নতুন পাঁচটি জাদুঘরের প্রস্তাব বাজেটে: জেনে নিন কেন বেছে নেওয়া হল এই জায়গাগুলি

প্রস্তাব অনুযায়ী গুজরাটের ধোলাবীরা ও লোথাল, উত্তরপ্রদেশের হস্তিনাপুর, অসমের শিবসাগর ও তামিলনাড়ুর আদিচানাল্লুরে গড়া হবে জাদুঘর

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতা থেকে মহাভারত। কিংবা অতীতের দুর্ধর্ষ অসম রাজার রাজত্ব থেকে দক্ষিণের দ্রাবিড় সভ্যতা। আমাদের দেশের জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে পুরনো দিনের অনেক স্মৃতি। সেই গৌরবময় অতীতকে এযুগের মানুষের সামনে তুলে ধরতে উদ্যোগী হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।

    এবার বাজেটে প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন পাঁচটি জাদুঘর গড়া হবে দেশে। এই জায়গাগুলি হল: গুজরাটের ধোলাবীরা ও লোথাল, উত্তরপ্রদেশের হস্তিনাপুর, অসমের শিবসাগর ও তামিলনাড়ুর আদিচানাল্লুর।

    ধোলাবীরা

    শুরু করা যাক ধোলাবীরা দিয়ে। ইতিহাসবিদ ও পুরাতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় হরপ্পা ও মহেঞ্জোদড়োয় উৎখনন করে পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতাগুলির একটির সন্ধান পেয়েছিলেন। সেই সভ্যতার নাম দেওয়া হয়েছিল সিন্ধুসভ্যতা বা ইন্দাস ভ্যালি সিভিলাইজেশন। সময়ের সঙ্গে মাটি খুঁড়ে আরও অনেক ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাতে দেখা গেছে, এই সভ্যতা শুধুমাত্র সিন্ধুনদের তীরে গড়ে ওঠেনি, গড়ে উঠেছিল সিন্ধু ও সরস্বতী নদীর অববাহিকায়। এখনও পর্যন্ত এই সভ্যতার সবচেয়ে বড় যে শহরের সন্ধান পাওয়া গেছে সেটি হল ধোলাবীরা।

    হরপ্পা ও মহেঞ্জোদড়োর গৌরব ম্লান হওয়ার নয় তবুও ধোলাবীরার অন্য মর্যাদা তৈরি হয়েছে।

    গুজরাটের কচ্ছের রানে ১২০ একর জায়গা জুড়ে রয়েছে এই শহর। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দে এই শহরের পত্তন হয়েছিল, শহরটি ছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ অব্দ পর্যন্ত। তবে অন্য একটি মত অনুযায়ী খ্রিস্টপূর্ব ২৬৫০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১৪৫০ অব্দ পর্যন্ত সময়ে এই শহরটির অস্তিত্ব ছিল।

    ১৯৮৯ সালে এই জায়গায় প্রথম ব্যাপক উৎখনন শুরু হয় ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের (আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া বা এএসআই) অধীন। ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এখানে উৎখনন হয়েছে। উৎখননের ফলে জানতে পারা গেছে এখানে বিশাল বিশাল জলাধার ছিল এবং জল-ব্যবস্থাপনার জন্য বেশ সুব্যবস্থা ছিল যা সেই সময়ের হিসাবে বেশ আধুনিক। বিশ্বের প্রাচীনতম জলাধার বলা হয় এটিকেই। যে তিনটি বড় জলাধার আবিষ্কৃত হয়েছে সেই জলাধারগুলোয় বৃষ্টির জল ধরে রাখা হত। এগুলির নির্মাণশৈলী বেশ আধুনিক। ২০১৪ সালে এখানে উৎখনন করে একটি আয়তাকার স্টেপওয়েল অবিষ্কৃত হয়েছে যেটি লম্বায় ২৪১ ফুট, চওড়ায় ৯৬ ফুট ও গভীরতা ৩৩ ফুট। মহেঞ্জোদড়োয় যে স্নানাগার  আবিষ্কৃত হয়েছিল এটি তার তিন গুণ বড়। ধোলাবীরায় দু’টি নদী রয়েছে সেই দুটিই বৃষ্টির জলে পুষ্ট হওয়ায় সারাবছর এই দুটি নদীতে জল থাকে না। সেই কারণেই এই জলাধার বলে ধারনা।

