সোমবার, অক্টোবর ১৪

সিরিয়াল কিলার জলি জোসেফ: ১৪ বছরে স্বামী-সহ পরিবারের ছ’জনকে খুন, এই গৃহবধূর নিশানায় ছিল আরও অনেকেই

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কী ঠাণ্ডা দুটো চোখ! কী শান্ত মেজাজ! পুলিশি হেফাজতে জলি জোসেফকে জেরা করতে করতে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছিলেন দুঁদে পুলিশ কর্তারাও। স্বামী-সহ নিজের পরিবারের ছ’জনকে খুনের অভিযোগে গত শনিবার যাকে গ্রেফতার করেছে কেরল পুলিশের অপরাধ দমন শাখা। প্রতিটা খুনের গল্প সুনিপুণ ভাবে ব্যাখ্যা করে যাচ্ছিল জলি। এতটুকুও ঠোঁট কাপেনি। কেরলের কোঝিকোড়ের বাসিন্দা এই গৃহবধূই এখন দেশের অন্যতম ভয়ঙ্কর মহিলা সিরিয়াল কিলার।

২০০২ সাল থেকে ২০১৬। এই ১৪ বছরে একের পর এক খুন করে গেছে জলি। কোঝিকোড়ের এসপি কেজি সিমন জানিয়েছেন, জলির নিশানায় ছিল আরও কয়েকজন। ঠিক সময় পুলিশ তাকে পাকড়াও না করলে, আরও অনেক হতভাগ্যের প্রাণ যেত। প্রতিটা খুনই ছিল পরিকল্পনামাফিক। মৃতদেহ এমন ভাবে রাখা হয়েছিল যাতে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে ভ্রম হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে এই অপরাধ লুকিয়ে রেখেছিল জলি। তার হাবভাবেও কোনওদিন অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েনি। পুলিশ জানিয়েছে, মেধা আর ক্ষুরধার বুদ্ধিই ছিল সিরিয়াল কিলার জলি জোসেফের মূল হাতিয়ার।

জলি জোসেফ

কোঝিকোড়ের সম্ভ্রান্ত ক্যাথলিক পরিবারের সদস্য জলি। ৪৭ বছরের এই সিরিয়াল কিলার জানিয়েছেন, প্রথম খুনটা তিনি করেন ২০০২ সালে। প্রথম শিকার ছিলেন তাঁর শাশুড়ি আন্নামা টমাস। ৫৭ বছর বয়সী আন্নাম্মা আচমকাই মারা যান। গোটা ঘটনাটা এমনভাবে সাজিয়েছিলেন জলি যাতে মনে হয় স্বাভাবিক মৃত্যু। তদন্ত শুরু হলেও সেটা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ। তার ঠিক ছ’বছর পর ২০০৮ সালে আন্নাম্মার স্বামী টম মারা যান। বলা হয় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে টমের মৃত্যু হয়েছে। সন্দেহ হয়নি পুলিশেরও।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, দুটি খুনের মাঝে অনেকটা সময় রাখতেন জলি যাতে পুলিশ কোনও রকম যোগসূত্র খুঁজে না পায়। তবে শেষরক্ষা হয়নি। তৃতীয় খুন ২০১১ সালে। ৪০ বছর বয়সে একই ভাবে মৃত্যু হয় তাঁদের ছেলে তথা অভিযুক্ত জলির স্বামী রয় টমাসের। এ বার টনক নড়ে পুলিশের। মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। রিপোর্টে বিষক্রিয়ার বিষয়টি উঠে আসে। তবে এর পর আর তদন্ত সে ভাবে এগোয়নি। সাইরো-মালাবার গির্জার অধীনস্থ সমাধিক্ষেত্রে তাঁদের চার জনকেই কবর দেওয়া হয়।

বর্তমান স্বামী শাজুর সঙ্গে জলি

রয় টমাসের মৃত্যুর ঠিক দু’বছর পর, ২০১৬ সালে টমাসের খুড়তুতো ভাই শাজু-র স্ত্রী এবং দু’বছরের মেয়ে অ্যালফনসার মৃত্যু হয়। পর পর মৃত্যুতে বিপর্যস্ত পরিবার এ বার পুলিশের দ্বারস্থ হয়। তদন্ত শুরু হয় জোরকদমে। এরই মধ্যে  শাজুর সঙ্গে দ্বিতীয় বার বিয়ে হয় জলির। শ্বশুর রয় টমাসের উইল মাফিক সমস্ত সম্পত্তির উপর নিজের মালিকানা দাবি করে জলি।  বাধ সাধেন জলির দেওর মোজো। তাকেও খুন করে জলি। রহস্যমৃত্যুর জট খুলতে গিয়ে কবর খুঁড়ে নিহতদের মৃতদেহের ফরেন্সিক পরীক্ষা হয়। তাতে দেখা যায়, মৃত্যুর আগে প্রত্যেকেই কিছু না কিছু খেয়েছিলেন। প্রত্যেকের শরীরে সায়ানাইডের অস্তিত্ব মেলে।  তদন্তকারীরা জানান, প্রতিটা খুনই সায়ানাইড খাইয়ে করেছিলেন জলি। প্রতিটি খুনের সময় জলি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।

জলি ছাড়াও আরও তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। জলির বর্তমান স্বামী শাজু, জলিকে সায়ানাইড পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগে এমএস ম্যাথু এবং প্রাজিকুমারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ম্যাথু একটি গয়নার দোকানের কর্মী এবং প্রাজিকুমার গয়না বানান।  খুনে তারা জলিকে কীভাবে সাহায্য করেছে সেটা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

Comments are closed.