বালাকোট হামলায় পাকিস্তানকে বোকা বানিয়েছিলাম, বর্ষপূর্তিতে গোপন ছকের কথা বললেন মাস্টারমাইন্ড এয়ার মার্শাল

বালাকোট-মিশনের মাস্টারমাইন্ড এয়ার মার্শাল চন্দ্রশেখরণ হরি কুমার। বললেন এয়ার-স্ট্রাইকের অজানা কাহিনি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত ১টা ১৫ মিনিট। গ্বালিয়র এয়ার বেসে তখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। রণসাজে সেজে উঠেছে ২০টি মিরাজ-২০০০ ফাইটার জেট। রানওয়েতে আর কয়েক মিনিটের অপেক্ষা। রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা করছেন তৎকালীন বায়ুসেনাপ্রধান বিএস ধানোয়া। এয়ার বেসে হাজির বায়ুসেনার উচ্চপদস্থ কর্তারাও। মিশন-বালাকোটের শেষ মুহূর্তের খবর নিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। নিপুণ ছক, সময় একেবারে বাঁধা, প্রতিরোধ এলে কী করতে হবে তার প্ল্যানিংও তৈরি। সবটাই হয়েছে গোপনে, আসল প্ল্যান কী সেটা বায়ুসেনা অফিসারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ছোটখাটো একটা যুদ্ধের যাওয়ার প্রস্তুতি যেন! বালাকোটের বর্ষপূর্তিতে দুর্ধর্ষ সেই প্রত্যাঘাতের ভেতরের খবর বাইরে আনলেন এয়ার মার্শাল চন্দ্রশেখরণ হরি কুমার।

    ঠিক যেন ছাইচাপা আগুন, বলেছেন এয়ার মার্শাল হরি কুমার। বালাকোট অভিযানের নেপথ্যের অন্যতম মাথা। বালাকোট-মিশনের ছক, তার প্রস্তুতি— এই সবকিছুর পিছনেই রয়েছেন মাস্টারমাইন্ড এয়ার মার্শাল হরি কুমার। ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালবাসার দিনে রক্তাক্ত হয়েছে পুলওয়ামা। প্রাণ গেছে ৪০ জন সিআরপিএফের। তারপর থেকে প্রতিটা দিন, প্রতি সেকেন্ড একটু একটু করে প্রত্যাঘাতের প্রস্তুতি নিয়েছে ভারত। স্থলপথে, জলপথে বা আকাশপথে—কীভাবে বদলা নেওয়া হবে তার প্ল্যানিং হয়েছে। এয়ার মার্শাল বলেছেন, শেষে ঠিক হয় এয়ার-স্ট্রাইকেই পাকিস্তানের বিষদাঁত ভেঙে দেবে বায়ুসেনা। তাতে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালিয়ে ফিরে আসার রাস্তাও হবে অনেক সহজ। তারজন্য তৈরি করতে হয়েছে বায়ুসেনার দক্ষ পাইলটদের। পুলওয়ামা হামলায় শহিদ হওয়া আধপোড়া জওয়ানদের শরীর, জ্বলে যাওয়া বাস-গাড়ির ছবি মনে করেই রক্ত গরম করে নিয়েছিলেন মিরাজের বায়ুসেনা পাইলটরা। প্রতিশোধ চাই! বড় ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ!

    পুলওয়ামা হামলার দিনেই ঠিক হয় সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হবে, ফোন আসে ঠিক সন্ধ্যা ৬টায়

     

    ‘‘১৪ ফেব্রুয়ারি বেলা সোয়া ৩টের সময় সেনা কনভয়ে হামলা হয়। তারপর থেকে সমানে ফোন চলছে। সরকার কী ভাবছে তার আন্দাজও করেছিলাম। সেই ফোনটা আসে ঠিক সন্ধ্যা ৬টায়,’’ বলেছেন এয়ার মার্শাল হরি কুমার। তখন তিনি ওয়েস্টার্ন কম্যান্ডের এয়ার অফিসার কম্যান্ডিং-ইন চিফ। আর একমাস পরেই অবসর নেবেন। তাঁর দক্ষতা ও তুখোড় বুদ্ধির উপরেই আস্থা রেখেছিলেন বায়ুসেনা প্রধান বিএস ধানোয়া। এয়ার মার্শাল বলেছেন, একান্তে বায়ুসেনাপ্রধানের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরও মনোভাব ছিল সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের দিকেই। শুধু কেন্দ্রের ইশারা দরকার ছিল। সেই অনুমতিও মিলে যায় ১৬ ফেব্রুয়ারি। সকাল ৯টায় ফোন আসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর। মন্ত্রীসভার বৈঠকে ঠিক হয় ২০১৬ সালের মতোই ফের একবার সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হবে। তবে এবার স্থলপথে নয়, আকাশপথে। জঙ্গিদের ঘরে ঢুকে মারা হবে তাদের।

