দিরা। কেউ কেউ তো শুধু চুড়ি আর বিন্দিতে সাজতেই পার্লারে আসেন,’’ বললেন ওয়ার্ডেন। খরচও একেবারেই নামমাত্র। নখ কাটতে লাগে ৫টাকা, স্ক্রাব করালে ৩০ টাকা। তবে চুলে স্ট্রিকস করাতে হলে ২০০ টাকার মতো লাগে, আর যদি ‘ভিএলসিসি ফেসিয়াল’ করানোর সখ জাগে, তাহলে খরচ পড়বে ৪৫০ টাকার মতো।

বছর দুই হল তিহাড় জেলের মহিলাদের বিউটিশিয়ানের ট্রেনিং দেন মণিপুরী তরুণী। বললেন, ‘‘দিল্লি ও বেঙ্গালুরু নানা পার্লারে কাজ করেছি। এখন তিহাড় জেলের পার্লারে মহিলা বন্দিদের শেখাই। নিজেও কাজ করি। এক দিনের জন্যও মনে হয়নি জেলের ভিতরে রয়েছি।’’ আর বাকিরা? হেয়ার ড্রেসার জানালেন,  ‘‘অন্ধকারের সঙ্গে নাম জড়িয়ে গিয়েছিল। এখন সেই পথ অতীত। এখানে সালোয়ার কামিজ পরি, স্কার্ট পরতে পাই, গ্রামে যা পেতাম না। নিজেও সাজি, অন্যকে সাজিয়েও আনন্দ পাই।’’

জেলের ফ্যাশন ল্যাবে চলছে ট্রেনিং

আঁধার থেকে আলোর পথে উত্তরণের গল্প কিছু নতুন নয়। সংশোধনাগারে অপরাধীদের নানা রকম সুযোগ দেওয়া হয় জীবন শুধরে নেওয়ার। তিহাড় জেলও সেই পথেরই শরিক। তবে এই পার্লারের একটা বৈশিষ্ট্য আছে, সেটা তার পরিকাঠামো বা চাকচিক্যে নয়। সেটা দৃষ্টিভঙ্গির আঙিনায়। গোলাপ গুঁজে যে তরুণী খোঁপা বাঁধছেন, তাঁরই হাত হয়তো একদিন ভিজেছিল রক্তে। আজও গোলাপের কাঁটা বিঁধলে সেই দগদগে অতীত তাঁর মনে খোঁচা দেয়। তবুও সব ভুলে তিনি জীবনের নতুন অধ্যায়কে স্বাগত জানাচ্ছেন। প্রতিটা দিন জেলের চার দেওয়ালে চোখের জল ফেলে যিনি একবার স্বামী বা সন্তানের দেখা পাওয়ার অপেক্ষা করেন, সপ্তাহান্তে তিনিও মুখের কালি তুলে টিপ আর চুড়িতে সুন্দরী হয়ে ওঠেন। এই আবেগঘন মুহূর্তগুলোই এই পার্লারকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে। আর এখানেই তিহাড় জেলের সার্থকতা।

Comments are closed.