    এখানে মোহর (ইংরেজিতে যাকে বলে সিল বা seal) তৈরির একটি জায়গা আবিষ্কৃত হয়েছে। পাওয়া গেছে প্রচুর সংখ্যায় ছবি আঁকা মৃৎপাত্র। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন জনপদের সবচেয়ে বড় শহরকে সরকার বেছে নিয়েছে জাদুঘর বানানোর জন্য।

    লোথাল

    স্বাধীনতার পরে উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল উৎখননের পরিকল্পনা করে এএসআই। তাতেই আবিষ্কৃত হয় বিশ্বের প্রাচীনতম সমুদ্রবন্দর লোথাল। ঘগ্গর-হাকরা নদী অববাহিকার তীরেই গড়ে উঠেছিল প্রাচীনতম সভ্যতার এই অংশ। আরও পরে জানা যায় যে ঘগ্গর-হারকা নদীই পৌরাণিক সরস্বতী।

    ১৯৫৪ সালে আবিষ্কৃত হয় লোথাল বন্দর। ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত ব্যাপক ভাবে খোঁড়াখুঁড়ি করা হয় লোথাল, ধোলাবীরা, কালিবঙ্গান, রাখিগড়ি প্রভৃতি জায়গায়। সিন্ধি ভাষায় মহেঞ্জোদড়ো শব্দের যা অর্থ, গুজরাটি ভাষায় লোথাল শব্দেরও সেই একই অর্থ – মৃতের স্তূপ।

    ৩৭০০ বছরের পুরনো এই শহর মহেঞ্জোদড়োর তুলনায় বেশ ছোট, সাত ভাগের এক ভাগ। তবে সবচেয়ে আশ্চর্য হল এখানে এমন একটি চ্যানেল পাওয়া গেছে যেটিকে দেখে ও গবেষণা করে পুরাতত্ত্ববিদদের মনে হয়েছে এটি একটি ডক ছিল এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ডক। বন্দরনগরী হিসাবেও লোথাল বেশ উন্নত ছিল। জলনিকাশির ব্যবস্থাও বেশ উন্নত ছিল।

    লোথালে উৎখনন করে যে সব পুরাকীর্তি পাওয়া গেছে সেগুলি দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়ামে রাখা আছে। লোথালে নৌযাত্রা সংক্রান্ত জাদুঘর গড়ার প্রস্তাব রয়েছে।

    হস্তিনাপুর

    মহাভারতে কৌরবদের রাজধানী ছিল হস্তিনাপুর। মহাকাব্যের সেই শহরের নাম আজও বদলায়নি। এখানেই একটি জায়গা আছে যার নাম ‘বিদুর কা টিলা’। এই টিলা উৎখনন করে খ্রিস্টপূর্ব ২৮০০ অব্দ এবং তার চেয়েও আগে তৈরি তির, ছুরি, বর্শার ফলা প্রভৃতি মিলিয়ে ১৩৫টি লোহার অস্ত্রের অংশ পাওয়া গেছে যা থেকে মনে করা হয় যে এখানে অস্ত্র তৈরির কোনও কারখানা থেকে থাকতে পারে।

    এর কাছে আর একটি ঢিপির নাম ‘দ্রৌপদী কা রসুই’ বা দ্রৌপদীর রান্নাঘর। এখানে উৎখনন করে পাওয়া গেছে বেশ কিছু তামার বাসন, লোহার মোহর (সিল) ও সোনা-রুপোর গয়না। এগুলি সবই খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দ ও তার আশপাশের সময়ের বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

    গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান অনুযায়ী যে গণনা করা হয়েছে তাতে মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৮ অব্দে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পরে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসেন যুধিষ্ঠির। তারপরে বসেন অর্জুনের পৌত্র পরীক্ষিৎ। তাঁর পঞ্চমপুরুষ নিচক্ষুর সময়ে গঙ্গার বন্যায় ভেসে যায় হস্তিনাপুর। তখন তিনি কৌশাম্বিতে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যান বলে উল্লেখ রয়েছে। পুরাতাত্ত্বিক উৎখননেও এই জায়গায় বন্যা হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

    হস্তিনাপুরের কথা মহাভারতে উল্লেখ করা হয়েছে। পুরাতাত্ত্বিক উৎখননে প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া গেছে যার সঙ্গে মিল রয়েছে মহাভারত ও পুরাণে বর্ণিত ঘটনার। এই জায়গায় জাদুঘর তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বাজেটে।