    এয়ার মার্শাল চন্দ্রশেখরণ হরি কুমার

    অজিত ডোভালের সঙ্গে বৈঠক ১৮ ফেব্রুয়ারি, বেছে নেওয়া হয় বালাকোটকে

    ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালেই জরুরি তলব করেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল, বলেছেন এয়ার মার্শাল হরি কুমার। রুদ্ধদ্বার সেই বৈঠকে হাজির ছিলেন স্থলসেনা, নৌসেনা, বায়ুসেনার প্রধানেরা এবং রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং বা ‘র’ (RAW)-এর তৎকালীন অপারেশনাল চিফ সামান্ত গোয়েল। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট বলেছে, বালাকোটে জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবির চালাচ্ছে পাক জইশ-ই-মহম্মদ, লস্কর-ই-তৈবার মতো একাধিক পাক মদতপুষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠী। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল, নিয়ন্ত্রণরেখার কাছাকাছি এলাকা থেকে লঞ্চপ্যাডও সরিয়ে নিয়েছে পাক সেনারা। সুতরাং দুয়ে দুয়ে চার। নিরাপত্তার রাশও আলগা। বালাকোটের ট্রেনিং ক্যাম্পই হল সঠিক টার্গেট। এই লক্ষ্যবস্তুকেই পাখির চোখ করতে হবে বায়ুসেনাকে।

    বায়ুসেনার  ‘এয়ারবর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল (AEW&C) এয়ারক্রাফ্ট—নেত্র

     

    বালাকোটের ‘টার্গেট’ গোপনে দেখে এল বায়ুসেনার ‘মেঘনাদ’ নেত্র

     

    এয়ার মার্শাল হরি কুমার বলেছেন, পুরো ছকটাই সাজাতে হয় অত্যন্ত গোপনে। কাকপক্ষীতেও যেন টের না পায়। ১৯৭১ ভারত-পাক যুদ্ধের পরে ফের একবার আকাশসীমা ছাড়িয়ে পাকিস্তানের মাটিতে অভিঘাত চালানো ছোটখাটো ব্যাপার ছিল না। এই আঁটঘাট বাঁদার কাজটাই ছিল চ্যালেঞ্জের। ২৬ ফেব্রুয়ারি ভোররাতেই ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ করা হয়। তার দু’দিন আগেই শত্রু ঘাঁটির খবর আনতে পাঠানো হয় ভারতীয় বায়ুসেনার ‘এয়ারবর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল (AEW&C) এয়ারক্রাফ্ট’ নেত্রকে। এয়ার মার্শাল বলেছেন, শত্রুদের শক্তি ঠিক কতটা, প্রতিরোধের ব্যবস্থা কতটা পাকাপোক্ত, কতটা জায়গা জুড়ে অপারেশন চলবে এবং তাতে কতটা সময় লাগতে পারে, তার সবকিছুই জরিপ করে রাখতে হয়। সেই কাজই করেছে নেত্র।  শত্রু শিবিরে নিখুঁত গোয়েন্দাগিরি চালিয়েছে। এদিকে গ্বালিয়র বেস থেকেই বায়ুসেনার যুদ্ধবিমান উড়বে সেই পরিকল্পনাও তৈরি। প্রত্যাঘাতের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে মাল্টিরোল সিঙ্গল ইঞ্জিন মিরাজ-২০০০ ফাইটার জেটকে। গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ২৩৩৬ কিলোমিটার। ৭৫০০ কিলোগ্রাম ওজনের এই ফাইটার জেট ১৭,০০০ কিলোগ্রাম ওজন নিয়ে আকাশে উড়তে সক্ষম। ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ও লেসার নিয়ন্ত্রিত বোমা বয়ে নিয়ে যেতে পারে আবার টার্গেটের দফারফাও করতে পারে।

