বুধবার, আগস্ট ২১

মরণোত্তর অঙ্গদানের নজির দেশের মাটিতে! দু’য়ের শিশুর হৃদয়ে প্রাণ পেল আরও এক শিশু, অঙ্গে আলো পেল ছয়

দ্য ওয়াল ব্যুরো:  মৃত্যুর পরেও বেঁচে রইল সে। তার অঙ্গেই আলো পেল আরও ছয়। তার হৃদয়ে নিয়ে ফের ধুকপুক করে উঠল আরও একটি হৃদয়। বয়স তার মাত্র দুই। মুম্বইয়ের দু’বছরের ওই শিশুর হদপিণ্ডে সম্প্রতি প্রাণ ফিরে পেল চেন্নাইয়ের এক শিশু। তারও বয়স দুই। চিকিৎসকরা বললেন, জটিল অস্ত্রোপচার নিঃসন্দেহে, একই হৃদয়ে বেঁচে রইল দু’জনেই।

চেন্নাইয়ের ফোর্টিস মালার হাসপাতালে এই অভিনব হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট সার্জারি করলেন একদল চিকিৎসক। ভিল্লুপুরমের বাসিন্দা বছর দুয়েকের রোহন হৃদপিণ্ডের জটিল রোগে ভুগছিল। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুটির ডায়ালেটেড কার্ডিয়োমায়োপ্যাথি ধরা পড়ে কয়েক মাস আগে। ধীরে ধীরে রোগের প্রকোপ বাড়তে থাকে।

ডায়ালেটেড কার্ডিয়োমায়োপ্যাথি (DCM)হৃদপিণ্ডের এমন একটি জটিল অবস্থা যেখানে বাঁ দিকের প্রকোষ্ঠটি আকারে বড় ও দুর্বল হয়ে যায়। হৃদপিণ্ডের রক্ত সঞ্চালন ক্ষমতা কমতে থাকে। ধীরে ধীরে রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যাও দেখা দেয়। সার্জারিতে কাজ না হলে হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে। রোহনের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল। স্টেট ট্রান্সপ্লান্ট রেজিস্ট্রিতে রোহনের নাম নথিভুক্ত করে সঠিক দাতার খোঁজ করছিলেন চিকিৎসকরা।

ফোর্টিস মালার হাসাপাতালের কার্ডিয়োলজি বিভাগের প্রধান ডঃ কে আর বালাকৃষ্ণণ জানিয়েছেন, দু’বছরের শিশুর হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন মামুলি বিষয় নয়। অস্ত্রোপচারের পদ্ধতি যতটা জটিল, শিশুর হৃদপিণ্ডের সঙ্গে মিলবে তেমন ডোনর বা অঙ্গদাতার খোঁজ পাওয়াটাও ততটাই বেশি কঠিন। ক্রাইটেরিয়া ম্যাচ না করলে অস্ত্রোপচারের সময় মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। তবে অপেক্ষার অবসান হয় কিছুদিনের মধ্যেই। খোঁজ মেলে মুম্বইয়ের একটি শিশুর, যার মৃত্যু হয় ১০ ফেব্রুয়ারি মস্তিষ্কের দুরারোগ্য ব্যাধিতে। ওই শিশুর বয়সও দুই এবং আশ্চর্যজনক ভাবে দু’জনের ক্রাইটেরিয়াও মিলে যায় অনেকটাই।

এই খোঁজ পাওয়ার পর আর দেরি করেননি চিকিৎসকরা। দ্রুত মুম্বই থেকে শিশুর হৃদপিণ্ড উড়িয়ে আনা হয় চেন্নাইতে। ঘণ্টাখানেক ধরে চলে প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া। ডঃ বালাকৃষ্ণণ ছাড়াও অস্ত্রোপচারের দায়িত্বে ছিলেন ডঃ সুরেশ রাও, ফোর্টিস মালার হাসপাতালের ক্রিটিকাল কেয়ার অ্যান্ড কার্ডিয়াক অ্যানাস্থেসিয়া বিভাগের প্রধান।

ডঃ বালাকৃষ্ণণ কথায়, “অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে। আবার শ্বাস নিতে পারছে রোহন, তার হৃদপিণ্ডও সচল। তবে এই অস্ত্রোপচার শুধু জটিলই ছিল না, আমাদের কাছে ছিল একটা চ্যালেঞ্জ। শিশুটিকে নতুন জীবন দেওয়ার যে ব্রত আমরা নিয়েছিলাম সেটা সফল হয়েছে। আশা করছি, এই অস্ত্রোপচার ভবিষ্যতে পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক রোগীদের জন্য একটা মাইলস্টোন হয়ে দাঁড়াবে। হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের নতুন দিশা খুলে যাবে।” একই দাবি ডঃ সুরেশ রাওয়েরও।

মুম্বইয়ের ওই শিশুটির অঙ্গ নিয়ে এখনও পর্যন্ত ছ’জনের প্রাণ বেঁচেছে। তার মধ্যে চার জন শিশু। অঙ্গদানের যে নজির তৈরি হয়েছে তার জন্য শিশুটির বাবা, মাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন চেন্নাইয়ের চিকিৎসকরা। কমবয়সী অঙ্গদাতাদের মধ্যে নজির তৈরি করেছে সে। এর আগে ২০১৭ সালে সুরাটের ১৪ মাসের শিশুর হৃদপিণ্ডে প্রাণ বেঁচেছিল মুম্বইয়ের সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকন্যার।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি হলেও, আমাদের দেশে অঙ্গদানের নজির খুবই কম। স্পেনের মতো ছোট দেশ অঙ্গদানে বিশ্বে প্রথম। সেখানে প্রতি ১০ লক্ষে ৩৬ জন অঙ্গ দান করেন। অথচ ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে প্রতি ১০ লক্ষে অঙ্গ দান করেন মাত্র ০.৫ জন। ভারতে ১০০ জনের অঙ্গ প্রয়োজন হলে পায় মাত্র দু’জন। পরিসংখ্যান বলছে, মস্তিষ্কের মৃত্যু হয়েছে, এমন কারও শরীরের নানা অঙ্গের সাহায্যে ১২টি মানুষের প্রাণ বাঁচতে পারে। কিন্তু ২০১৪ সালে ভারতে এক লক্ষ ৬০ হাজার মানুষের মস্তিষ্কের মৃত্যু হলেও, অন্যের অঙ্গ দিয়ে প্রাণ বাঁচানো গিয়েছে মাত্র ৩০০ জনের।

Comments are closed.