    শিবসাগর

    টানা ছয় শতাব্দী ধরে দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করা অহম রাজ্যের রাজধানী ছিল শিবসাগর। আগে এই জায়গাটি অবশ্য রংপুর নামে পরিচিত ছিল। এখানে ১৯৩৪ সালে শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজা স্বর্গদেও শিব সিংহের রানি রাজাম্বিকা। মন্দিরটির নাম শিবাদল। এটি দেশের উচ্চতম শিবমন্দিরগুলির অন্যতম। এখানে যে হ্রদ রয়েছে তার নাম শিবসাগর। ২৫৭ একর জায়গার জুড়ে থাকা শিবসাগরে জল থাকে ১২৯ একর জুড়ে। স্থানীয়রা একে বলেন বড়পুকুরি। এটি খোঁড়া শুরু হয়েছিল ১৭৩১ সালে ও শেষ হয়েছিল ১৮৩৮ সালে।

    এখানে শিবরাত্রীতে বিশাল মেলা বসে। মেলা উপলক্ষে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে তো বটেই বিদেশ থেকেও পর্যটকরা আসেন।

    শিবাদল মন্দির বিখ্যাত হলেও এখানে রয়েছে বিষ্ণুদল ও দেবীদল মন্দির অর্থাৎ শিবের পাশাপাশি বিষ্ণু ও পার্বতীর মন্দির রয়েছে শিবসাগরে। একটি জাদুঘরও রয়েছে। দীর্ঘদিনের এই রাজধানী শহরের প্রতি অসমের মানুষের আলাদা আবেগ রয়েছে। এখানে নতুন করে জাদুঘর তৈরির কথা ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।

    আদিচানাল্লুর

    তামিননাড়ুর থুথুকুড়ির আদিচানাল্লুরে প্রাচীন জনপদের সন্ধান পাওয়া যায় ১৮৭৬ সালে। এখানে ব্যাপক ভাবে কাজ হয় ১৮৯৯ সাল থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত। আলেজান্ডার রেয়ার নেতৃত্বে উৎখনন হলেও অনেক নিদর্শনই চলে যায় জার্মানির একটি জাদুঘরে যার বর্তমান নাম এথনোলজিক্যাল মিউজিয়াম অফ বার্লিন। এর কারণ হল সেই সময় এখানে কাজ করছিলেন সেই জাদুঘরের এথনোলজিস্ট ডক্টর জাগর। তিনিই বহু নিদর্শন নিয়ে যান নিজের দেশের জাদুঘরে।

    উৎখননে জানা গিয়েছিল যে এখানে ছিল পাণ্ডিয়ান রাজ্য। ২০০৪ সালে এখান থেকে উৎখনন করে যে সব পুরা নিদর্শন পাওয়া যায় সেগুলির কার্বন ডেটিং করে জানা যায় যে সেই পাত্রগুলি খ্রিস্টপূর্ব ৯০৫ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৬৯৬ অব্দের মধ্যেকার। ২০০৫ সালে এখানে নতুন করে ১৬৯টি পাত্র পাওয়া যায় উৎখননে। ২০১৮ সালে এখান থেকে উদ্ধার হয় একটি নরকঙ্কাল। মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটি পরীক্ষা করে জানা যায় যে কঙ্কালটি খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের। তবে এটি আরও পুরনো হতে পারে।

    আদিচানাল্লুর থেকে প্রাপ্ত নিদর্শনগুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কার্বন ডেটিংয়ের পরে জানা যায় যে তামিলনাড়ুর প্রাচীনতম জনপদগুলির মধ্যে এটি অন্যতম। তাই এখানেও একটি জাদুঘর গড়ার প্রস্তাব করেছে সরকার।

    আগে উৎখননের ফলে কোনও জিনিস উদ্ধার হলে সেই নিদর্শন পাঠানো হত বড় কোনও সংগ্রহশালায়। এখন পুরাতাত্ত্বিক স্থানেই জাদুঘর গড়া হয়। মূলত ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বা এএসআইয়ের তত্ত্বাবধানে এগুলি থাকে। সেই তত্ত্ব মেনেই এই পাঁচ জায়গায় জাদুঘর গড়া হচ্ছে। আরও একটি জাদুঘর হবে রাঁচিতে তবে সেটি ট্রাইবাল মিউজিয়াম। এছাড়াও কলকাতায় পুরনো টাঁকশালের বাড়িতেও টাকাপয়সা নিয়ে একটি জাদুঘর গড়ার প্রস্তাব রয়েছে বাজেটে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More