    সেই প্রস্তুতিতে নজর রেখেছিল ডিরেক্টরেট অব এয়ার স্টাফ ইনসপেকশন (DASI) । এয়ার-স্ট্রাইকের কয়েকদিন আগে থেকেই মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কোনও সিগন্যাল যাতে বাইরে না যায় তার জন্যই এই ব্যবস্থা।

    পাকিস্তানের নজরদারি বিমানকে বোকা বানিয়ে হুশ করে ঢুকে পড়ে মিরাজ

    ২৫ ফেব্রুয়ারি রাত থেকেই তোড়জোড় শুরু হয় গ্বালিয়র বায়ুসেনা ঘাঁটিতে। প্রাক্তন বায়ুসেনা প্রধান ছাড়াও এয়ার বেসে হাজির ছিলেন আরও ৮০ জন অফিসার। এযার মার্শাল হরি কুমার বলেছেন, ঠিক রাত সোয়া পৌনে ৪টে নাগাদ গ্বালিয়র এয়ার বেস ছেড়ে বরেলির দিকে উড়ে যায় মিরাজ। মাঝ আকাশে জ্বালানি ভরে পাকিস্তানের আকাশসীমার দিকে এগিয়ে যায় ভারতের মিরাজ। ২০টির মধ্যে চারটি মিরাজ ফাইটার জেটকে রাখা হয় সীমান্তে নজরদারিতে, চারটি থাকে কোনও আপদকালীন অবস্থার জন্য, বাকি ১২টি রওনা দেয় বালাকোটের দিকে। পাক এয়ার কন্ট্রোল সিস্টেমকে ধোকা দেওয়াও ছিল চ্যালেঞ্জের কাজ। মিরাজ যখন নিয়ন্ত্রণরেখার কাছাকাছি, পাকিস্তানের দুই নজরদারি বিমান আচমকাই ঘোরাঘুরি শুরু করে দেয়। এয়ার মার্শাল বলেছেন, এই সম্ভাবনার কথা জানা ছিল। সেই মতো প্ল্যানিংও ছিল। তাদের ফাঁকি দিতে রাজস্থান সেক্টর থেকে ছাড়া হয় কয়েকটা জাগুয়ার জেটকে। সেগুলির মুখ থাকে বাহাওয়ালপুরের দিকে। পাকিস্তান এয়ার কন্ট্রোলকে ধোকা দেওয়ার এই মোক্ষম চাল কাজে আসে। জাগুয়ার জেটের গতিবিধি দেখতে যখন ব্যস্ত পাকিস্তান, সেই সুযোগে পাক আকাশসীমায় ঢুকে পড়ে মিরাজ-২০০০।

    মাল্টিরোল ফাইটার জেট মিরাজে সে দিন লোড করা ছিল স্পাইস ২০০০ গ্লাইড বোম (Spice-2000 )। জইশের অন্তত ছ’টি ডেরা টার্গেট করে এই বোম ফেলেছিল মিরাজ। বালাকোটের কাছে বিসিয়ান শহরের পশ্চিম সীমানা বরাবর পাঁচটি জঙ্গি ঘাঁটিতে নিপুণ নিশানায় ফেলা হয়েছিল ১০০০ কেজি ওজনের এই স্পাইস-২০০০। টার্গেট বাড়িগুলির ছাদের ছিদ্র দিয়ে ঢুকে যায় স্পাইস। সবক্ষেত্রেই যে বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে এমনটা নয়। তবে ভিতরে গিয়ে নিজের কাজ সেরেছে এই বোম। স্পাইসের এই ক্ষমতার জন্যই তাকে ‘অদৃশ্য অস্ত্র’ বলে থাকেন বায়ুসেনারা। গোটা অপারেশন ছিল ১৯ মিনিটের। এতটাই দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছে মিরাজ-২০০০ যে পাকিস্তানের র‍্যাডারে ধরা পড়েনি কিছুই। অত্যাধুনিক সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার দিয়ে তোলা ছবির মাধ্যমেই ভারতীয় গোয়েন্দারা জানতে পারেন, পাহাড়ের গায়ে পাঁচটি জইশ কাঠামো সে দিন ধ্বংস করেছিল ভারতীয় যুদ্ধবিমান।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More